মাদ্রিদ ডার্বিতে উত্তেজনা, তর্ক-বিতর্ক, লাল কার্ড আর দারুণ ফুটবলের এক জমজমাট লড়াইয়ে রিয়াল মাদ্রিদকে ২-১ গোলে হারিয়েছে আতলেতিকো মাদ্রিদ। এই জয়ের ফলে লা লিগার পয়েন্ট টেবিলে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়ালকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে আতলেতিকো।
ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে দ্বিতীয়ার্ধে। বক্সের ঠিক বাইরে আতলেতিকোর জুলিয়ানো সিমিওনেকে ফাউল করে বসেন রিয়ালের ডিফেন্ডার ডিন হুইজসেন। প্রথমে ঘটনাটি নিয়ে মাঠেই উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে ভিএআর পর্যালোচনার পর হুইজসেনকে সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হয়। ১০ জনের দলে পরিণত হয় রিয়াল মাদ্রিদ।
সেই সুযোগ হাতছাড়া করেনি আতলেতিকো। ফাউলটি পেনাল্টি হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় স্পট-কিক থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন আলেহান্দ্রো গ্রিমালদো। এরপর এক খেলোয়াড় কম নিয়ে রিয়ালকে আরও চাপে ফেলে আতলেতিকো।
সিমিওনের ক্রসে ডেভিডের গোল
রিয়াল তখন সমতা ফেরানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু উল্টো আতলেতিকোই পেয়ে যায় দ্বিতীয় গোল।
জুলিয়ানো সিমিওনের ক্রস থেকে বল পেয়ে দারুণ স্লাইডিং ফিনিশিংয়ে বল জালে পাঠান জোনাথন ডেভিড। এটি লা লিগায় চলতি মৌসুমে তিন ম্যাচে তার তৃতীয় গোল।
ডেভিডের এই গোল আতলেতিকোর জয়কে অনেকটাই নিশ্চিত করে দেয়। দুই গোলের লিড পাওয়ার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ়ভাবে নিজেদের হাতে নেয় স্বাগতিকরা।
আলভারেজকে ঘিরে দর্শকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
দ্বিতীয় গোলের পর আতলেতিকো জুলিয়ান আলভারেজকে মাঠে নামায়। গ্রীষ্মের দলবদলের সময় বার্সেলোনায় যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মাঠে নামার সময় সমর্থকদের একাংশের কাছ থেকে তাকে দুয়োধ্বনি শুনতে হয়।
তবে মাঠে নামার পর ম্যাচের ফল বদলে দেওয়ার মতো প্রভাব ফেলতে পারেননি তিনি। আতলেতিকো নিজেদের লিড ধরে রেখে রক্ষণ সামলাতে থাকে।
রুডিগারের গোলে রিয়ালের শেষ চেষ্টা
১০ জনের রিয়াল মাদ্রিদ শেষ পর্যন্ত ম্যাচে ফেরার সুযোগ তৈরি করে। বার্নার্দো সিলভার ফ্রি-কিক থেকে দারুণ হেডে গোল করেন আন্তোনিও রুডিগার।
গোলটি ম্যাচে নতুন উত্তেজনা তৈরি করে। ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে থাকা আতলেতিকোর ওপর চাপ বাড়াতে থাকে রিয়াল। শেষ মুহূর্তে সমতা ফেরানোর জন্য একের পর এক আক্রমণ চালায় তারা।
কিন্তু আতলেতিকোর রক্ষণ আর ভাঙতে পারেনি রিয়াল। ফলে ২-১ গোলের জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে স্বাগতিকরা।
প্রথমার্ধে রুক্ষ লড়াই
প্রথমার্ধে দুই দলের ফুটবল ছিল বেশ অগোছালো এবং শারীরিক লড়াইয়ে ভরা। ম্যাচের উত্তাপ এতটাই বেশি ছিল যে আতলেতিকো কোচ ও কয়েকজন খেলোয়াড়কেও হলুদ কার্ড দেখতে হয়।
ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর একটি ফাউল নিয়েও বড় বিতর্ক তৈরি হয়। জুড বেলিংহ্যামের ওপর ফাউলের ঘটনায় ভিএআর পর্যালোচনা করা হয়। শেষ পর্যন্ত রোমেরো লাল কার্ড থেকে বেঁচে যান।
