ঐতিহাসিক জয় থেকে লজ্জার হার – অস্ট্রেলিয়া সফরে বাংলাদেশের দুই রূপ

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাংলাদেশের ক্রিকেট দেখল দুই বিপরীত চিত্র। ডারউইনে যে দলটি ইতিহাস গড়ে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়েছিল, সেই দলই ম্যাকাইয়ে নেমে গেল চরম ব্যর্থতার খাদে। ব্যাটিংয়ে ভয়াবহ ধসের কারণে মাত্র দুই দিনের মধ্যেই ইনিংস ও ৫১ রানে হারতে হলো বাংলাদেশকে।

এই পরাজয়ে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ শেষ হয়েছে ১-১ সমতায়। সিরিজ জয় না পেলেও ডারউইনের ঐতিহাসিক জয় বাংলাদেশের ক্রিকেটে বড় অর্জন হিসেবেই থাকবে। তবে ম্যাকাইয়ের ব্যাটিং বিপর্যয় নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, সেরা পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

ডারউইনে বাংলাদেশ শুধু অস্ট্রেলিয়াকে হারায়নি, গড়েছিল একাধিক রেকর্ড। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে মাত্র তৃতীয়বার টেস্ট খেলতে নেমেই জয় তুলে নিয়ে এশিয়ার দ্রুততম দল হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট জয়ের নজির গড়ে টাইগাররা। টেস্ট ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেটি ছিল বাংলাদেশের মাত্র দ্বিতীয় জয়। একই সঙ্গে এসইএনএ দেশগুলোর মাটিতে বাংলাদেশের দ্বিতীয় টেস্ট জয়ও আসে সেই ম্যাচে।

ডারউইনে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ করেছিল ৪২৬ রান। পুরো ম্যাচে ব্যাট-বল দুই বিভাগেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে ৯ উইকেটে জিতে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় সফরকারীরা।

কিন্তু ম্যাকাইয়ে গল্পটা সম্পূর্ণ বদলে যায়।

প্রথম ইনিংসে মাত্র ৬৪ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়াকে ২১০ রানে আটকে রাখার পরও সেই লিড কাজে লাগাতে পারেনি সফরকারীরা। দ্বিতীয় ইনিংসেও ব্যাটিং ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি হয়। মাত্র ৯৫ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশের ইনিংস।

অর্থাৎ পুরো ম্যাচে দুই ইনিংস মিলিয়ে বাংলাদেশের সংগ্রহ মাত্র ১৫৯ রান। অথচ ডারউইনের প্রথম ইনিংসেই ৪২৬ রান করেছিল দলটি।

বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ম্যাচে দুই ইনিংসেই তিন অঙ্কে পৌঁছাতে পারেনি দল। একই সঙ্গে ২১ বছর পর প্রথমবার কোনো দল টেস্টের দুই ইনিংসেই ১০০ রানের নিচে অলআউট হলো।

মিচেল স্টার্কের চতুর্থবার ১০ উইকেট

ম্যাকাইয়ের ব্যাটিং বিপর্যয়ের মূল কারিগর ছিলেন মিচেল স্টার্ক। প্রথম ইনিংসে বাঁহাতি এই পেসার মাত্র ১২ রান খরচ করে তুলে নেন ৬ উইকেট। বাংলাদেশের টপ অর্ডারের সামনে তার গতি, সুইং ও বাউন্সের কোনো জবাবই ছিল না।

দ্বিতীয় ইনিংসেও স্টার্কের দাপট থামেনি। এবার ৩৯ রানে নেন আরও ৪ উইকেট। দুই ইনিংস মিলিয়ে তার শিকার ১০ উইকেট, খরচ মাত্র ৫১ রান। টেস্ট ক্যারিয়ারে চতুর্থবারের মতো এক ম্যাচে ১০ উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়েন তিনি।

তবে বাংলাদেশের ব্যর্থতার দায় শুধু স্টার্কের ওপর চাপানো যাচ্ছে না। অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা কঠিন পরিস্থিতিতে ভালো বল করলেও বাংলাদেশের ব্যাটাররাও নিজেদের ভুলে বিপদ ডেকে এনেছেন। অনেক ব্যাটার এমন বলেও শট খেলেছেন, যেগুলো ছেড়ে দেওয়া সম্ভব ছিল। আবার অস্ট্রেলিয়ার ফিল্ডাররা যে জায়গায় সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন, সেখানেই একের পর এক ক্যাচ বা উইকেটের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের চার ব্যাটার কোনো রানই করতে পারেননি। দ্বিতীয় ইনিংসেও শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উইকেট হারিয়েছে দলটি। ফলে অস্ট্রেলিয়ার ওপর কোনো পর্যায়েই চাপ তৈরি করা সম্ভব হয়নি।

ম্যাচ শেষে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তও ব্যাটিং ব্যর্থতার কোনো অজুহাত দেননি। তার মতে, টস ও প্রথম ইনিংসে ব্যাটিংয়ের কঠিন পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা ভালো বল করলেও নিজেদের ব্যাটিং যে প্রত্যাশামতো হয়নি, সেটি স্পষ্টভাবেই স্বীকার করেছেন তিনি।

