দক্ষিণ আফ্রিকার গেবেখা টেস্ট জয়
গত সপ্তাহে ডারবানে হারের পর বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়ন দক্ষিণ আফ্রিকা অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কাগিসো রাবাদার লড়াকু মানসিকতা, মার্কো ইয়ানসেনের অসাধারণ পারফরম্যান্স এবং অধিনায়ক টেম্বা বাভুমার নিজের রান-সব মিলিয়ে দ্বিতীয় টেস্টে জোরালো জবাব দিয়েছে প্রোটিয়ারা। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সঙ্গে যে বাড়তি চাপ ও নজরদারি আসে, দক্ষিণ আফ্রিকার অস্ট্রেলিয়া সিরিজ যেন তাদের সেই বাস্তবতাই আবার মনে করিয়ে দিয়েছে এবং বিশ্বচ্যাম্পিয় বলেই হয়তো সবাই তাদের হারাতে মরিয়া।

গত বছর লর্ডসে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের (WTC) শিরোপা জয়ের পর নিজেদের প্রথম দুটি সিরিজে পাকিস্তানের সঙ্গে ড্র এবং ভারতের মাটিতে জয় পেয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। এরপর তাদের সামনে হাজির হয়েছিল সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজন এবং টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর দল অস্ট্রেলিয়া। প্রথম টেস্টে হেরে গেলেও দ্বিতীয় টেস্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে সিরিজে সমতা ফিরিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে নিজেদের মর্যাদা ধরে রাখতে কী ধরনের ক্রিকেট খেলতে হয়, সেটিই তারা প্রমাণ করেছে।
প্রথম ইনিংসে ১১০ রানে ৬ উইকেট হারানোর পরও দক্ষিণ আফ্রিকা ৯ উইকেটে ৪২৫ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে। এরপর অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ৯৯ রানে অলআউট করে ফলোঅন করায়। প্রায় ৪০ বছরের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো অস্ট্রেলিয়াকে ফলোঅন করানোর পর শেষ পর্যন্ত এক ইনিংস ও ৩১ রানের বিশাল ব্যবধানে জয় পায় প্রোটিয়ারা।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক টেম্বা বাভুমা বলেন, “কখনো কখনো দল হিসেবে আমরা ভুলে যাই যে এখন লক্ষ্যটা আমাদের দিকেই। সবাই আমাদের বিরুদ্ধে জিততে চায়। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে সবাই আমাদের সামর্থ্যের প্রমাণ দেখতে চায়। আমরা যা কিছু করি, সবকিছুই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।” তিনি আরও বলেন, “ডারবানে আমাদের পারফরম্যান্স সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করিয়েছিল। একই সঙ্গে এটাও বুঝিয়েছে, অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হলে নিজেদের কতটা মেলে ধরতে হয়।”
ডারবানের ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো: গত সপ্তাহে কিংসমিডে অনুষ্ঠিত প্রথম টেস্টটি ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার ১৯ মাসের মধ্যে দেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট। ২০২৫ সালের নতুন বছরের টেস্টের পর এটিই ছিল তাদের ঘরের মাঠে প্রথম ম্যাচ। আর প্রায় এক বছর পর তারা খেলছিল লাল বলের ক্রিকেট।
সেই ম্যাচে হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট থেকে সেরে উঠতে থাকা পেসার কাগিসো রাবাদাকে পায়নি দক্ষিণ আফ্রিকা। পাশাপাশি তাদের ব্যাটিং লাইনআপের খেলোয়াড়রাও দীর্ঘদিন ধরে টেস্ট ক্রিকেটের বাইরে ছিলেন। ফলে দলটিকে প্রস্তুতির ঘাটতিতে ভুগতে দেখা যায়। সেই সময় বাভুমা বলেছিলেন, খেলোয়াড়েরা এমন তীব্রতার সঙ্গে অভ্যস্ত ছিলেন না এবং দীর্ঘ বিরতির কারণে জমে থাকা ‘জড়তা’ কাটিয়ে ওঠা প্রয়োজন ছিল।
দ্বিতীয় টেস্টের আগে দলটির প্রথম ৭ ব্যাটারের মধ্যে পরিবর্তন আনা হয়। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ট্রিস্টান স্টাবস ও কাইল ভেরেইনেকে বাদ দেওয়া হয়। দল থেকে বাদ পড়েন দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম সফল স্পিনার কেশব মহারাজও।
রাবাদার প্রত্যাবর্তনেই বদলে গেল দলের চেহারা: দ্বিতীয় টেস্টে রাবাদার প্রত্যাবর্তন দক্ষিণ আফ্রিকার বোলিং আক্রমণকে নতুন শক্তি দেয়। বাভুমা বলেন, “রাবাদা দলের জন্য অনেক বড় সম্পদ। সে মাঠে থাকলে বোলিং আক্রমণের নেতৃত্ব দেওয়া এবং চাপ সামলানোর দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করে। আমার বিশ্বাস, এতে দলের অন্য খেলোয়াড়েরা নিজেদের কাজ আরও স্বাচ্ছন্দ্যে করতে পারে।” “প্রথম ইনিংসে মার্কো ইয়ানসেন ৫ উইকেট নিয়েছে। দ্বিতীয় ইনিংসে উইয়ান মাল্ডার গুরুত্বপূর্ণ উইকেট পেয়েছে। একজন নেতা এভাবেই ভূমিকা রাখে।” রাবাদা খুব বেশি বক্তৃতা দেওয়ার মানুষ নন বলেও জানান বাভুমা। তবে তাঁর মতে, রাবাদা যখন প্রয়োজন মনে করেন, তখনই কথা বলেন। আর মাঠে তাঁর উপস্থিতি ও ব্যক্তিত্ব সতীর্থদের বিভিন্নভাবে অনুপ্রাণিত করে।
রাবাদা দক্ষিণ আফ্রিকার খেলায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যোগ করেন-লড়াকু মানসিকতা। তাঁর উপস্থিতিতে দলটি শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাওয়া একটি দল থেকে এমন এক প্রতিপক্ষে পরিণত হয়, যারা প্রতিপক্ষকে সহজে কোনো সুযোগ দিতে চায় না। স্টিভ স্মিথের সঙ্গে রাবাদার পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাও নতুন করে আলোচনায় আসে। এবারও স্মিথের সঙ্গে তাঁর কথার লড়াই হয় এবং দক্ষিণ আফ্রিকার আগ্রাসী মনোভাব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে বাভুমা জানান, প্রতিপক্ষকে অযথা উসকানি দেওয়া তাদের উদ্দেশ্য ছিল না।
তিনি বলেন, “এর একটি অংশ হলো পরিস্থিতি অনুযায়ী আগ্রাসী হওয়া। প্রতিপক্ষের সঙ্গে কথা কাটাকাটি করা কিংবা ঝামেলা খোঁজা জরুরি নয়। বরং আমাদের খেলার ধরনেই আগ্রাসন থাকতে হবে। দলের জন্য খেলতে হবে এবং সেই কাজ নির্মমভাবে করতে হবে।” “দলে এমন কিছু খেলোয়াড় আছে, যারা কথার লড়াই উপভোগ করে। নিয়মের মধ্যে থেকে তাদের সেটা করতে দেওয়া হয়।” ৮ বছর আগে স্মিথকে আউট করার পর রাবাদা তাঁর সামনে গিয়ে চিৎকার করেছিলেন। এবার স্মিথকে দ্বিতীয় ইনিংসে আউট করার পর পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। এবার রাবাদার সতীর্থরা তাঁর সঙ্গে উদ্যাপনে মেতে ওঠেন।
ইয়ানসেন ও মাল্ডারের অবদানও ছিল গুরুত্বপূর্ণ: রাবাদা প্রভাব বিস্তার করলেও দক্ষিণ আফ্রিকার জয়ের পেছনে আরও কয়েকজনের অবদান ছিল অসাধারণ। মার্কো ইয়ানসেন ব্যাট ও বল-দুই বিভাগেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন। তাঁর অলরাউন্ড নৈপুণ্য একাই পুরস্কার পাওয়ার মতো ছিল। ম্যাচ শেষে সবচেয়ে পরিশ্রমী খেলোয়াড়ের স্বীকৃতিও পান তিনি। অন্যদিকে, উইয়ান মাল্ডার মিডিয়াম পেসার হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখছেন। দলের অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সমর্থনও তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে।
