পয়েন্ট ব্যবধান কমিয়ে আনলো রিয়াল
এল ক্লাসিকো মানেই উত্তেজনা, রোমাঞ্চ আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত টানটান লড়াই। স্পটিফাই ক্যাম্প ন্যুতে এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। কিলিয়ান এমবাপ্পের শেষ মুহূর্তের গোলে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনাকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। এই জয়ে শুধু তিন পয়েন্টই অর্জন করেনি তারা, বরং লা লিগার শিরোপার লড়াইকেও নতুন মাত্রা দিয়েছে। বার্সেলোনার সঙ্গে ব্যবধান কমে এখন মাত্র তিন পয়েন্টে।
রোববারের জমজমাট লড়াইয়ে দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে। শুরু থেকেই বল দখল, দ্রুত আক্রমণ এবং পাল্টা আক্রমণে ম্যাচের গতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে শেষ হাসি হেসেছে সফরকারী রিয়াল মাদ্রিদ। ম্যাচের ৮৭তম মিনিটে এমবাপ্পের নিখুঁত ফিনিশিংয়ে নিশ্চিত হয় গুরুত্বপূর্ণ জয়। গোলের পর রিয়াল খেলোয়াড়দের উচ্ছ্বাস আর ডাগআউটে কোচ হোসে মরিনহোর উদ্যাপন ম্যাচের উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
ম্যাচের প্রথম গোলটি আসে এমবাপ্পের পা থেকেই, যদিও তাতে ছিল ভাগ্যের ছোঁয়া। রিয়ালের গোছানো আক্রমণের একপর্যায়ে বার্সেলোনার ডিফেন্ডার জেরার্ড মার্টিনের ক্লিয়ারেন্স এমবাপ্পের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে প্রবেশ করে। তাতে এগিয়ে যায় সফরকারীরা।
গোলটি কিছুটা আকস্মিক হলেও ম্যাচের শুরু থেকে রিয়াল যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলছিল, তা ছিল স্পষ্ট। বার্সেলোনার শক্তিশালী আক্রমণভাগের বিপক্ষে শুধু রক্ষণ সামলানো নয়, বরং সুযোগ পেলেই পাল্টা আক্রমণে উঠে এসেছে তারা। এমবাপ্পের গতি ও বেলিংহামের সৃজনশীলতা বারবার চাপে ফেলেছে স্বাগতিকদের রক্ষণভাগকে।
তবে পিছিয়ে পড়ার পরও নিজেদের পরিকল্পনা থেকে সরে আসেনি বার্সেলোনা। নিজেদের মাঠে সমর্থকদের সামনে ম্যাচে ফেরার জন্য আক্রমণের ধার বাড়াতে থাকে হান্সি ফ্লিকের দল।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচে ফেরার লড়াইয়ে সফল হয় বার্সেলোনা। রাফিনিয়ার দ্রুতগতির শটে সমতায় ফেরে স্বাগতিকেরা। গোলের পর ম্যাচে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দুই দলই তখন জয়সূচক গোলের সন্ধানে মরিয়া হয়ে ওঠে।
সমতায় ফেরার পর বার্সেলোনার আক্রমণ আরও ধারালো হয়ে ওঠে। লামিনে ইয়ামালও গোলের সুযোগ তৈরি করেছিলেন। তার নেওয়া একটি শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে ম্যাচের ফল ভিন্ন হতে পারত।
এদিকে রাফিনিয়ার গোলের আগে একটি সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। ইয়ান ডিওমান্দের পায়ের পেশিতে হোয়াও ক্যানসেলোর স্টাড লাগার ঘটনায় রেফারি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন ওঠে। তবে সেই বিতর্ক পেছনে ফেলে দুই দলই ম্যাচের বাকি সময় জয়ের জন্য লড়াই চালিয়ে যায়।
