নারী রেফারির সঙ্গে অসদাচরণ ও লিঙ্গবৈষম্যমূলক মন্তব্যের জেরে কলম্বাস ক্রুর রিজার্ভ দলের কোচ ফেদেরিকো হিগুয়াইনকে বরখাস্ত করেছে মেজর লিগ সকারের ক্লাবটি। ম্যাচ চলাকালে নারী রেফারিকে করমর্দনের সময় হাত ছাড়তে না দেওয়া এবং তাকে উদ্দেশ করে ‘এটা পুরুষের খেলা’ বলার অভিযোগে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ফেদেরিকো হিগুয়াইন আর্জেন্টিনার সাবেক ফুটবলার এবং দেশটির জাতীয় দলের সাবেক তারকা গনসালো হিগুয়াইনের ভাই। তিনি কলম্বাস ক্রুর রিজার্ভ দলের দায়িত্বে ছিলেন। ঘটনাটি ঘটে MLS-এর ডেভেলপমেন্ট লিগ MLS NEXT Pro-এর একটি ম্যাচে।
ম্যাচে একটি ঘটনায় হিগুয়াইনকে লাল কার্ড দেখান ম্যাচের নারী রেফারি। মাঠ ছাড়ার সময় রেফারির সঙ্গে করমর্দন করতে গিয়ে হিগুয়াইন তার হাত চেপে ধরে রাখেন। রেফারি হাত ছেড়ে দিতে বলার পরও তিনি তাৎক্ষণিকভাবে হাত ছাড়েননি। অভিযোগ অনুযায়ী, রেফারি তাকে তিনবার হাত ছাড়তে বলেছিলেন।
এরপরই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নারী রেফারিকে উদ্দেশ করে হিগুয়াইন বলেন, “ভুলে যেও না, এটা পুরুষের খেলা।” তার এই মন্তব্যকে লিঙ্গবৈষম্যমূলক ও অবমাননাকর হিসেবে দেখছে রেফারিদের সংগঠন।
প্রথমে দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা
ঘটনার পর হিগুয়াইনকে লাল কার্ডের পাশাপাশি দুই ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিয়ে ক্লাবের পক্ষ থেকে আরও পর্যালোচনা করা হয়।
এরপর মঙ্গলবার কলম্বাস ক্রু জানায়, হিগুয়াইনকে তার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্লাবটির জেনারেল ম্যানেজার ইসা টল বলেন, “আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ফেদেরিকো হিগুয়াইনকে তার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া আমাদের ক্লাব, খেলোয়াড় এবং সহায়ক স্টাফদের জন্য সবচেয়ে ভালো।”
তিনি আরও বলেন, গত এক মাসের ঘটনাপ্রবাহ এবং চলতি সপ্তাহে হিগুয়াইনের সঙ্গে আলোচনা করার পর ক্লাব মনে করেছে, দলের একজন নেতার কাছ থেকে যে ধরনের আচরণ প্রত্যাশিত, তিনি তা পূরণ করতে পারেননি।
‘জবাবদিহি করতে চাননি’
দ্য অ্যাথলেটিকের প্রতিবেদনে বেনামি ক্লাব সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, পরবর্তী আলোচনায় হিগুয়াইন তার আচরণ নিয়ে যথেষ্ট আত্মসমালোচনা বা দায় স্বীকার করতে রাজি ছিলেন না। এমনকি তিনি প্রকাশ্যে ক্ষমাও চাননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ক্লাবের পক্ষ থেকে হিগুয়াইনের ব্যক্তিগত অবস্থান বা ঘটনার বিষয়ে তার বিস্তারিত বক্তব্য প্রকাশ করা হয়নি।
রেফারিদের সংগঠনের কড়া প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর Professional Soccer Referees Association (PSRA) হিগুয়াইনের আচরণের তীব্র সমালোচনা করেছে। সংগঠনটির দাবি, নারী কর্মকর্তার সঙ্গে হিগুয়াইন দুটি ইচ্ছাকৃত শারীরিক আচরণ করেছেন এবং তার সঙ্গে লিঙ্গবৈষম্যমূলক আচরণ করেছেন।
রেফারিদের সংগঠনের ভাষ্য অনুযায়ী, হিগুয়াইন রেফারির হাত চেপে ধরেছিলেন এবং থামতে বলা সত্ত্বেও হাত ছাড়েননি। এরপর ‘এটা পুরুষের খেলা’ মন্তব্য করে পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তোলেন। PSRA প্রাথমিক দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞাকেও অপর্যাপ্ত বলে উল্লেখ করেছে। সংগঠনটি অন্তত ছয় ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দাবি করেছিল।
নারী কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
এই ঘটনা ফুটবলে নারী রেফারিদের প্রতি আচরণ এবং তাদের কর্মপরিবেশ নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। PSRA বলেছে, ফুটবলের প্রতিটি স্তরে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন এবং কোনো নারী কর্মকর্তাকে ভয় দেখানো বা অবমাননাকর মন্তব্য সহ্য করে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হওয়া উচিত নয়।
সংগঠনটি আরও উল্লেখ করেছে, নারী রেফারিরা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। তাই পুরুষ কর্মকর্তাদের মতোই তাদের সম্মান, মর্যাদা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ক্লাবের কঠোর বার্তা
হিগুয়াইনকে বরখাস্ত করার মাধ্যমে কলম্বাস ক্রু তাদের কোচ ও কর্মকর্তাদের আচরণবিধি নিয়ে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছে। ক্লাবের বক্তব্য অনুযায়ী, মাঠে প্রতিযোগিতামূলক আবহ থাকলেও কোচ ও নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের কাছ থেকে পেশাদার আচরণ প্রত্যাশিত।
ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত শুধু একটি ম্যাচের শৃঙ্খলাজনিত বিষয় হয়ে থাকেনি। লাল কার্ড, দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা এবং পরবর্তী তদন্তের পর কোচের চাকরি হারানোর মধ্য দিয়ে এটি MLS NEXT Pro-তে সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত শৃঙ্খলাজনিত ঘটনাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।
ফেদেরিকো হিগুয়াইনের বরখাস্তের ঘটনায় আবারও স্পষ্ট হলো, ফুটবলের মাঠে প্রতিযোগিতা যতই তীব্র হোক, ম্যাচ কর্মকর্তা, খেলোয়াড় ও কোচ—সবার পারস্পরিক সম্মান ও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি ক্রমেই সামনে আসছে।