তবে এই জয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল অধিনায়ক বাভুমার ব্যাটিং। ডারবানে প্রথম টেস্টে ৩ ও ১ রান করে ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দ্বিতীয় টেস্টে ঘুরে দাঁড়িয়ে ১৭৯ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন। এটি ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত টেস্ট ইনিংস। এক সপ্তাহ আগেই বাভুমা নিজের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করার কথা বলেছিলেন। স্পষ্টতই তিনি সেই প্রতিশ্রুতি রেখেছেন।
বাভুমা বলেন, “যখন আপনি নিজের ঘরে একা থাকেন, তখন নিজের সঙ্গে মিথ্যা বলা যায় না। আপনি নিজের ব্যাটিং ইনিংসগুলো বিশ্লেষণ করেন। কারিগরি দিক থেকে কোনো সমস্যা চোখে পড়ছে কি না, তা দেখেন।” “মানসিক দিক থেকেও নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়, যাতে লড়াইয়ের জন্য তৈরি থাকা যায়। আপনাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। আর সুযোগ এলে দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।” তিনি আরও জানান, মানসিক প্রস্তুতির পাশাপাশি নেটেও সময় দিয়েছেন। নিজের ব্যাটিংয়ে ছন্দ ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন, যাতে ম্যাচে নামার সময় নিজের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারেন।
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে চাপ সামলানোর চ্যালেঞ্জ: বাভুমার মতে, ডারবানে ভারী ব্যবধানে হারের পেছনে মানসিকতারও ভূমিকা ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকা জানত, তারা ওই পারফরম্যান্সের চেয়ে অনেক ভালো দল এবং বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে যে পরিচিতি পেয়েছে, তার সঙ্গে তাদের প্রকৃত সামর্থ্যের মিল থাকা উচিত। দ্বিতীয় টেস্টে সেই পরিচিত রূপে ফিরে এসে তারা এখন সিরিজের শেষ ম্যাচে সেই আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে চায়।
আগামী মঙ্গলবার কেপটাউনে শুরু হবে সিরিজের নির্ধারক তৃতীয় টেস্ট: বাভুমা বলেন, “গর্ব ও আত্মবিশ্বাসের দিক থেকে এমন পারফরম্যান্স আমাদের অবশ্যই আরও শক্তিশালী করেছে।” “তবে চাপ ও প্রত্যাশার দিক থেকে আমাদের ওপর চাপ আরও বাড়তে থাকবে। আমাদের কাজ হলো সেই চাপকে গ্রহণ করা এবং তা থেকে পালিয়ে না গিয়ে চাপের দিকেই এগিয়ে যাওয়া। চাপকে নিজেদের ওপর আছড়ে পড়তে দেওয়া যাবে না।”
সারকথা: বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর প্রত্যাশা বেড়েছে, আর সেই প্রত্যাশার জবাব দিতে হলে মাঠে ধারাবাহিকতা দেখাতে হবে। ডারবানে হারের পর বাভুমার নেতৃত্বে দলটি যে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তা তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, কেপটাউনের নির্ধারক টেস্টেও তারা এই আগ্রাসন ও আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে পারে কি না।


