লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারে অর্জনের ঝুলি এতটাই সমৃদ্ধ যে নতুন করে আর কী পাওয়ার থাকতে পারে- এমন প্রশ্ন প্রায়ই ওঠে। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, চ্যাম্পিয়নস লিগ, রেকর্ড আটটি ব্যালন ডি’অর, বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসন-সবই নিজের করে নিয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। তবু এত দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে একটি অপূর্ণতা রয়ে গিয়েছিল। সেটি হলো ইংল্যান্ড জাতীয় দলের বিপক্ষে কখনো না খেলা।
সেই অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে ২০২৬ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে। আটলান্টায় ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা, আর ৩৯ বছর বয়সে প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ড জাতীয় দলের বিপক্ষে মাঠে নামবেন মেসি।
সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা এবং নরওয়েকে হারিয়ে ইংল্যান্ড শেষ চারে জায়গা করে নেওয়ার পরই নিশ্চিত হয়েছে বহু প্রতীক্ষিত এই দ্বৈরথ। বিশ্ব ফুটবলের দুই ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াইয়ে এবার যুক্ত হচ্ছে মেসির নামও।
ইংলিশ ক্লাবের বিপক্ষে সাফল্য
অবশ্য ক্লাব ফুটবলে ইংলিশ দলগুলোর বিপক্ষে মেসির অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের। বার্সেলোনার জার্সিতে তিনি খেলেছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, চেলসি, লিভারপুল, আর্সেনাল ও ম্যানচেস্টার সিটির মতো ক্লাবগুলোর বিপক্ষে। বিশেষ করে ২০১০ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগে আর্সেনালের বিপক্ষে চার গোলের অবিস্মরণীয় ম্যাচটি এখনও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় পারফরম্যান্স হিসেবে বিবেচিত।
সব মিলিয়ে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোর বিপক্ষে ৩৬ ম্যাচে মেসির গোল ২৭টি, সঙ্গে রয়েছে ৬টি অ্যাসিস্ট। কিন্তু ক্লাব পর্যায়ে এত সাফল্য থাকলেও ইংল্যান্ড জাতীয় দলের বিপক্ষে কখনো মাঠে নামার সুযোগ হয়নি তার।
এর পেছনে রয়েছে এক বিরল কাকতালীয় ঘটনা। আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড সর্বশেষ মুখোমুখি হয়েছিল ২০০৫ সালের নভেম্বরে। তার মাত্র তিন মাস আগে হাঙ্গেরির বিপক্ষে আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়েছিল মেসির। কিন্তু সেই ম্যাচে লাল কার্ড দেখায় নিষেধাজ্ঞার কারণে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলতে পারেননি তিনি। এরপর দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কোনো টুর্নামেন্ট বা প্রীতি ম্যাচে আর মুখোমুখি হয়নি দুই দল। ফলে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মেসির না খেলার বিষয়টি এখন এক ব্যতিক্রমী পরিসংখ্যানে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথের ইতিহাসও রোমাঞ্চে ভরা। ১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ ফুটবল ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এরপর ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড কিংবা ২০০২ সালে ইংল্যান্ডের জয়-প্রতিবারই এই লড়াই বিশ্ব ফুটবলে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
মেসির জন্ম ১৯৮৭ সালে হওয়ায় ১৯৮৬ সালের সেই ঐতিহাসিক ম্যাচ সরাসরি দেখার সুযোগ হয়নি। তবে আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা এই তারকা জানিয়েছেন, ভিডিও, ছবি এবং মানুষের মুখে মুখেই সেই ম্যাচের স্মৃতি তার কাছে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এক সাক্ষাৎকারে মেসি বলেন, ‘১৯৮৬ সালের ম্যাচের যত স্মৃতি আমার আছে, সবই ভিডিও আর ছবির মাধ্যমে। আর্জেন্টিনার মানুষ এখনও সেই ম্যাচগুলো বারবার দেখে এবং স্মরণ করে।’
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ নিয়ে মেসি বলেন, প্রতিপক্ষ যে-ই হোক, আমরা নিজেদের ফুটবলই খেলতে চাই। তবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলাটা অবশ্যই বিশেষ। তারা বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। ইংল্যান্ড ছাড়া প্রায় সব বড় দলের বিপক্ষেই খেলেছি। তাই ব্যক্তিগতভাবেও এই ম্যাচটি আমার জন্য আলাদা গুরুত্ব বহন করে।’
ছন্দে মেসি
চলতি বিশ্বকাপেও দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। এখন পর্যন্ত আট গোল করে তিনি কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে যৌথভাবে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক দিয়ে গোলযাত্রা শুরু করা মেসি পরে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করেন। এছাড়া জর্ডান, কেপ ভার্দে ও মিসরের বিপক্ষে একটি করে গোল করেছেন। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে গোল না পেলেও সতীর্থকে দিয়ে একটি গোল করিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই সেমিফাইনাল শুধু আর্জেন্টিনার জন্য ফাইনালে ওঠার লড়াই নয়; এটি মেসির ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারেও এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রথমবার নিজের নাম লেখানোর সুযোগটি তাই তার জন্যও হয়ে উঠেছে বিশেষ তাৎপর্যের।


