বিশ্বকাপ ফাইনাল ২০২৬
ইতিহাস বলে র্যাঙ্কিং এর নম্বর দল কখনো বিশ্বকাপ জিততে পারেনি আবার গত ৬৪ বছরের বিশ্বকাপ ইতিহাসে পরপর দুইবার বিশ্বকাপ জিততে পারেনি কোন দল। কিন্তু তাই বলে যে আর্জেন্টিনা পারবেনা তা তো নয়। হ্যাঁ আর্জেন্টিনা পারবে তবে তার জন্য শর্ত একটাই ছিল ভাল খেলতে হবে তাই না? নাকি অন্য কিছু! না অন্য কোন কারণ নেই। যে দল ভাল খেলবে তারাই জিতবে বিশ্বকাপ এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের সবার। তাহলে ম্যাচে হলোটা কি? যা হয়েছে তা হল স্পেন ভাল খেলেছে অনেক ভালে খেলেছে যতটা ভাল খেললে চ্যাম্পিয়ন হওয়া যায় ঠিক ততটাই ভাল খেলেছে আর তাতেই বিশ্বকাপের ফাইনালে অসহায় পরাজয় হয়েছে আর্জেন্টিনার।

তাহলে চলুন এবার দেখা যাক স্পেন আর আর্জেন্টিনার জয় পরাজয়ের পার্থক্য কোথায়:
১. বল দখল: মধ্যমাঠের দখল যে দল নিতে পারবে আক্রমনে সে দল ততটাই সফল হবে। স্পেন শুরু থেকেই মধ্যমাঠ নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আক্রমনের পর আক্রমন চালিয়ে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ ক্লান্ত করে দিয়েছে যার ফলে শিষ দিকে তার ফল স্বরুপ গোল পেয়েছে। আবার আর্জেন্টিনা স্পেনের মধ্যমাঠ দখলের ব্লক ভেঙ্গে দিতে পারেনি যেখান থেকে আক্রমনে যেতে পারে বা মেসিকে অ্যাটাকিং থার্ডে বল দিতে পারে।
২. সমন্বয়: মাঝ মাঠ রদ্রি, পেদ্রি ও রুইজ দখলে নিয়ে ত্রিভুজ সৃষ্টি করেছেন যাতে সহজে স্পেন আক্রমনে যেতে পারে আর্জেন্টিনা এই সমন্বয় ভাঙ্গতে পারেনি।
৩. মেসি: মেসি যখন ডান প্রান্তে গেছেন তখন তাকে কুকুরেয়া দেখেছেন আবার যখন মাঝ মাঠ দিয়ে আক্রমনে যেতে চেয়েছেন তখন অধিনায়ক রদ্রি একটু নিচে নেমেছেন আবার কুবার্সি ও সহায়তা করেছেন মোট কথা মেসিকে ম্যান মার্কিং না করেও জোনাল মার্কিং করেছে এমনভাবে যেন মেসিকে বল দেওয়ার লেন তৈরী করতে না পারে আর্জেন্টিনা আবার বল পেলেও মুভ করার স্পেস পাননি এভাবেই মেসিকে মার্ক করেছে স্পেন।
৪. কাউন্টার প্রেসিং: স্পেনের কাউন্টার প্রেসিং আর্জেন্টিনাকে একেবারেই পেছেনে ফেলে দিয়েছে। আর্জেন্টিনা যখন বল পেয়েছে তখন স্পেন দ্রুত সেকেন্ডের ব্যবধানে চাপ সৃষ্টি করে বল পুনরায় দখলে নিয়েছে তাদেরকে স্থির হতে দেয়নি যার কারণে সফল আক্রমন বিল্ডআপ করতে পারেনি আর্জেন্টিনা। এই পজিশনাল ফুটবল ভাঙ্গতে না পেয়ে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা বডি কন্ডাক্ট এ মনোযোগী হয় আর তাতে দলের স্বাভাবিক খেলা নষ্ট হয়ে যায়।

আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার: আর্জেন্টিনা ডিফেন্ডার নিকো গঞ্জালোর সমস্যা ছিল অনেক সেই জায়গায় বলা যায় ম্যাক অ্যলিস্টার ও ট্যাগলিয়াফিকো ভাল করেছেন কিন্তু স্পেনের ডান প্রান্তের পেদ্রো, ওলমো ও লামিন ইয়ামালের আক্রমন সামাল দিতেও হিমসিম খেয়েছেন ভাগ্য ভাল যে গোল রক্ষক মার্টিনেজ ভাল সেভ করেছেন তা না হলে নির্ধারিত সময়েই জিতে যেত স্পেন।
