আদিল রশিদের ঘূর্ণিতে ৯২ রানের জয়
প্রস্তুতি ম্যাচে ইংল্যান্ডের বড় জয়। অস্ট্রেলিয়া সফরে ওয়ানডে সিরিজ শুরুর আগে নিজেদের ঝালিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি ম্যাচে দারুণ জয় পেয়েছে ইংল্যান্ড। পার্থের ঐতিহ্যবাহী ওয়াকা (WACA) গ্রাউন্ডে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়াকে ৯২ রানে হারিয়েছে হ্যারি ব্রুকের দল। ইংল্যান্ডের জয়ে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছেন লেগ স্পিনার আদিল রশিদ। বল হাতে ৩৫ রান খরচায় ৪ উইকেট নিয়ে প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামান তিনি। এ ছাড়া জোফরা আর্চারও নিয়েছেন ৩ উইকেট।
প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ৪৮ ওভারে ২৫১ রান করে অলআউট হয় ইংল্যান্ড। জবাবে রশিদ ও আর্চারের দুর্দান্ত বোলিংয়ে মাত্র ১৫৯ রানেই গুটিয়ে যায় ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস। ফলে ৯২ রানের স্বস্তিদায়ক জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে সফরকারীরা।
ইংল্যান্ডের হয়ে ব্যাট হাতে সর্বোচ্চ ৫৯ রান করেন ওপেনার বেন ডাকেট। ৬৬ বলের ইনিংসে ছিল তাঁর ধৈর্য ও আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের মিশ্রণ। তবে ইংল্যান্ডের টপ অর্ডার খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। প্রথম ছয় ব্যাটারের মধ্যে একমাত্র ডাকেটই ৩০ রানের ঘর পার করতে পেরেছেন। একপর্যায়ে ৪০ রানের মধ্যে ৪ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে ইংলিশরা।
সেখান থেকে দলকে বিপর্যয় থেকে টেনে তোলেন লিয়াম ডসন ও উইল জ্যাকস। অষ্টম উইকেটের আগে গুরুত্বপূর্ণ ৫৯ রানের জুটি গড়েন তাঁরা। জ্যাকসের আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি ডসনের অপরাজিত ৪৪ রানের ইনিংসে আড়াইশ রানের সংগ্রহ পায় ইংল্যান্ড। ডসনের ব্যাটিং ছিল দলের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নিচের সারিতে নেমে তিনি ইনিংসের শেষ পর্যন্ত অপরাজিত ছিলেন।

ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন ব্রডি কাউচ। ৪৭ রান দিয়ে ৪ উইকেট নেন তিনি। ল্যান্স মরিস ২৯ রান খরচায় শিকার করেন ৩ উইকেট। দীর্ঘদিন চোটের কারণে মাঠের বাইরে থাকার পর দলে ফিরে নিজের গতি ও আগ্রাসনের পরিচয় দিয়েছেন মরিস। ঘণ্টায় প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার গতিতে বল করে ইংল্যান্ডের ব্যাটারদের বেশ ভুগিয়েছেন তিনি।
ব্যাটিংয়ে ইংল্যান্ডের ইনিংসে অধিনায়ক হ্যারি ব্রুকের একটি ছক্কা ছিল দিনের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। অ্যাশটন আগারের বলে পরপর তিনটি ছক্কা হাঁকান তিনি। এর মধ্যে একটি ছক্কা গিয়ে পড়ে ওয়াকা গ্রাউন্ডের নতুন আউটডোর সুইমিং পুলে। চলতি বছরের শুরুতে চালু হওয়া এই জলক্রীড়া এলাকায় বল পাঠানোর ইচ্ছা আগের দিনই প্রকাশ করেছিলেন ব্রুক। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই ইচ্ছা পূরণ হওয়ায় গ্যালারিতে থাকা দর্শকদের মধ্যেও তৈরি হয় বাড়তি উচ্ছ্বাস।
ব্রেন্ডন ম্যাককালামের স্বাকারোক্তি
তবে ব্যাট হাতে ইংল্যান্ডের সংগ্রহ প্রত্যাশার চেয়ে কিছুটা কম ছিল। পিচে গতি ও বাউন্স থাকায় দুই দলের ব্যাটারদের জন্যই কাজটা সহজ ছিল না। ইংল্যান্ডের প্রধান কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ম্যাচ শেষে স্বীকার করেছেন, ব্যাটিংয়ে তাঁর দল বেশ চাপে ছিল।
ম্যাককালাম বলেন, ‘এটি কিছুটা লড়াই করে পাওয়া জয়। ব্যাট হাতে আমাদের বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। প্রতিপক্ষ আমাদের ওপর অনেক চাপ তৈরি করেছিল। আমরা এমন একটি পিচে কোনো রকমে লড়াই করে ২৫১ রান তুলেছি, যেখানে আমাদের ধারণা ছিল ২৭৫ থেকে ২৮০ রান হতে পারে ভালো সংগ্রহ।’
তবে বোলারদের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন ইংল্যান্ডের প্রধান কোচ। বিশেষ করে দ্বিতীয় ইনিংসে বোলারদের কার্যকর ভূমিকা এবং ফিল্ডিংয়ের তীব্রতা তাঁর নজর কেড়েছে।
ম্যাককালামের মতে, ‘আমাদের স্পিন বিকল্পগুলো নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট। অতিরিক্ত একজন বোলার খেলানোর সুযোগও কাজে লাগাতে পেরেছি। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যবহার করার মতো বেশ কিছু কার্যকর অস্ত্র আমাদের হাতে ছিল। বোলাররা দারুণ কাজ করেছে এবং ফিল্ডিংয়ে দলের তীব্রতাও ছিল অসাধারণ।’