ম্যাকাইয়ের উইকেটও অবশ্য ব্যাটারদের জন্য সহজ ছিল না। নতুন বলে ছিল গতি, বাউন্স ও মুভমেন্ট। প্রথম দিনেই দুই দলের ১৮টি উইকেট পড়ে। তবে একই কন্ডিশনে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক ভালোভাবে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছেন।

শান্ত এ প্রসঙ্গে উপমহাদেশের উইকেট নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গও সামনে আনেন। তার বক্তব্য, উপমহাদেশে এক দিনে ১৮ বা ১৯ উইকেট পড়লে পিচ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। অথচ ম্যাকাইয়েও প্রথম দিন ১৮টি উইকেট পড়েছে। তার মতে, ভিন্ন কন্ডিশনে এমন পরিস্থিতিকেও একইভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

ব্যাটিংয়ে ব্যর্থতার মাঝেও বাংলাদেশের জন্য বড় প্রাপ্তি ছিলেন শরিফুল ইসলাম। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট কাটিয়ে দলে ফিরে বাঁহাতি এই পেসার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স উপহার দেন। মাত্র ৪৮ রান দিয়ে ৭ উইকেট শিকার করেন তিনি।

এটি দেশের বাইরে টেস্টে কোনো বাংলাদেশি বোলারের সেরা বোলিং পারফরম্যান্স। তার দুর্দান্ত স্পেলের কারণে অস্ট্রেলিয়াকে ২১০ রানের মধ্যেই আটকে রাখা সম্ভব হয়েছিল। ক্যামেরন গ্রিনকে ৬৭ রানে ফিরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বড় সংগ্রহের সম্ভাবনাও থামিয়ে দেন শরিফুল।

ডারউইনে সেঞ্চুরি করা গ্রিন ম্যাকাইয়েও গুরুত্বপূর্ণ ৬৭ রান করেন। ফলে পরপর দুই টেস্টে ব্যাট হাতে অস্ট্রেলিয়ার জন্য কার্যকর অবদান রাখেন এই অলরাউন্ডার।

কিন্তু শরিফুলের দুর্দান্ত বোলিংও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো কাজে আসেনি। কারণ বোলাররা অস্ট্রেলিয়াকে ২১০ রানে থামিয়ে দেওয়ার পর ব্যাটাররা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি।

পরাজয়ের আরেকটি বড় দিক ছিল ম্যাচের অস্বাভাবিক দ্রুত সমাপ্তি। পুরো টেস্টে খেলা হয়েছে মাত্র ৭৫০ বল। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটি ইতিহাসের দ্বিতীয় সংক্ষিপ্ততম টেস্ট এবং টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে চতুর্থ সংক্ষিপ্ততম ম্যাচগুলোর একটি।

মাত্র দুই দিনেই ম্যাচ শেষ হওয়ায় বাংলাদেশের ব্যাটিং ব্যর্থতার তীব্রতাও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দুই ইনিংসেই একশর নিচে অলআউট হয়ে ইনিংস হার, ডারউইনের দুর্দান্ত জয়ের ঠিক এক সপ্তাহ পর এমন পরিণতি নিঃসন্দেহে হতাশাজনক।

তবে অধিনায়ক শান্ত মনে করেন, একটি ম্যাচের ব্যর্থতায় ডারউইনের অর্জনকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। তার মতে, প্রথম টেস্টের ঐতিহাসিক জয় কেউ ভুলে যায়নি। দেশের ক্রিকেটের জন্য সেটি ছিল বিশাল অর্জন এবং সেই সাফল্য অবশ্যই উদযাপন করা উচিত।

একই সঙ্গে ম্যাকাইয়ের ব্যর্থতা থেকেও শিক্ষা নেওয়ার কথা বলেছেন শান্ত। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার মতো কঠিন কন্ডিশনে কীভাবে আরও ভালো ব্যাটিং করা যায়, সেটি নিয়ে কাজ করতে হবে বাংলাদেশকে।

সব মিলিয়ে ১-১ সমতায় শেষ হয়েছে বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া সফরের দুই টেস্টের সিরিজ। ফলাফলের দিক থেকে এটি বাংলাদেশের জন্য আগের যেকোনো অস্ট্রেলিয়া সফরের চেয়ে আলাদা। কারণ প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয়ের স্বাদ পেয়েছে বাংলাদেশ।

কিন্তু একই সিরিজে ম্যাকাইয়ের ব্যাটিং ধস দেখিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও। সামর্থ্য আছে বিশ্বের অন্যতম সেরা দলের বিপক্ষে ইতিহাস গড়ার, কিন্তু সেই পারফরম্যান্স ধরে রাখার ধারাবাহিকতা এখনো তৈরি হয়নি।

ডারউইনে ছিল বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণের গল্প। ম্যাকাইয়ে সেই স্বপ্নের বিপরীত ছবি। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয়গুলোর একটির পর মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে এমন বড় পরাজয়, অস্ট্রেলিয়া সফর তাই বাংলাদেশের ক্রিকেটকে একসঙ্গে দেখাল সাফল্যের শিখর এবং ব্যর্থতার গভীরতম জায়গা।

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles