ভাইকিংয়ের বিপক্ষে হ্যারি কেইনের জোড়া গোলও কাজে এল না! দুই গোলে পিছিয়ে থেকে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে এগিয়ে গিয়েও শেষ রক্ষা হলো না বায়ার্ন মিউনিখের। মাইকেল অলিসের লাল কার্ডের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ম্যাচের ৯০তম মিনিটে সমতা সূচক গোল করে চ্যাম্পিয়নস লিগে বায়ার্নকে রুখে দিল নরওয়ের ক্লাবটি।
উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের লিগ পর্বে এক রোমাঞ্চকর লড়াই দেখল ফুটবল বিশ্ব। হ্যারি কেইনের জোড়া গোল এবং রর গোলে দুর্দান্তভাবে ম্যাচে ফিরে এসেছিল বায়ার্ন মিউনিখ। কিন্তু শেষ মুহূর্তে গোল হজম করে জয়বঞ্চিত হয় ভিনসেন্ট কোম্পানির দল। ১০ জনের বায়ার্নের বিপক্ষে ৩-৩ গোলের ড্রয়ে মূল্যবান এক পয়েন্ট তুলে নেয় নরওয়ের চ্যাম্পিয়ন ভাইকিং।
ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিল নাটকীয়তার ছোঁয়া। প্রথমার্ধে দুই গোলে এগিয়ে গিয়েছিল ভাইকিং। দ্বিতীয়ার্ধে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল করে সমতায় ফেরেন কেইন। এরপর দিয়াজের গোলে এগিয়েও যায় বায়ার্ন। কিন্তু মাইকেল অলিসের লাল কার্ডের পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ বদলে যায়। শেষ পর্যন্ত ৯০তম মিনিটে গোল করে ড্র নিশ্চিত করে স্বাগতিকরা।
প্রথম মিনিটেই বায়ার্নকে বড় ধাক্কা
আগের ম্যাচে অগসবুর্গের বিপক্ষে খেলার মাত্র আট সেকেন্ডের মধ্যে গোল হজম করেছিল বায়ার্ন মিউনিখ। সেই হতাশা কাটিয়ে ওঠার আগেই আরেকটি ম্যাচে শুরুতেই গোল খেয়ে বসে জার্মান জায়ান্টরা।
ম্যাচের দ্বিতীয় মিনিটেই জ্লাতকো ত্রিপিচের ইনসুইং কর্নার থেকে হেডে গোল করেন লম্বা গড়নের ডিফেন্ডার জিয়ান্নি স্টেনসনেস। তাঁর নিচু হেড বায়ার্নের গোলরক্ষক ইয়োনাস উরবিগকে পরাস্ত করে জালে জড়ায়।
শুরুতেই পিছিয়ে পড়ে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে বায়ার্ন। মাইকেল অলিসে ও লুইস দিয়াজ পরপর দুটি ভালো সুযোগ তৈরি করেন। কিন্তু ভাইকিংয়ের গোলরক্ষক আরিল্ড অস্টবো তাঁদের প্রচেষ্টা আটকে দেন।
বায়ার্ন বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে আক্রমণ চালালেও ভাইকিং নিজেদের রক্ষণ সামলে পাল্টা আক্রমণের সুযোগ খুঁজতে থাকে। স্বাগতিকদের সেই কৌশল প্রথমার্ধের শেষ দিকে কার্যকর হয়ে ওঠে।
ম্যাচের ৩৮তম মিনিটে দ্রুতগতির এক আক্রমণ থেকে দ্বিতীয় গোল পায় ভাইকিং। বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে পাওয়ার পর দ্রুত সামনে এগিয়ে যায় নরওয়ের দলটি। বায়ার্নের রক্ষণভাগের পেছনে জায়গা পেয়ে যান পিটার ক্রিশ্চিয়ানসেন।
সুযোগ কাজে লাগিয়ে ঠান্ডা মাথায় গোলরক্ষক উরবিগকে পরাস্ত করেন তিনি। স্কোরলাইন দাঁড়ায় ২-০। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগে বায়ার্নের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে দেয় স্বাগতিকরা। দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পর বায়ার্নের সমর্থকদের মধ্যে হতাশা বাড়লেও দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা ছিল দলের ওপর।
দ্বিতীয়ার্ধে কেইনের জোড়া গোলে ম্যাচে ফেরে বায়ার্ন
বিরতির পর নতুন উদ্যমে মাঠে নামে বায়ার্ন মিউনিখ। আর দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার ১০ মিনিটের মধ্যেই ব্যবধান কমিয়ে আনেন হ্যারি কেইন। কনরাড লাইমারের ওপর ক্রিস্টোফার হাউগেনের ফাউলের কারণে পেনাল্টি পায় বায়ার্ন। ৫৪তম মিনিটে স্পটকিক থেকে নিচু শটে গোলরক্ষকের নাগালের বাইরে বল পাঠিয়ে গোল করেন কেইন। ম্যাচে ফিরে আসার আশা জাগে জার্মান ক্লাবটির।
এই গোলটি ইউরোপীয় ক্লাব প্রতিযোগিতায় কেইনের ৮০তম গোল ছিল। তবে ইংলিশ অধিনায়কের গোলের ক্ষুধা তখনো মেটেনি। কিছুক্ষণ পরই জশুয়া কিমিখের নিখুঁত ক্রস থেকে দূরের পোস্টে হেড করে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন কেইন। তাঁর এই গোলের মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় ক্লাব প্রতিযোগিতায় গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ৮১-তে। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল করে ২-২ সমতায় ফিরে আসে বায়ার্ন।