ইংল্যান্ডের বোলিং আক্রমণে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিলেন অ্যাডিল রশিদ। পাকিস্তান সফরে তিনটি ওয়ানডেতে সুযোগ না পাওয়ার পর এই প্রস্তুতি ম্যাচে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন অভিজ্ঞ এই লেগ স্পিনার। ৭.৩ ওভার বল করে মাত্র ৩৫ রান দিয়ে ৪ উইকেট তুলে নেন তিনি। ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার মিডল অর্ডারকে কার্যত একাই ধসিয়ে দেন রশিদ।

তাঁর শিকার হন জেইডেন গুডউইন ও অধিনায়ক অ্যাশটন টার্নার। টানা দুই বলে এই দুই ব্যাটারকে ফিরিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ইংল্যান্ডের হাতে তুলে দেন তিনি।
রশিদের পারফরম্যান্সের প্রশংসা করে ম্যাককালাম বলেন, ‘রশিদ অসাধারণ বোলিং করেছে। দীর্ঘদিন ধরেই সে আমাদের জন্য বিশ্বমানের একজন বোলার। পাকিস্তানের কন্ডিশনে লেগ স্পিনের চেয়ে বাঁহাতি স্পিন বেশি কার্যকর হওয়ায় আমরা অন্য বিকল্প বেছে নিয়েছিলাম। তবে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে কন্ডিশন বিবেচনা করেই আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’
রশিদের পাশাপাশি জোফরা আর্চারও ছিলেন দুর্দান্ত। পাকিস্তানে ত্রিদেশীয় সিরিজে বিশ্রামে থাকার পর এই ম্যাচ দিয়ে মাঠে ফেরেন তিনি। ৮ ওভার বল করে ৩৪ রান দিয়ে নেন ৩ উইকেট। নতুন বলে তাঁর গতিময় বোলিংয়ের সামনে শুরু থেকেই চাপে পড়ে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া।
ইনিংসের শুরুতেই আর্চারের দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন জোয়েল কার্টিস। পিচের বাউন্স কাজে লাগিয়ে বলটি ব্যাটারের দিকে উঠে আসে এবং ব্যাটের স্পর্শ নিয়ে উইকেটরক্ষকের হাতে জমা পড়ে। আর্চারের সেই আঘাতেই ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং বিপর্যয়ের সূচনা।
তবে শুরুতে প্রতিরোধ গড়েছিলেন ক্যামেরন ব্যানক্রফট ও স্যাম হোয়াইটম্যান। দীর্ঘদিন ধরে শেফিল্ড শিল্ডে একসঙ্গে ওপেন করা এই দুই ব্যাটার নতুন বল সামলে দলকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। ব্যানক্রফট ৩২ রান করে জেমি ওভারটনের বলে আউট হন। এরপর হোয়াইটম্যানকেও ফিরিয়ে দেন ওভারটন। ফলে আবারও চাপে পড়ে স্বাগতিকরা।
এরপর রশিদের ঘূর্ণিতে দ্রুত উইকেট হারাতে থাকে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া। মিডল অর্ডারে একের পর এক ব্যাটারকে ফিরিয়ে ম্যাচের ভাগ্য কার্যত নির্ধারণ করে দেন তিনি। শেষদিকে আর্চার ফিরে আরও দুটি উইকেট তুলে নিলে ৩২.৩ ওভারেই ১৫৯ রানে অলআউট হয় ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া। দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৪১ রান করেন ওয়াসলি।
উল্লেখ্য, ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছে ওয়াকা গ্রাউন্ডের সংস্কারকৃত মাঠে, যেখানে দীর্ঘদিন পর পুরুষদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে বড় দর্শক উপস্থিতি দেখা গেছে। ম্যাচটি উপভোগ করতে মাঠে উপস্থিত ছিলেন ৫ হাজার ৫৫ জন দর্শক। ২০১৭-১৮ মৌসুমের পর ওয়াকা গ্রাউন্ডে এটিই ছিল সর্বোচ্চ দর্শক উপস্থিতি। পুরুষদের টেস্ট ও বিগ ব্যাশ লিগের ম্যাচগুলো কাছের অপটাস স্টেডিয়ামে স্থানান্তরিত হওয়ার পর ঐতিহ্যবাহী এই মাঠে এমন দর্শক সমাগম ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
সব মিলিয়ে প্রস্তুতি ম্যাচে ইংল্যান্ডের ব্যাটিংয়ে কিছু দুর্বলতা থাকলেও বোলিং বিভাগে নিজেদের শক্তির পরিচয় দিয়েছে দলটি। বিশেষ করে রশিদের চার উইকেট এবং আর্চারের তিন উইকেট অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আসন্ন ওয়ানডে সিরিজের আগে ইংলিশ শিবিরে আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। আগামী সপ্তাহে অপটাস স্টেডিয়ামে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে মাঠে নামার আগে এই জয়কে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি হিসেবেই দেখছে ইংল্যান্ড।
সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড:
ইংল্যান্ড — ২৫১ অলআউট (৪৮ ওভার)
- বেন ডাকেট — ৫৯ (৬৬ বল)
- লিয়াম ডসন — ৪৪*
- ব্রডি কাউচ — ৪/৪৭
- ল্যান্স মরিস — ৩/২৯
ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া — ১৫৯ অলআউট (৩২.৩ ওভার)
- ওয়াসলি — ৪১
- ক্যামেরন ব্যানক্রফট — ৩২
- অ্যাডিল রশিদ — ৪/৩৫
- জোফরা আর্চার — ৩/৩৪
ফলাফল: ইংল্যান্ড ৯২ রানে জয়ী।
ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়: অ্যাডিল রশিদ (৪/৩৫)




