শেষ ষোলতে আর্জেন্টিনা – আত্নঘাতি গোলে হারলো কেপ ভার্দে

ফুটবল বিধাতা হয়তো আজ মায়ামির মাঠে রোমাঞ্চের সবটুকু ঢেলে দিয়েছিলেন! লড়াকু ফুটবল, বিশ্বরেকর্ড, বিশ্বমানের গোল আর শেষ মুহূর্তের চরম নাটকীয়তা, কী ছিল না এই ম্যাচে! বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করল পুচকে কেপ ভার্দে। কিন্তু ১২০ মিনিটের মহাকাব্যিক লড়াই শেষে ফুটবল রূপকথার সমাপ্তি ঘটল এক বুকভাঙ্গা বিষাদে। অতিরিক্ত সময়ের একদম শেষ মুহূর্তে আত্মঘাতী গোলের চরম ট্র্যাজেডিতে ৩-২ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল ‘ব্লু শার্কস’রা। আর এই শ্বাসরুদ্ধকর জয়ের পর কেপ ভার্দের হৃদয় ভেঙে বিশ্বকাপের শেষ ষোল-এর টিকিট নিশ্চিত করল লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা।

প্রথমার্ধে মেসির বিশ্বরেকর্ড ও জাদুকরী গোল

ম্যাচের শুরু থেকেই মায়ামি স্টেডিয়ামের গ্যালারি কাঁপানো গগনবিদারী আওয়াজ ছিল আর্জেন্টিনা সমর্থকদের। তবে মাঠের লড়াইয়ে ফেবারিট আর্জেন্টিনাকে শুরু থেকেই বোতলবন্দী করে রেখেছিল কেপ ভার্দের রক্ষণভাগ। ২৫ মিনিটের অফিশিয়াল হাইড্রেশন ব্রেকের আগ পর্যন্ত মেসির পায়ে বল আসতেই দিচ্ছিল না তারা।

কিন্তু বিরতি থেকে ফিরেই জাদুর কাঠি স্পর্শ করালেন লিওনেল মেসি। ২৯ মিনিটে লাউতারো মার্তিনেসের বাড়ানো বলকে অসাধারণ টেকনিকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে, ডিফেন্ডারদের ফাঁকি দিয়ে বুলেট গতির ফিনিশিংয়ে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলের লিড এনে দেন অধিনায়ক। এটি ছিল চলতি বিশ্বকাপে মেসির সপ্তম গোল। আর এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপের ইতিহাসে ১৪টি ভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে গোল করার অনন্য এক মহাজাগতিক রেকর্ড গড়লেন এই খুদে জাদুকর।

দুয়ার্তের কামড় ও নির্ধারিত সময়ের নাটক

১-০ গোলে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নেমেই খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে কেপ ভার্দে। আর্জেন্টিনার অল-আউট ফুটবলের চড়া মূল্য দিতে বেশি সময় নেয়নি তারা। ৫৯ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে দেরয় দুয়ার্তের এক চোখ ধাঁধানো কোণাকুণি শট আর্জেন্টিনার বিশ্বস্ত গোলরক্ষক ‘দিবু’ মার্তিনেসকে পরাস্ত করে পোস্টের কোণা দিয়ে জালে জড়ায়।

১-১ সমতায় ফেরে ম্যাচ! এরপর বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা একের পর এক আক্রমণের জোয়ার বইয়ে দিলেও ইস্পাতকঠিন দেয়ালে রূপ নেওয়া কেপ ভার্দের রক্ষণভাগ নির্ধারিত ৯০ মিনিট পর্যন্ত ম্যাচটিকে ১-১ সমতায় ধরে রাখে।

অতিরিক্ত সময়ের রোলারকোস্টার ও কাবরালের পাল্টা আঘাত

ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়াতেই বাড়ে স্নায়ুচাপ। প্রথম গোলের অ্যাসিস্ট দাতা আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেস কর্নার থেকে উড়ে আসা বল ব্যাক-পোস্টে পেয়ে দুর্দান্ত এক টাচে নিয়ন্ত্রণে নেন এবং জোরালো শটে (৯২ মিনিট) গোলরক্ষক ভোজিনহাকে পরাস্ত করে আর্জেন্টিনাকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে নেন।

আর্জেন্টাইন সমর্থকরা যখন কোয়ার্টার ফাইনালের সুবাস পেতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই মায়ামিকে স্তব্ধ করে দেন লোপেস কাবরাল। ফুটবল রূপকথা লিখে দুর্দান্ত এক কাউন্টার অ্যাটাক থেকে কেপ ভার্দেকে আবারও ২-২ গোলের অবিশ্বাস্য সমতায় ফেরান তিনি (১০৩ মিনিট। ম্যাচ তখন নিশ্চিতভাবেই পেনাল্টি শুট-আউটের দিকে এগোচ্ছিল।

শেষ মুহূর্তের আত্মঘাতী ট্র্যাজেডি ও আর্জেন্টিনার উল্লাস

যখন মনে হচ্ছিল ম্যাচ টাইব্রেকারেই গড়াবে, ঠিক তখনই ঘটল সেই হৃদয়বিদারক ঘটনা। অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তের খেলায় আর্জেন্টিনার একটি বিপজ্জনক ক্রস ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজেদের জালেই বল পাঠিয়ে দেন কেপ ভার্দেরই ডিফেন্ডার ডিনেই বোর্জেস। পুরো ম্যাচ জুড়ে বীরের মতো লড়াই করা কেপ ভার্দে গোলরক্ষক ভোজিনহা কেবল চেয়ে চেয়ে দেখলেন বলটি কীভাবে তাদের স্বপ্ন গুঁড়িয়ে জালে জড়িয়ে গেল।

এই আত্মঘাতী গোলের সুবাদে ৩-২ ব্যবধানের এক অবিশ্বাস্য ও শ্বাসরুদ্ধকর জয় পায় আর্জেন্টিনা। মাঠের মধ্যেই কান্নায় ভেঙে পড়েন কেপ ভার্দের খেলোয়াড়রা, অন্যদিকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে উদযাপনে মাতে আর্জেন্টিনা।

শেষ ষোলতে প্রতিপক্ষ মিশর

এই মহানাটকীয় জয়ের পর কোয়ার্টার ফাইনালের (রাউন্ড অব ১৬) মঞ্চে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ আফ্রিকার পরাশক্তি মিশর, যারা ইতিমধ্যেই টাইব্রেকারে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে অপেক্ষা করছে। মায়ামির এই অগ্নিপরীক্ষা পার হওয়ার পর, মিশরের বিরুদ্ধে মেসিরা কেমন রণকৌশল সাজান, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব!

Exit mobile version