বাংলা নববর্ষের উৎসবের আবহ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। তবে রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় ধীরে ধীরে ফিরছে স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য। এরই মধ্যে বুধবার দুপুরে এক ব্যতিক্রমী দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ভবন। দেশের ঘরোয়া লিগে খেলা প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জন আন্দোলনে আবাহনী-মোহামেডানের ফুটবলাররা সেখানে জড়ো হন তাদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে।
তারা বাফুফে সভাপতি বরাবর একটি স্মারকলিপি জমা দেন। এটি গ্রহণ করেছেন বাফুফের সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন তুষার।
বর্তমান মৌসুমে বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলে একটি নতুন নীতি বাস্তবায়ন করা হয়েছে, যেখানে সার্কভুক্ত দেশগুলোর ফুটবলারদের স্থানীয় খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং প্রতিযোগিতার মান বাড়ানোর লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই নীতির বিরোধিতা করছেন দেশীয় ফুটবলাররা। তাদের মতে, এই ব্যবস্থার ফলে স্থানীয় খেলোয়াড়দের খেলার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।
জাতীয় দল ও আবাহনী লিমিটেডের মিডফিল্ডার মোহাম্মদ ইব্রাহিম এ প্রসঙ্গে বলেন,
একটি দলে একসঙ্গে পাঁচজন সার্ক অঞ্চলের খেলোয়াড় এবং তিনজন অন্যান্য বিদেশি খেলোয়াড় রাখা হলে কার্যত স্থানীয় খেলোয়াড়দের সুযোগ কমে যায়।
তার মতে,
এতে করে একটি দলে সর্বোচ্চ দুইজন দেশীয় খেলোয়াড় নিয়মিত একাদশে সুযোগ পেতে পারে, যা দেশের ফুটবলের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।
অন্যদিকে, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ডিফেন্ডার এবং জাতীয় দলের খেলোয়াড় রহমত মিয়াও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন,
বাংলাদেশি খেলোয়াড়রা এখনো অন্যান্য সার্কভুক্ত দেশের লিগে সেইভাবে সুযোগ পাচ্ছেন না। বর্তমানে কেবল তারিক কাজী ভুটানের একটি লিগে খেলছেন। ফলে এই নীতির মাধ্যমে বিদেশি খেলোয়াড়রা বাংলাদেশে সুযোগ পেলেও দেশের খেলোয়াড়রা সমানভাবে উপকৃত হচ্ছেন না।
চলতি মৌসুমে দেশের শীর্ষ লিগে মোট ১০টি ক্লাব অংশগ্রহণ করছে। ঐতিহ্যবাহী দুই ক্লাব আবাহনী লিমিটেড ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব কোনো সার্ক অঞ্চলের খেলোয়াড় দলে অন্তর্ভুক্ত করেনি।
তবে স্মারকলিপি জমা দিতে আসা খেলোয়াড়দের মধ্যে এই দুই ক্লাবের সদস্যরাই ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ। অনেকের মতে, এই প্রতিবাদের পেছনে ক্লাবভিত্তিক স্বার্থও জড়িত থাকতে পারে।
বিশেষ করে ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবে একাধিক সার্ক অঞ্চলের খেলোয়াড়ের উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দলটি সম্প্রতি পাকিস্তানি এক ফুটবলারের একমাত্র গোলে জয় পেয়ে গ্রুপসেরা হয়েছে, যা তাদের সাফল্যে সার্ক খেলোয়াড়দের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এর ফলে আবাহনীর মতো শক্তিশালী দলও শেষ চারে ওঠা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
যা আছে ফুটবলারদের স্মারকলিপিতে
ফুটবলারদের দেওয়া স্মারকলিপিতে শুধু সার্ক কোটা বাতিল নয়, আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-দেশীয় খেলোয়াড়দের জন্য অধিক খেলার সুযোগ নিশ্চিত করা, দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে স্থানীয় ফুটবলার তৈরি করা, লিগে অংশ গ্রহণকারী দলের সংখ্যা বৃদ্ধি, খেলোয়াড়দের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিদেশি খেলোয়াড় কোটা হ্রাস করা।
উল্লেখ্য, বর্তমানে একটি ক্লাব সর্বোচ্চ পাঁচজন সার্ক অঞ্চলের এবং পাঁচজন অন্যান্য বিদেশি খেলোয়াড় নিবন্ধন করতে পারে। এর মধ্যে একাদশে সর্বোচ্চ তিনজন বিদেশি খেলোয়াড় রাখা যায়। এদের মধ্যে কাউকে বদলি করা হলে সে জায়গায় একজন বিদেশী খেলোয়াড়কেই প্রয়োজনে মাঠে নামানো যায়। এছাড়া একাদশে একজন অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবলার রাখার নিয়মও চালু রয়েছে।
সব মিলিয়ে, নতুন এই নীতি দেশের ফুটবলে একদিকে যেমন প্রতিযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে দেশীয় খেলোয়াড়দের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এখন দেখার বিষয়, ফুটবলারদের এই দাবির প্রেক্ষিতে বাফুফে কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং তা দেশের ফুটবলের উন্নয়নে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
