যে ম্যাচে গোল হয়ে উঠেছিল একটি জাতির প্রতিশোধের প্রতীক

বিশ্ব ফুটবলে অসংখ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা, স্পেন-জার্মানি কিংবা ইতালি-ফ্রান্স- প্রতিটি লড়াইয়েরই নিজস্ব ইতিহাস আছে। কিন্তু যখন মাঠের এক প্রান্তে থাকে আর্জেন্টিনা আর অন্য প্রান্তে ইংল্যান্ড, তখন সেটি আর শুধুই ফুটবল থাকে না। তখন ৯০ মিনিটের ম্যাচ ইতিহাস, রাজনীতি, জাতীয় গর্ব এবং অগণিত মানুষের আবেগের এক বিস্ময়কর মিলনমেলায় পরিণত হয়।

এই ঘটনার শুরু ফুটবল মাঠে নয়, দক্ষিণ আটলান্টিকের শীতল জলরাশিতে। ১৯৮২ সালে দক্ষিণ আটলান্টিকের ছোট্ট দ্বীপপুঞ্জ ফকল্যান্ড (আর্জেন্টিনার ভাষায় ইসলাস মালভিনাস) নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। মাত্র ৭৪ দিনের সেই সংঘাতে প্রাণ হারান প্রায় ৯০০ মানুষ। নিহতদের বেশির ভাগই ছিলেন তরুণ সৈনিক, যাদের অনেকেই যুদ্ধের প্রকৃত ভয়াবহতা বোঝার আগেই মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েছিলেন।

যুদ্ধের শেষে বিজয়ী হয় যুক্তরাজ্য। সামরিকভাবে পরাজিত হলেও আর্জেন্টিনার মানুষের মনে রয়ে যায় অপমান, ক্ষোভ আর না-পাওয়া এক গভীর বেদনা। সেই ক্ষত শুধু রাজনীতিতে নয়, সাধারণ মানুষের মনেও বছরের পর বছর জীবন্ত ছিল।

অবিশ্বাস্য দৃশ্য

ঠিক চার বছর পর, মেক্সিকোর ঐতিহাসিক অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে বিশ্ব আবার দেখল এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড- কোয়ার্টার ফাইনালের লড়াই। গ্যালারির গর্জন আর খেলোয়াড়দের প্রতি পদক্ষেপে তখন শুধু সেমিফাইনালে ওঠার লড়াই ছিল না; ছিল হারিয়ে যাওয়া জাতীয় মর্যাদা পুনরুদ্ধারের এক অলিখিত তাগিদ। সেদিন ফুটবল ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল আবেগ।

গ্যালারিতে বসা হাজারো আর্জেন্টাইন সমর্থকের কাছে এটি ছিল যুদ্ধে হারার পর সম্মান পুনরুদ্ধারের সুযোগ। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের কাছেও ম্যাচটি ছিল জাতীয় মর্যাদার লড়াই।

৫১তম মিনিটে আসে সেই বিতর্কিত মুহূর্ত। ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটনের আগে লাফিয়ে উঠে হাত দিয়ে বল জালে পাঠান দিয়েগো ম্যারাডোনা। রেফারির চোখ এড়িয়ে গোলটি বৈধতা পায়।

ম্যাচের আগে পিটার শিলটনের সঙ্গে ম্যারাডোনা

ম্যাচ শেষে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, সেটি ছিল ‘কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা, আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত’- যা পরে ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে যায়। কিন্তু চার মিনিট পর যা ঘটেছিল, সেটি বিতর্ক নয়- শুধুই বিস্ময়।

গোল অব দ্য সেঞ্চুরি

নিজেদের অর্ধ থেকে বল নিয়ে পাঁচজন ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন ম্যারাডোনা। প্রায় ৬০ মিটার দৌড়ে করা সেই গোলকে পরে ফিফা ঘোষণা করে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’। একই ম্যাচে ফুটবল দেখেছিল দুই বিপরীত ছবি- একটি ছিল বিতর্কের, অন্যটি নিখাদ শিল্পের।

ম্যাচ শেষে ম্যারাডোনা কখনোই সরাসরি বলেননি যে এটি যুদ্ধের প্রতিশোধ ছিল। তবে বহু সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেছিলেন, ফকল্যান্ড যুদ্ধে নিহত আর্জেন্টাইনদের কথা তাদের মনে ছিল।

আর্জেন্টিনার অসংখ্য মানুষের কাছে সেই জয় ছিল যুদ্ধের ক্ষত কিছুটা হলেও ভুলে থাকার একটি উপলক্ষ। অবশ্য এটি কোনো সামরিক বিজয় ছিল না; ছিল কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ। তবু খেলাধুলার আবেগ কখনো কখনো মানুষের অনুভূতিতে ইতিহাসের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায়, যা কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

এরপর বহু বছর কেটে গেছে। যুদ্ধ শেষ হয়েছে চার দশকেরও বেশি আগে। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কও বদলেছে। নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের কেউই সেই সময়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী নন। তবু আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচ এলেই ফিরে আসে ১৯৮৬ সালের সেই দুপুর, ফিরে আসে ম্যারাডোনার দৌড়, ‘হ্যান্ড অব গড’, আর ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি।

আজকের ফুটবলারদের কাছে এটি একটি সেমিফাইনাল, কোয়ার্টার ফাইনাল বা সাধারণ আন্তর্জাতিক ম্যাচ হতে পারে। কিন্তু অসংখ্য সমর্থকের কাছে এটি এখনও ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়।

ফুটবল কখনো যুদ্ধের বিকল্প হতে পারে না। একটি ম্যাচ কোনো যুদ্ধের বেদনা মুছে দিতে পারে না, কিংবা হারানো জীবন ফিরিয়ে আনতে পারে না। কিন্তু খেলাধুলা মানুষের অনুভূতি, পরিচয় এবং জাতীয় গর্বকে স্পর্শ করে- এ কারণেই কিছু ম্যাচ সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়।

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথ ঠিক তেমনই একটি গল্প। যেখানে স্কোরলাইনের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে স্মৃতি, ইতিহাস আর আবেগ। আর তাই বিশ্ব ফুটবলের প্রতিটি নতুন আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচ যেন ১৯৮৬ সালের সেই অবিস্মরণীয় বিকেলের প্রতিধ্বনি হয়ে আবারও ফিরে আসে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles