ক্যালিফোর্নিয়ার সোফাই স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজারো দর্শককে রোমাঞ্চের সাগরে ভাসিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছে গেল স্পেন। শুক্রবার রাতে অনুষ্ঠিত হাই-ভোল্টেজ কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামকে ২-১ ব্যবধানে পরাজিত করেছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা। স্পেনের হয়ে শেষ মুহূর্তের নাটকীয় জয়সূচক গোলটি করেন ‘সুপার সাব’ মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনো। এই জয়ের ফলে আগামী মঙ্গলবার ডালাসে টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট ও কিলিয়ান এমবাপের দল ফ্রান্সের মুখোমুখি হবে বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়নরা।
মাঝমাঠের লড়াই ও স্পেনের আধিপত্য
ম্যাচ শুরুর আগেই বড়সড় ধাক্কা খায় বেলজিয়াম শিবির। গা গরম করার সময় হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে পড়ে মাঠের বাইরে চলে যান দলটির অধিনায়ক ইউরি তিলেমান্স। এর আগেই এসিএল ইনজুরির কারণে দল থেকে ছিটকে গিয়েছিলেন আমাদু ওনানা। ফলে স্পেনের বিশ্বমানের মাঝমাঠের সামনে বেলজিয়ামকে মাঠে নামতে হয়েছিল তাদের দ্বিতীয় সারির মিডফিল্ড নিয়ে।
ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় স্পেনের পজিশন মাস্টাররা। পেদ্রির জায়গায় দলে আসা ফাবিয়ান রুইজ এবং রদ্রি মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ নিজেদের করে নেন। বার্সেলোনার তরুণ বিস্ময় লামিন ইয়ামাল ম্যাচের শুরুতেই একটি বাঁকানো শটে বেলজিয়ামের রক্ষণভাগকে কাঁপিয়ে দেন, যদিও শটটি পোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যায়। অন্যদিকে, বেলজিয়ামের উইঙ্গার জেরেমি ডোকু কাউন্টার অ্যাটাক থেকে স্প্যানিশ ডিফেন্সকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছিলেন।
প্রথমার্ধের নাটকীয়তা: গোল ও সমতা
ম্যাচের ৩০ মিনিটে ডেডলক ভাঙে স্পেন। পেড্রো পোরো ডান প্রান্ত দিয়ে লামিন ইয়ামালের সাথে চমৎকার ওয়ান-টু খেলে বাইলাইনের কাছ থেকে কাট-ব্যাক করেন দানি ওলমোকে। ওলমোর নেওয়া শট বেলজিয়াম গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া দারুণভাবে প্রতিহত করলেও বল বিপদমুক্ত করতে পারেননি। ফিরতি বলে তীব্র শটে লক্ষ্যভেদ করেন ফাবিয়ান রুইজ (১-০)।
পিছিয়ে পড়েও দমে যায়নি বেলজিয়াম। এর আগে নকআউট পর্বে সেনেগালের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেও অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল তারা। সেই আত্মবিশ্বাস থেকেই ৪১ মিনিটে সমতায় ফেরে রেড ডেভিলসরা। কেভিন ডি ব্রুইনার রক্ষণচেরা পাস খুঁজে নেয় টিমোথি কাস্তানেকে। কাস্তানের নিখুঁত ক্রসে লাফিয়ে উঠে বার্সেলোনার তরুণ ডিফেন্ডার পাউ কুবার্সিকে পরাস্ত করে চমৎকার হেডে গোল করেন চার্লস ডি কেটেলারে (১-১)। চলতি বিশ্বকাপে এটিই ছিল স্পেনের হজম করা প্রথম গোল। বিরতির ঠিক আগে ডি কেটেলারের পাস থেকে ডোকু প্রায় দ্বিতীয় গোলটি পেয়েই যাচ্ছিলেন, তবে ওলমোর সময়োপযোগী ইন্টারসেপশনে রক্ষা পায় স্পেন।
কোর্তোয়ার ইনজুরি ও ল্যামেন্সের ট্র্যাজেডি
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের গতি আরও বাড়ে। লামিন ইয়ামাল একের পর এক আক্রমণ শানাতে থাকেন। ম্যাচের গতি পরিবর্তনের জন্য বেলজিয়াম কোচ রুডি গার্সিয়া মাঠে নামান অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকুকে। ম্যাচের ৭০ মিনিটে বেলজিয়াম শিবিরে নেমে আসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। চোটের কারণে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন বিশ্বসেরা গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া। তার পরিবর্তে মাঠে নামানো হয় ২৪ বছর বয়সী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের গোলরক্ষক সেনে ল্যামেন্সকে, যার জন্য এই চাপ ও উত্তেজনার ম্যাচে বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়াটা ছিল ভীষণ কঠিন।
এবং শেষ পর্যন্ত সেটিই ল্যামেন্সের জন্য এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো। ম্যাচের ৮৮ মিনিটে স্পেনের তরুণ ডিফেন্ডার পাউ কুবার্সি দূর থেকে একটি নিচু শট নেন। ল্যামেন্সের জন্য শটটি সহজেই লুফে নেওয়ার মতো ছিল, কিন্তু বলটি তার হাত থেকে ফস্কে সামনে চলে যায়। সেখানে চিতার বেগে ছুটে এসে আলগা বল জালে জড়িয়ে দেন ম্যাচের ৮৫ মিনিটে বদলি হিসেবে নামা আর্সেনাল মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনো (২-১)। গত সোমবার পর্তুগালের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়েও ঠিক একইভাবে বেঞ্চ থেকে এসে জয়সূচক গোল করেছিলেন এই মেরিনো। আর স্পেনের বিপক্ষেও শেষ মুহুর্তে নেমে দলকে নিয়ে গেলেন সেমিফাইনালে।
স্বপ্নভঙ্গ ও বিষাদের সুর
ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে বেলজিয়ামের আলেক্সিস সিলিমেকার্স স্প্যানিশ গোলরক্ষক উনাই সিমনকে কাটিয়েও ফাঁকা পোস্টে থাকা লুকাকুকে বল পাস দিতে ব্যর্থ হলে বেলজিয়ামের সমতায় ফেরার শেষ সুযোগটিও হাতছাড়া হয়।
রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই মাঠে উল্লাসে মেতে ওঠে স্প্যানিশ শিবির। অন্যদিকে, মাঠে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্মের (Golden Generation) ফুটবলাররা, যাদের আরও একটি বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে গেল। ম্যাচ শেষে বিষাদগ্রস্ত তরুণ গোলরক্ষক ল্যামেন্সকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে দেখা যায় ইনজুরিতে পড়া কোর্তোয়াকে। তবে স্পেনের জন্য উদযাপনের সময় খুবই সংক্ষিপ্ত, কারণ আগামী মঙ্গলবারই তাদের নামতে হবে ফ্রান্সের বিপক্ষে মেগা সেমিফাইনালে।


