তুমি আমার খরচ চালাতে পারবে না
‘ইউ কান্ট অ্যাফোর্ড মি’ অর্থাৎ তুমি আমার খরচ চালাতে পারবে না। ঠিক এভাবেই মরক্কোর অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ইসমাইল সাইবারিকে ছেড়ে চলেগিয়েছেন তার সাবেক প্রেমিকা। ২০২৬ বিশ্বকাপে আলো ঝলমলে পারফরমেন্সের পর তাঁর এক প্রাক্তন প্রেমিকা তাঁকে ‘অতিরিক্ত দরিদ্র’ হওয়ার কারণে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন বলে দাবি করা একটি ভাইরাল গল্প আবার ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে।
মরক্কোর অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ইসমাইল সাইবারি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে মরক্কোর জয়সূচক পেনাল্টি শটটি নেয়ার পর এখন সংবাদ শিরোনামে আধিপত্য বিস্তার করছেন। এই ২৫ বছর বয়সী ফরোয়ার্ডের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে ভক্তদের কৌতুহল যত বাড়ছে, ততই তাঁরা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করেছেন, বিশেষ করে তাঁর কথিত প্রাক্তন প্রেমিকাকে নিয়ে একটি ভাইরাল গল্প আবারও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে।
বর্তমানে ব্যাপকভাবে প্রচারিত দাবিটি হলো, সাইবারি যখন ডাচ ক্লাব পিএসভি আইন্দহোভেনে ছিলেন, তখন তাঁর এক প্রেমিকা ছিল যিনি নাকি সাইবারি তাঁর লাইফস্টাইলের খরচ “চালাতে পারছিলেন না” বলে তাঁকে ছেড়ে চলে যান। কিন্তু পরবর্তীতে বায়ার্ন মিউনিখে তাঁর বড় অঙ্কের দলবদলের পর সেই প্রেমিকা নাকি আবার তাঁর কাছে ফিরে আসার জন্য অনুনয়-বিনয় করেন।
ভাইরাল হওয়া ‘তুমি আমার খরচ চালাতে পারবে না’ দাবিটি
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া পোস্টগুলোতে দাবি করা হচ্ছে যে, ২০২৩ সালে সিনিয়র স্কোয়াডে যোগ দেওয়ার আগে, পিএসভি আইন্দহোভেনের সাথে তিন বছরের চুক্তির সময় সাইবারির একটি প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তবে, সেই সম্পর্কটি টেকেনি; কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, পিএসভি আইন্দহোভেনে তাঁর উপার্জিত বেতন নাকি সেই প্রেমিকার বিলাসবহুল জীবনযাত্রার জন্য যথেষ্ট ছিল না।
পিএসভিতে থাকাকালীন সাইবারির সাপ্তাহিক আয় ছিল প্রায় ১৯,২০০ ইউরো, এবং গল্প অনুযায়ী, তাঁর তৎকালীন প্রেমিকার জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। তবে, বায়ার্ন মিউনিখের সাথে তাঁর একটি বড় ধরনের দলবদলের গুঞ্জন ওঠার পর পরিস্থিতি বদলে যায়, যা তাঁর প্রোফাইলকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।
ইউরোপীয় ফুটবলে দল বদল কিংবা খেলোয়াড়দের বেতনের বিষয়টি গোপনীয় হিসেবেই দেখা হয়ে। ফলে খেলোয়াড়দের বেতনের বিষয়টি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনুমান নির্ভর হয়। কিংবা চুক্তির সব তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয় না। ফলে বায়ার্ন মিউনিখে ইসমাইল সাইবারির যোগদানের বিষয়টি প্রকাশিত হলেও চুক্তির পুরো তথ্য গণমাধ্যমে আসেনি।
তবে জানা যায়, সাইবারি একটি সম্ভাব্য ৫৫ মিলিয়ন ইউরোর চুক্তি পেয়েছেন তা জানার পর, তাঁর প্রাক্তন প্রেমিকা নাকি তাঁর কাছে ফিরে আসার জন্য মিনতি শুরু করেন। গল্পে দাবি করা হয়েছে যে, তিনি এই ফুটবল তারকার ডিএম (ডাইরেক্ট মেসেজ) ক্ষমা প্রার্থনার বার্তায় ভাসিয়ে দেন, যা শেষ পর্যন্ত সাইবারিকে সেই মেয়ের পুরোনো “তুমি আমার খরচ চালাতে পারবে না” টেক্সটের স্ক্রিনশট এবং বর্তমানের যোগাযোগ করার চেষ্টার স্ক্রিনশটগুলো একসাথে ফাঁস করতে বাধ্য করে।
বাস্তবতা: এই প্রতিশোধের গল্পটি অনলাইনে লক্ষ লক্ষ ভিউ পেলেও এবং ভক্তরা একে একটি “নিখুঁত প্রতিশোধ” হিসেবে উদযাপন করলেও, আসলে এই গল্পটির কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। পুরো ঘটনার সমর্থনে কোনো যাচাইকৃত স্ক্রিনশট, সাক্ষাৎকার বা নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন নেই।
ইসমায়েল সাইবারির কি কোনো প্রেমিকা আছে?