দুই গোলে এগিয়ে থেকেও প্রতিপক্ষকে সমতায় ফিরতে দেখে চাপে পড়ে যায় ভাইকিং। কেইনের জোড়া গোলের পর বায়ার্নের আক্রমণ আরও ধারালো হয়ে ওঠে। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে তারা।
এরই ধারাবাহিকতায় কনরাড লাইমারের পাস থেকে গোল করেন লুইস দিয়াজ। কাছের দূরত্ব থেকে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বল জালে পাঠিয়ে বায়ার্নকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে দেন কলম্বিয়ান ফরোয়ার্ড।
দুই গোলে পিছিয়ে থাকা অবস্থা থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়া বায়ার্নের জন্য ম্যাচটি তখন দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের গল্প হয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, শেষ পর্যন্ত জয় নিয়েই মাঠ ছাড়বে কোম্পানির দল। কিন্তু ফুটবল যে শেষ বাঁশি বাজার আগে কখনোই নিশ্চিত নয়, সেটিই আবার প্রমাণিত হলো এই ম্যাচে।
অলিসের লাল কার্ডে বদলে গেল ম্যাচের চিত্র
বায়ার্নের এগিয়ে যাওয়ার আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ফরাসি উইঙ্গার মাইকেল অলিসে অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। দ্বিতীয় হলুদ কার্ডটি তাঁকে দেখানো হয় ত্রিপিচের মুখের দিকে বল ছুড়ে মারার ঘটনায়। ফলে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে (৭৪ মিনিটে) ১০ জনের দলে পরিণত হয় বায়ার্ন।
এই লাল কার্ড ভাইকিংকে নতুন করে লড়াইয়ে ফেরার সুযোগ করে দেয়। একজন খেলোয়াড় কম নিয়ে বায়ার্নকে রক্ষণ সামলাতে হয়, অন্যদিকে সমতা ফেরাতে মরিয়া হয়ে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বাগতিকরা। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ভাইকিংয়ের আক্রমণ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। আর সেই চাপ থেকেই আসে বহুল প্রতীক্ষিত সমতাসূচক গোল।
৯০তম মিনিটে ত্রিপিচের দূর থেকে ভাসিয়ে দেওয়া ক্রস বক্সে পৌঁছালে দূরের পোস্টে হেড করে গোল করেন হারমান হাউগেন। তাঁর গোলে স্কোরলাইন হয় ৩-৩। গোলের পর উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন ভাইকিংয়ের খেলোয়াড় ও সমর্থকেরা। দুই গোলে এগিয়ে থেকেও ম্যাচে পিছিয়ে পড়ার পর শেষ মুহূর্তে সমতা ফেরানো ছিল নরওয়ের দলটির জন্য বড় প্রাপ্তি।
শেষ পর্যন্ত আর কোনো গোল না হওয়ায় ৩-৩ সমতায় শেষ হয় ম্যাচ। জয় প্রায় নিশ্চিত করে ফেলেও শেষ মুহূর্তে দুই পয়েন্ট হারায় বায়ার্ন মিউনিখ। এই ড্রয়ের মাধ্যমে চ্যাম্পিয়নস লিগের লিগ পর্বে নিজেদের প্রথম পয়েন্ট অর্জন করেছে ভাইকিং। অন্যদিকে, ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় টানা দ্বিতীয় জয় তুলে নেওয়ার সুযোগ হারিয়েছে বায়ার্ন মিউনিখ।
ম্যাচটি আরও একবার দেখিয়ে দিল, আক্রমণে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করলেও রক্ষণভাগের সামান্য ভুল এবং শৃঙ্খলাজনিত সমস্যার কারণে বড় দলগুলোকেও পয়েন্ট হারাতে হতে পারে। বায়ার্নের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কীভাবে শেষ মুহূর্তে পাওয়া লিড ধরে রাখা যায় এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে লাল কার্ডের মতো ঘটনা এড়ানো যায়। আর ভাইকিংয়ের জন্য এই এক পয়েন্ট হতে পারে চ্যাম্পিয়নস লিগের পরবর্তী ম্যাচগুলোতে আত্মবিশ্বাসের বড় উৎস।
ম্যাচের সংক্ষিপ্ত বিবরণ
- ম্যাচ: ভাইকিং ৩-৩ বায়ার্ন মিউনিখ
- ভাইকিংয়ের গোলদাতা: জিয়ান্নি স্টেনসনেস (২), পিটার ক্রিশ্চিয়ানসেন (৩৮), হারমান হাউগেন (৯০)
- বায়ার্নের গোলদাতা: হ্যারি কেইন (৫৪ পেনাল্টি, ৬০), লুইস দিয়াজ (৭১)
- লাল কার্ড: মাইকেল অলিসে (৭৪)




