ক্রীড়াঙ্গনে রাজনৈতিক বার্তার অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বরাবরের মতোই কঠোর অবস্থান বজায় রাখছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। সম্প্রতি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ কেন্দ্রিক একটি ব্যানার প্রদর্শনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা স্টেডিয়ামে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এই ঘটনা ঘটে, যা নিয়ে ইতিমধ্যেই তদন্তে নেমেছে ফিফার স্বাধীন ডিসিপ্লিনারি কমিটি।
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, ফুটবল মাঠে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক, আদর্শিক বা আঞ্চলিক বিরোধসংক্রান্ত বার্তা প্রদর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ম্যাচ অফিশিয়ালদের প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সংস্থাটি।
নেপথ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা
মাঠের এই বিতর্ক কেবল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা রূপ নিয়েছে কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে। আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রবিষয়ক কর্মকর্তা হোসে লুইস কুইর্নো জানিয়েছেন, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ এলাকায় ব্রিটিশ জাহাজ ‘এইচ.এম.এস মেডওয়ে’-এর কার্যক্রম দ্বিপক্ষীয় চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। এই অভিযোগে বুয়েনস আইরেসে অবস্থিত যুক্তরাজ্যের দূতাবাসে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদপত্র জমা দিয়েছে আর্জেন্টিনা সরকার।
ফুটবল ও রাজনীতির মিশ্রণ: অতীতেও শাস্তির মুখে আর্জেন্টিনা
ফুটবল মাঠে ফকল্যান্ড (যা আর্জেন্টিনায় ‘মালভিনাস’ নামে পরিচিত) সংক্রান্ত দাবি তোলার ঘটনা এটিই প্রথম নয়।
- ২০১৪ সালের ঘটনা: ব্রাজিল বিশ্বকাপ শুরুর প্রাক্কালে বুয়েনস আইরেসে আয়োজিত একটি প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনা দলের ফুটবলাররা “Las Malvinas son Argentinas” (মালভিনাস আর্জেন্টিনার অংশ) লেখা ব্যানার প্রদর্শন করেছিলেন।
- ফিফার শাস্তি: বিশ্বকাপ আসর শেষ হওয়ার পর ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি বিষয়টিকে নিয়মবহির্ভূত আখ্যা দিয়ে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে (AFA) ৩০ হাজার সুইস ফ্রাঁ (তৎকালীন প্রায় ৩৭ হাজার মার্কিন ডলার) জরিমানা করে।
সমসাময়িক অন্যান্য ঘটনার নজির
আর্জেন্টিনার এই সাম্প্রতিক তদন্তের সূত্র ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অতীতে ঘটে যাওয়া একই ধরনের কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থার নজির সামনে এসেছে:
| বছর ও টুর্নামেন্ট | সংশ্লিষ্ট দেশ/খেলোয়াড় | ঘটনার বিবরণ | ফিফার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা |
| ২০১২ লন্ডন অলিম্পিক | পার্ক জং-উ (দক্ষিণ কোরিয়া) | জাপানের বিপক্ষে ব্রোঞ্জ জয়ের পর বিতর্কিত ডকডো দ্বীপপুঞ্জকে নিজেদের দাবি করে দর্শকের কাছ থেকে “Dokdo is our territory” লেখা ব্যানার প্রদর্শন করেন। | ২০১৪ বিশ্বকাপের দুটি বাছাইপর্বের ম্যাচ থেকে তাকে নিষিদ্ধ করা হয়। ফিফা বিষয়টিকে “কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়” বলে উল্লেখ করে। |
| ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ | সার্বিয়া জাতীয় দল | ব্রাজিলের বিরুদ্ধে মাঠে নামার আগে সার্বিয়ার ড্রেসিংরুমে কসোভোকে সার্বিয়ার মানচিত্রভুক্ত করে এবং “No Surrender” (আত্মসমর্পণ নয়) স্লোগানসংবলিত ব্যানার টানানো হয়। | রাজনৈতিক বার্তা ছড়ানোর দায়ে সার্বিয়া ফুটবল ফেডারেশনকে ২০ হাজার সুইস ফ্রাঁ (প্রায় ২৪ হাজার ৮০০ মার্কিন ডলার) জরিমানা করা হয়। |
খেলার মাঠে রাজনৈতিক প্রচারণাকে কঠোর হস্তে দমন করার যে দীর্ঘ ইতিহাস ফিফার রয়েছে, অতীতের এই নজিরগুলো তারই প্রমাণ দেয়। বর্তমান ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের বিরুদ্ধে ফিফা কী ব্যবস্থা নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।