এখন পর্যন্ত, সাইবারি কোনো প্রেমিকা, স্ত্রী বা বাগদত্তা থাকার কথা প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেননি। মরক্কোর এই আন্তর্জাতিক তারকা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে লাইমলাইট থেকে অনেকটাই দূরে রেখেছেন; ইন্টারভিউতে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর পরিবার বা সম্পর্ক নিয়ে খুব কমই কথা বলেন। তাঁর পাবলিক প্রোফাইলগুলো প্রায় পুরোটাই ফুটবলের ওপর ফোকাস করা। তাই সাইবারির নিজের নিশ্চিতকরণ বা কোনো নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন ছাড়া, তাঁর বর্তমান বা প্রাক্তন কোনো সঙ্গীর পরিচয় অজ্ঞাতই রয়ে গেছে।
একটি ফুটবল যাত্রা যা নিজেই কথা বলে
প্রাক্তন প্রেমিকার গল্পটি সত্যি হোক বা না হোক, সাইবারির বাস্তব জীবনের গল্পটিও কোনো সাধারণ গল্প নয়। স্পেনের তেরাসায় মরক্কো বংশোদ্ভূত পিতামাতার ঘরে জন্ম নেওয়া ইসমায়েল তাঁর শৈশবের একটি অংশ কাটিয়েছেন জন্মগত পায়ের এক সমস্যা কাটিয়ে উঠতে, যার কারণে তাঁর হাঁটতে শিখতে দেরি হয়েছিল। তিনি অর্থোপেডিক ব্রেসের (শিশুদের স্বাভাবিক হাঁটার প্যাটার্ন তৈরিতে সাহায্য করার জন্য ডিজাইন করা ডিভাইস) সাহায্যে তাঁর প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ভাগ্যক্রমে, এটি কাজ করেছিল।
২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পর সাইবারির পরিবার বেলজিয়ামে চলে যায়। সেখানে ধীরে ধীরে তিনি নিজের প্রতিভাকে শাণিত করেন এবং অ্যান্ডারলেখট, মেখেলেন, গেঙ্ক এবং পরিশেষে পিএসভি আইন্দহোভেনের যুব ব্যবস্থার মাধ্যমে ফুটবলের প্রতি তাঁর ভালোবাসা খুঁজে পান। আর আজকের দিনে, তিনি ইতিমধ্যেই মরক্কোর অন্যতম উজ্জ্বল ফরোয়ার্ড হিসেবে নাম কুড়িয়েছেন। আর সেই কারণেই, ২৯ জুনের ম্যাচে তাঁর ঐতিহাসিক পেনাল্টির পর তাঁর মায়ের সাথে কাটানো আবেগঘন মুহূর্তটি অনলাইনে কোটি কোটি মানুষের মন জয় করে নিয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে মরক্কোর টাইব্রেকার জয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় পেনাল্টি গোল করার পর, ইসমায়েল সাইবারি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে তাঁর দুর্দান্ত ফর্ম বজায় রেখেছেন। অতিরিক্ত সময়ের পর ১-১ গোলে শেষ হওয়া ম্যাচটিতে এই পিএসভি আইন্দহোভেন মিডফিল্ডার আটলাস লায়ন্সদের (মরক্কো দল) কানাডার বিরুদ্ধে শেষ ১৬-র টিকিট এনে দেন। তাঁর এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাঁর প্রোফাইলকে আরও উঁচুতে নিয়ে গেছে এবং তাঁকে টুর্নামেন্টে মরক্কোর অন্যতম সেরা তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আপাতত, এই ফুটবলারের পুরো মনোযোগ মরক্কোর বিশ্বকাপ অভিযানের দিকেই রয়েছে বলে মনে হচ্ছে, এবং সাইবারি ভাইরাল হওয়া প্রাক্তন প্রেমিকার গল্পটি নিয়ে এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