মনস্তাত্বিক গেম: মনস্তাত্বিক খেলায় পরাজিত হয়ে ছন্দ পতন হয়েছে আর্জেন্টিনার এবং একের পর এক হলুদ কার্ড এমনকি এনজো ফানান্দেজকে লাল কার্ড দেখতে হয়েছে আর তখনই যতটুকু আর্জেন্টিনার আশা ছিল যে ম্যাচটা টাইব্রেকারে নিয়ে যাবে তখন সেই আশাও শেষ হয়ে গেছে।
স্পেনের সাইড বেঞ্চ: স্পেনের সাইড বেঞ্চের খেলোয়াড়রাও যে জয়ের মমেন্টাম তৈরি করতে পারে বা গোল করে ম্যাচ জিতাতে পারে তা প্রমান করেছেন উইলিয়ামসের অ্যাসিস্ট থেকে ফেরেন তোরেসের করা ম্যাচের ১০৬ মিনিটের সময় জয় সূচক সেই গোলটি। এছাড়া বদলি নেমে এরিক, মেরিনা সবাই প্রমান করেছেন তারা মূল একাদশে খেলতে পারেন। আর আর্জেন্টিনার সাইড বেঞ্চের কোন খেলোয়াড় স্পেনের মত ভূমিকা রাখতে পারেনি একক মন্সিয়ানায় জয়ের জন্য ভূমিকা রাখতে পারেনি।
অন টার্গেট শটস: স্পেন পোস্টে শটস নিয়েছে ২০টি যার মধ্যে ১১টি ছিল অন টার্গেট অপরদিকে আর্জেন্টিনা মোট ৩টি শট নিতে পেরেছে পোস্টে আর তাতে অন টার্গেটের কোন শট ছিলনা তাহলে গোল আসবে কি করে! শেষ দিকে শর্ট কর্ণার নেয়ার পর মেসি য়ে ক্রসটি করেছিলেন সেই ক্রসটি চলে যায় সামান্যের জন্য লক্ষ ভ্রস্ট হয়ে ক্রসচিপ উঁচিয়ে আর তাতেই যেন সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায় আর্জেন্টিনার।
বল পজেশন: ম্যাচের নিয়ন্ত্রন হারানোর পাশাপাশি আর্জেন্টিনা বল পজেশনেও অনেক পিছিয়ে ছিল স্পেন ৬৮% আর আর্জেন্টিনা ৩২% পজেশন নিয়ে খেলেছে। স্পেন মোট ৮০৩টি পাস দিয়েছে বিপরিতে আর্জেন্টিনার পাস ছিল ৪৪৫টি। স্পেন ৯০% সঠিক পাস দিয়েছে আর মিসের দল ৭৮%, স্পেনের ফাউল ২১টি, আর্জেন্টিনার ২৪টি, স্পেনের হলুদ কার্ড নাই আর্জেন্টিনার ৫টি ও লাল কার্ড ১টি। স্পেন অফ সাইড হয়েছে ৪বার আর্জেন্টিনা ১বার, আবার কর্ণার কিক পেয়েছে স্পেন ৯টি আর আর্জেন্টিনা ৪টি।
লালকার্ড: ৯০ মিনিট শেষে অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধের ৩মিনিটের সময় আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখলে ম্যাচটি টাইব্রেকারে নিয়ে গিয়ে যে, গোল রক্ষক এমি মার্টিনেজের ওপর ভরসা করে থাকবে তার শেষ আশাটাও শেষ হয়ে যায়।
উপসংহারে বলা যায় বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন জিতেছে শুধু একটি গোলের কারণে নয়; তারা জিতেছে পরিকল্পনা, ধৈর্য, বলের নিয়ন্ত্রণ এবং কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বের কারণে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা পুরো ম্যাচ জুড়ে নিজেদের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক ছন্দ খুঁজে পায়নি। মেসিকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা, মাঝমাঠের দখল হারানো এবং সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়াই শেষ পর্যন্ত শিরোপা হাতছাড়া হওয়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায় আর্জেন্টিনার জন্য। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোল স্পেনকে ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেয়, আর আর্জেন্টিনার টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভেঙে যায়।