ম্যাচের ৮৭তম মিনিটে আসে সেই মুহূর্ত, যা শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেয় এল ক্লাসিকোর ভাগ্য। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে দুর্দান্ত দক্ষতায় প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে আক্রমণ তৈরি করেন জুড বেলিংহাম। তার অসাধারণ নৈপুণ্যে তৈরি হওয়া সুযোগ থেকে এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গার কাটব্যাক পেয়ে বল জালে পাঠান এমবাপ্পে।
গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ফরাসি তারকার এই গোল রিয়ালকে এনে দেয় ২-১ ব্যবধানের লিড। ম্যাচের বাকি সময়ে আর সমতায় ফিরতে পারেনি বার্সেলোনা। শেষ বাঁশি বাজার পর রিয়াল শিবিরে শুরু হয় বাঁধভাঙা উল্লাস। কোচ মরিনহোও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফের উদ্যাপনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই জয়ের গুরুত্ব।
তিন বছর পর বার্সেলোনার মাঠে জয়
এই জয়ের আরেকটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। তিন বছর পর বার্সেলোনার মাঠে এল ক্লাসিকোতে জয়ের স্বাদ পেল রিয়াল মাদ্রিদ। প্রতিদ্বন্দ্বীর মাঠে এমন গুরুত্বপূর্ণ জয় শিরোপার লড়াইয়ে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে।
অন্যদিকে, বার্সেলোনার জন্য পরাজয়টি বেশ হতাশার। মৌসুমের শুরুতে টানা ১১ ম্যাচ জয়ের দুর্দান্ত ধারায় থাকা দলটি কয়েক দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয় ধাক্কা খেল। এর আগে চ্যাম্পিয়নস লিগে প্যারিস সেন্ট জার্মেইনের কাছে হারতে হয়েছিল তাদের। এবার ঘরের মাঠে রিয়ালের কাছে পরাজয় সেই হতাশা আরও বাড়িয়ে দিল।
বিশেষ করে সমতায় ফেরার পর জয়সূচক গোলের সুযোগ তৈরি করেও তা কাজে লাগাতে না পারা বার্সেলোনার জন্য বড় আক্ষেপ হয়ে থাকবে। শেষদিকে রক্ষণে সামান্য অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে ম্যাচ নিজেদের করে নেয় রিয়াল।
শিরোপার লড়াইয়ে বাড়ল উত্তাপ
এল ক্লাসিকোর এই ফল লা লিগার পয়েন্ট তালিকায়ও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। বার্সেলোনার সঙ্গে রিয়াল মাদ্রিদের ব্যবধান এখন তিন পয়েন্ট। অর্থাৎ, শীর্ষস্থান ধরে রাখতে বার্সেলোনাকে পরবর্তী ম্যাচগুলোতে আরও সতর্ক থাকতে হবে। অন্যদিকে, এই জয় রিয়ালকে শিরোপার দৌড়ে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেল।
দ্বিতীয় স্থানে থাকা আতলেতিকো মাদ্রিদও শীর্ষ দলের কাছাকাছি রয়েছে। ফলে শিরোপার লড়াই এখন আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সামনের ম্যাচগুলোতে পয়েন্ট হারানোর সামান্য সুযোগও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এমবাপ্পের গোল, বেলিংহামের অসাধারণ নৈপুণ্য আর শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা. সব মিলিয়ে এবারের এল ক্লাসিকো ছিল স্মরণীয় এক লড়াই। বার্সেলোনার মাঠে রিয়ালের এই জয় শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতার মর্যাদাই ধরে রাখেনি, বরং লা লিগার শিরোপার লড়াইকেও নিয়ে গেছে নতুন উত্তেজনার পর্যায়ে।
এখন দেখার বিষয়, এই গুরুত্বপূর্ণ জয়ের আত্মবিশ্বাস ধরে রেখে রিয়াল কতটা ধারাবাহিক হতে পারে, আর ঘরের মাঠের হার কাটিয়ে বার্সেলোনা কীভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। লা লিগার শিরোপার লড়াই যে এখনো অনেক বাকি, তা আরেকবার মনে করিয়ে দিল এমবাপ্পের শেষ মুহূর্তের সেই গোল।




