বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ, মাঠে লড়াই দুই জায়ান্টের, আর গ্যালারি ও টিভি পর্দায় নজর বিশ্বের প্রায় ১০০ কোটি ফুটবলপ্রেমীর। এমন মহারণে এক সেকেন্ডের বিজ্ঞাপনের জন্য ব্র্যান্ডগুলো যেখানে কোটি কোটি ডলার ঢালতে প্রস্তুত থাকে, সেখানে এক পয়সা খরচ না করেই কেল্লাফতে করে ফেলল জার্মানির এক ছোট্ট স্ট্রিটওয়্যার ব্র্যান্ড!
ঘটনাটি গত ১৯ জুলাই ২০২৬-এর বিশ্বকাপ ফাইনালের। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বজয়ের মুকুট মাথায় তোলে স্পেন। কিন্তু এই ঐতিহাসিক ম্যাচের বিজয়ের আনন্দের মাঝেই বিজ্ঞাপনী দুনিয়ায় ঘটে যায় এক অভূতপূর্ব ‘দুর্ঘটনা’।
জার্সির ফাঁকে লুকানো ‘সিক্সপিএম’
ম্যাচজুড়ে স্পেনের ১৯ বছর বয়সী তরুণ বিস্ময় লামিনে ইয়ামাল নিজের স্বাভাবিক অভ্যাসবশত বেশ কয়েকবার জার্সি উঁচিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন। আর ঠিক তখনই ক্যামেরার ক্লোজ-আপ শটে ধরা পড়ে তার আন্ডারওয়্যারের বর্ডার। সেখানে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা ছিল একটি ব্র্যান্ডের নাম, ‘6PM’।
বিশ্বকাপের ট্রফি উঁচিয়ে ধরার আগেই এই দৃশ্য দেখে ফেলেন প্রায় ১০০ কোটি দর্শক। আর তাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোরগোল পড়ে যায়।
দর্শকরা লোগোটি শনাক্ত করার পরপরই জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টভিত্তিক স্ট্রিটওয়্যার ব্র্যান্ড ‘6PM’-এর ওয়েবসাইটে হুমড়ি খেয়ে পড়েন। রাতারাতি আকাশছোঁয়া হয়ে যায় তাদের বক্সার শর্টসের চাহিদা। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই তাদের পুরো ইনভেন্টরি ফাঁকা হয়ে যায়!
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে ব্র্যান্ডটি শুরু করেছিলেন আশরাফ আইত বুজালিম। বাবা-মায়ের স্মুদি শপে কাজের পাশাপাশি বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশনে পড়াশোনা করার সময় শখের বশে এটি চালু করেছিলেন তিনি। সেই ব্র্যান্ডটিই আজ গ্লোবাল নজরে।
বিশ্বকাপ ফাইনাল ২০২৬: এক নজরে '6PM' ভাইরালিটি
┌─────────────────────────┬──────────────────────────────────────────┐
│ ঘটনা │ লামিনে ইয়ামালের জার্সির ফাঁকে '6PM' লোগো │
├─────────────────────────┼──────────────────────────────────────────┤
│ আনুমানিক দর্শক সংখ্যা │ ১০০ কোটি+ (বিশ্বজুড়ে) │
│ বিজ্ঞাপনী খরচ │ ০ টাকা (পেইড স্পনসরশিপ ছিল না) │
│ ফলাফলের প্রভাব │ মাত্র কয়েক দিনে পুরো স্টক আউট! │
└─────────────────────────┴──────────────────────────────────────────┘
এটি কি আসলেই অঘটন, নাকি স্মার্ট চাল?
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এটি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্পনসরশিপ ছিল না। ইয়ামাল বা স্পেন ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে ‘6PM’-এর কোনো চুক্তিই ছিল না। ইয়ামাল কেবল নিজের অভ্যাসবশত পোশাকটি পরেছিলেন।
তবে ফুটবলের ইতিহাসে এমন ‘বিজ্ঞাপনী দুর্ঘটনা’ প্রথম নয়। ২০১২ ইউরোতে ডেনমার্কের নিকলাস বেন্টনার (Nicklas Bendtner) গোল করে জার্সি তুলে তার আন্ডারওয়্যারে থাকা স্পনসর ‘প্যাডি পাওয়ার’ (Paddy Power)-এর লোগো দেখান। উয়েফা (UEFA) সাথে সাথে বেন্টনারকে ১ লাখ ইউরো জরিমানা করে। কিন্তু প্যাডি পাওয়ার আনন্দের সাথে সেই জরিমানা দিয়ে দেয় এবং একে তাদের ইতিহাসের ‘সেরা বিজ্ঞাপন’ বলে আখ্যা দেয়।
ফিফা-উয়েফার কড়া নিয়ম ও জরিমানার অংক
ফিফা এবং উয়েফার ‘ক্লিন কিট’ (Clean Kit) নিয়ম অনুযায়ী, মাঠের অফিসিয়াল স্পনসর ছাড়া অন্য কোনো ব্র্যান্ডের লোগো প্রদর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আন্ডারগার্মেন্টসও এই নিয়মের আওতাভুক্ত।
কিন্তু হিসাব বলছে ভিন্ন কথা! ৩০ ইউরোর একটি বক্সার শর্টস প্যাকের বিক্রির সাথে তুলনা করলে, বেন্টনারের মতো ১ লাখ ইউরো জরিমানা খেলেও তা মাত্র ৩,৩০০টি প্যাক বিক্রির সমান। অথচ ইয়ামালের এই মুহূর্তটি ভাইরাল হওয়ার পর ট্রফি বিতরণ শেষ হওয়ার আগেই তার চেয়ে বহুগুণ বেশি পণ্য বিক্রি করে ফেলে ‘6PM’!
ফিফা যেখানে কোটি কোটি ডলারের বিনিময়ে অফিশিয়াল স্পনসরদের কাছে মাঠে একচেটিয়া প্রচারের গ্যারান্টি দেয়, সেখানে ইয়ামালের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ফিফার কড়া ‘এনফোর্সমেন্ট মডেল’ নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
দেশীয় ব্র্যান্ড ও নতুন মার্কেটিং শিক্ষা
গবেষকদের মতে, বড় বাজেটের মেগা-ক্যাম্পেইনের চেয়েও ‘অর্গানিক ভাইরালিটি’ এবং ‘রাইট টাইম, রাইট প্লেস’ ধারণা কতটা শক্তিশালী হতে পারে, এটি তার বড় প্রমাণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ক্রিকেট বিশ্বকাপ বা এশিয়া কাপের মতো মঞ্চে খেলোয়াড়দের অগোচরে ব্যবহার করা কোনো স্থানীয় ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে।
অবশ্য, ইয়ামাল বা স্পেন ফুটবল ফেডারেশন এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। ঘটনাটি শতভাগ দুর্ঘটনাবশত নাকি নেপথ্যে অন্য কোনো পরিকল্পনা ছিল—তা হয়তো সময়ই বলবে। তবে ফিফা যদি শেষ পর্যন্ত কোনো জরিমানাও ঠুকে দেয়, ততক্ষণে ‘6PM’ তাদের কাঙ্ক্ষিত লাভের গুড় ঘরে তুলে নিয়েছে!


