লর্ডসে ইংল্যান্ডকে ২৭০ রানের লজ্জায় ডোবালো ভারত

ঐতিহাসিক লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডে নিজেদের প্রথম নারী টেস্ট ম্যাচেই ইতিহাস গড়ল ভারত। স্বাগতিক ইংল্যান্ডকে ২৭০ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে এক স্মরণীয় জয় তুলে নিয়েছে সফরকারীরা। ম্যাচের চতুর্থ ও শেষ দিনে ভারতীয় স্পিনারদের দুর্দান্ত বোলিংয়ের সামনে মাত্র ৯৫ মিনিটেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে ইংল্যান্ডের ব্যাটিং লাইনআপ। এই জয়টি নারী টেস্ট ইতিহাসের চতুর্থ সর্বোচ্চ রানের ব্যবধানে জয় হিসেবে নথিবদ্ধ হয়েছে।

শেষ দিনের রোমাঞ্চ ও স্নেহ রানার ঘূর্ণি

চতুর্থ দিনে ইংল্যান্ডের জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ৩২৭ রান, হাতে ছিল মাত্র ৪ উইকেট। ১৩০ রানে ৬ উইকেট নিয়ে দিন শুরু করে ইংল্যান্ড।

অ্যামি জোনসের দ্রুত বিদায়: আগের দিনের ৫২ রানের সাথে মাত্র ২ রান যোগ করে দিনের শুরুতেই (চতুর্থ দিনের ১৮তম বলে) স্নেহ রানার শিকার হন অ্যামি জোনস। মিডউকেটে শেফালি বর্মার হাতে ক্যাচ দিয়ে তিনি সাজঘরে ফিরলে ইংল্যান্ডের টেল-এন্ডাররা পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।

এক্লেস্টোনের প্রতিরোধ ও পতন: ইংলিশ স্পিনার সোফি এক্লেস্টোন ব্যাট হাতে দুর্দান্ত প্রতিরোধ গড়ে খেলেন তার ক্যারিয়ারের প্রথম আন্তর্জাতিক হাফ-সেঞ্চুরি (৫০ রান)। ৬১ বলে ফিফটি ছোঁয়ার ঠিক পরেই স্নেহ রানার একটি ঘূর্ণি বল তার রক্ষণ ভেঙে স্ট্যাম্প উড়িয়ে দেয়। এটি ছিল ইনিংসে রানার চতুর্থ এবং ম্যাচে ষষ্ঠ উইকেট।

লোয়ার অর্ডারের ব্যর্থতা: লরেন ফাইলার ২২ বল খেলে ১টি চারের সাহায্যে ৪ রান করে অপরাজিত থাকেন। তবে অন্যদিকে ইসি অং ৩৩ বল খেলে মাত্র ১ রান করার পর দীপ্তি শর্মার করা দিনের পঞ্চম বলেই বোল্ড হন।

বেলকে ফিরিয়ে জয় নিশ্চিত: পেটের পেশির ব্যথার কারণে তৃতীয় দিন ফিল্ডিং করতে না পারা লরেন বেল ব্যাট করতে নামলেও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। দীপ্তি শর্মার দুর্দান্ত এক টার্নিং ডেলিভারিতে বোল্ড হয়ে ব্যক্তিগত ০ রানে বিদায় নেন তিনি। দীপ্তি মাত্র ৭ বলের ব্যবধানে শেষ দুটি উইকেট শিকার করেন।

বিদায়ী তারকাদের হতাশা

ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক হেদার নাইট এবং ওপেনার ট্যামি বিউমন্ট এই ম্যাচের আগেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। বিদায়ী ম্যাচটি রঙিন করতে পারেননি কেউই। দ্বিতীয় ইনিংসে নাইট মাত্র ১৩ রান করে আউট হন এবং বিউমন্ট আউট হন গোল্ডেন ডাক (০) মেরে।