বিরতির আগে কোনো দলই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিতে পারেনি। তবে দ্বিতীয়ার্ধে পরিস্থিতি বদলে যায়।
হুইজসেনের লাল কার্ডেই ম্যাচের মোড়
দ্বিতীয়ার্ধে আতলেতিকো ধীরে ধীরে ম্যাচের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে। পরিসংখ্যানও তাদের আধিপত্যের প্রমাণ দিয়েছে।
এরপর জুলিয়ানো সিমিওনেকে থামাতে গিয়ে হুইজসেনের ফাউল ম্যাচের গতিপথই বদলে দেয়। ভিএআরের পর লাল কার্ড দেখানো হলে রিয়ালকে ১০ জন নিয়ে খেলতে হয়।
পেনাল্টি থেকে গ্রিমালদোর গোলের পর আতলেতিকো আর পেছনে ফিরে তাকায়নি।
সিমিওনের জন্য বিশেষ জয়
আতলেতিকো কোচের জন্য এই জয়টির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। হোসে মরিনহোর প্রথম মেয়াদে রিয়াল মাদ্রিদের কোচ থাকাকালে সিমিওনের বিপক্ষে ডার্বিতে তার রেকর্ড ছিল দুর্দান্ত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাদ্রিদে মরিনহোর প্রথম মেয়াদে সিমিওনের বিপক্ষে তিনটি ডার্বির সবকটিতেই হেরেছিলেন আতলেতিকো। এমনকি ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে মরিনহোর অধীনে রিয়াল লা লিগায় আতলেতিকোর বিপক্ষে ছয় ম্যাচের ছয়টিতেই জয় পেয়েছিল।
এবার সেই ধারায় পরিবর্তন এসেছে। সিমিওনের দল শুধু রিয়ালকে হারায়নি, বরং ম্যাচে নিজেদের আধিপত্যও প্রতিষ্ঠা করেছে।
পরিসংখ্যানেও এগিয়ে আতলেতিকো
ম্যাচ শেষে আতলেতিকোর আক্রমণাত্মক আধিপত্য স্পষ্ট ছিল। তারা মোট ১৮টি শট নেয়, যেখানে রিয়াল মাদ্রিদের শট ছিল মাত্র ৮টি।
বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে আতলেতিকো ছিল বেশি সক্রিয়। রিয়াল ১০ জনে পরিণত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও বেশি চলে যায় স্বাগতিকদের হাতে।
শেষ পর্যন্ত রুডিগারের গোল রিয়ালকে ম্যাচে ফেরার আশা দেখালেও সমতা ফেরানোর মতো আর কোনো সুযোগ তারা কাজে লাগাতে পারেনি।
বার্সেলোনা থেকে অনেক পিছিয়ে রিয়াল
এই হার রিয়াল মাদ্রিদের জন্য লা লিগার শিরোপা দৌড়ে বড় ধাক্কা। সাত ম্যাচ শেষে রিয়ালের পয়েন্ট এখন শীর্ষে থাকা বার্সেলোনার চেয়ে ছয় কম।
বার্সেলোনা চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত সাতটি ম্যাচের সবকটিতেই জয় পেয়েছে এবং সাত ম্যাচে করেছে ৩১ গোল।
অন্যদিকে রিয়াল সাত ম্যাচে দ্বিতীয়বারের মতো হারের মুখ দেখল। আতলেতিকোর কাছে পরাজয়ের ফলে তারা এখন তাদের নগর প্রতিদ্বন্দ্বীদের এক পয়েন্ট পেছনে।
এদিকে দিনের পরবর্তী ম্যাচে দেপোর্তিভোর বিপক্ষে খেলতে নামবে রিয়াল বেতিস। সেই ম্যাচে জয় পেলে তারা দুই মাদ্রিদ ক্লাবকেই টপকে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
মাদ্রিদ ডার্বির এই ফল তাই শুধু তিন পয়েন্টের হিসাব নয়—লা লিগার শীর্ষ লড়াইয়েও এর প্রভাব পড়েছে। বার্সেলোনা নিখুঁত রেকর্ড নিয়ে এগিয়ে থাকলেও আতলেতিকো এখন রিয়ালকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে, আর রিয়ালকে নতুন করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে।