প্রথম ইনিংস থেকেই ভারতের আধিপত্য

ইংল্যান্ড টস জিতে ভারতকে প্রথমে ব্যাটিংয়ে পাঠালেও ভারতীয় ব্যাটাররা শুরু থেকেই ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন। স্মৃতি মান্ধানার ৮৩, অধিনায়ক হারমানপ্রীতের ৫৮ এবং দীপ্তি শর্মার ৫৭ রানের ওপর ভর করে প্রথম ইনিংসে ২৮৫ রান তোলে ভারত।

জবাবে ভারতীয় পেসার ক্রান্তি গৌড়ের বিধ্বংসী স্পেলের (৫/৩৭) সামনে ১৭০ রানেই গুটিয়ে যায় ইংল্যান্ড। ফলে প্রথম ইনিংসেই ১১৫ রানের বড় লিড পায় ভারত।

দ্বিতীয় ইনিংসে ইয়াস্তিকা ভাটিয়ার দুর্দান্ত ১১৩ রান, স্মৃতি মান্ধানার ৭০ এবং রিচা ঘোষের অপরাজিত ৫০ রানের ওপর ভর করে ৭ উইকেটে ৩৪১ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে ভারত। ইংল্যান্ডের সামনে পাহাড়সম ৪৫৭ রানের লক্ষ্য দাঁড় করায় তারা।

তৃতীয় দিন শেষ বিকেলেই ভারতের দুই পেসার ক্রান্তি গৌড় ও সায়ালি সাতঘরে ইংল্যান্ডের টপ অর্ডারে আঘাত হেনে ৪টি উইকেট ভাগ করে নেন। বাকি কাজটুকু শেষ দিনে সেরে নেন স্পিনার স্নেহ রানা ও দীপ্তি শর্মা। পুরো ম্যাচ জুড়ে দাপট বজায় রেখে লর্ডসের মাটিতে এক ঐতিহাসিক জয়ের লাল গালিচায় পা রাখল ভারতীয় নারী ক্রিকেট দল।

ম্যাচের সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড:

  • ভারত (প্রথম ইনিংস): ২৮৫/১০ (স্মৃতি মান্ধানা ৮৩, হারমানপ্রীত কৌর ৫৮, দীপ্তি শর্মা ৫৭)
  • ইংল্যান্ড (প্রথম ইনিংস): ১৭০/১০ (অ্যামি জোনস ৫২; ক্রান্তি গৌড় ৫-৩৭)
  • ভারত (দ্বিতীয় ইনিংস): ৩৪১/৭ ডিক্লেয়ার্ড (ইয়াস্তিকা ভাটিয়া ১১৩, স্মৃতি মান্ধানা ৭০, রিচা ঘোষ ৫০*; সোফি এক্লেস্টোন ৫-১১৮)
  • ইংল্যান্ড (দ্বিতীয় ইনিংস): ১৮৬/১০ (অ্যামি জোনস ৫৪, সোফি এক্লেস্টোন ৫০; স্নেহ রানা ৪-৪২)
  • ফলাফল: ভারত ২৭০ রানে জয়ী।

লর্ডসের অনার্স বোর্ডে চার নাম

এই ম্যাচে অসাধারণ পারফরম্যান্সের সুবাদে লর্ডসের বিখ্যাত ‘অনার্স বোর্ডে’ নাম লিখিয়েছেন চারজন ক্রিকেটার:

  1. ইয়াস্তিকা ভাটিয়া (ভারত): দ্বিতীয় ইনিংসে ১১৩ রানের অনবদ্য সেঞ্চুরি করে ব্যাটিং অনার্স বোর্ডে নিজের নাম তোলেন।
  2. ক্রান্তি গৌড় (ভারত): প্রথম ইনিংসে ৩৭ রান দিয়ে ৫ উইকেট নিয়ে দ্বিতীয় দিনেই বোলিং অনার্স বোর্ডে নাম লেখান।
  3. সোফি এক্লেস্টোন (ইংল্যান্ড): ভারতের দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়ে অনার্স বোর্ডে নিজের নাম যুক্ত করেন।
  4. সায়ালি সাতঘরে (ভারত): প্রথম ইনিংসে দারুণ বোলিং করে অবদান রাখেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles