তরুণদের মাঠে ফেরার আহ্বান রাষ্ট্রপতির
প্রয়াত ক্রীড়া সংগঠক আরাফাত রহমান কোকোর স্মৃতিকে ধারণ করে শুরু হলো ‘কোকো ১৮তম জাতীয় সামার অ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতা-২০২৬’। শুক্রবার বিকেলে জাতীয় স্টেডিয়ামে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অ্যাথলেট, ক্রীড়া সংগঠক ও ক্রীড়াপ্রেমীদের উপস্থিতিতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পরিণত হয় এক উৎসবমুখর মিলনমেলায়।

উদ্বোধনী বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি তরুণ প্রজন্মকে মাদকাসক্তি, মোবাইল ফোনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি ও হতাশা থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলার প্রসারে গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, একটি সুস্থ, সচেতন ও শক্তিশালী জাতি গঠনে তরুণদের মাঠমুখী করার বিকল্প নেই। খেলাধুলা শুধু শারীরিক সুস্থতাই নিশ্চিত করে না, বরং তরুণদের মধ্যে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, আত্মবিশ্বাস ও দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তোলে।

রাষ্ট্রপতি অ্যাথলেটিক্সকে ক্রীড়ার জননী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দেশের ক্রীড়াঙ্গনের ভিত্তি মজবুত করতে অ্যাথলেটিক্সের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান অ্যাথলেট খুঁজে বের করে তাঁদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সাফল্যের সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্মৃতিচারণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। বিশেষ করে ক্রিকেটের উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা স্মরণীয়। তাঁর স্মৃতিকে সামনে রেখে এ ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন নতুন প্রজন্মকে খেলাধুলায় উৎসাহিত করার পাশাপাশি দেশের ক্রীড়াঙ্গনের বিকাশেও ভূমিকা রাখবে।
এ সময় তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পরিবারের ক্রীড়ানুরাগের ইতিহাসও স্মরণ করেন। রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে উঠে আসে দেশের ক্রীড়া ঐতিহ্যকে এগিয়ে নেওয়া এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ তৈরির প্রয়োজনীয়তা।
প্রতিটি ইউনিয়নে খেলার মাঠ তৈরির ওপর গুরুত্ব
তরুণদের খেলাধুলার সুযোগ বাড়াতে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে খেলার মাঠ তৈরির সরকারি উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, খেলাধুলার বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত মাঠ ও উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। মাঠের অভাবে যেন শিশু-কিশোর ও তরুণেরা খেলাধুলা থেকে দূরে সরে না যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
রাষ্ট্রপতি অবৈধ দখল থেকে খেলার মাঠ উদ্ধার, বিদ্যমান মাঠ সংরক্ষণ এবং নতুন মাঠের জন্য উপযুক্ত স্থান চিহ্নিত করার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, মাঠ কেবল খেলাধুলার জায়গা নয়; এটি তরুণদের সুস্থ বিকাশ, সামাজিক বন্ধন এবং ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
দেশের আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সাফল্যের প্রসঙ্গ তুলে রাষ্ট্রপতি বলেন, বিদেশি দল ও খেলোয়াড়দের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হওয়ার পাশাপাশি নিজেদের খেলোয়াড় তৈরি করতে হবে। আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলের দিকে তাকিয়ে থাকার পরিবর্তে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিভাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। এজন্য তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিভা অন্বেষণ, নিয়মিত প্রতিযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
নারী অ্যাথলেটদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান
ক্রীড়াক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, দেশের নারী অ্যাথলেটদের প্রতিভা বিকাশের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, নিরাপদ পরিবেশ এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। স্কুল পর্যায় থেকেই মেয়েদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণ বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
এ লক্ষ্যে দ্রুত ‘ইন্টার স্কুল স্পোর্টস কম্পিটিশন’ চালুর আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রতিযোগিতা আয়োজন করা গেলে অল্প বয়স থেকেই প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক বিকাশেও খেলাধুলা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বিশ্বমানের অ্যাথলেট গড়ে তুলতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের ওপর জোর দেন রাষ্ট্রপতি। ব্যাংক, বীমা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্রীড়ার দীর্ঘমেয়াদি পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জনের জন্য পরিকল্পিত বিনিয়োগ, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং ধারাবাহিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
উপস্থিত ছিলেন ক্রীড়াঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা
প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মাহফুজুল আলম খান, অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের সভাপতি মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ জাবের এবং সাধারণ সম্পাদক আলী ইমাম তপন। এ ছাড়া দেশের বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক ও গণমাধ্যমকর্মীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
এর আগে শুক্রবার বিকেলে জাতীয় স্টেডিয়ামে প্রতিযোগিতার মশাল প্রজ্বলন করেন সাবেক অ্যাথলেট মহিউদ্দিন আহমেদ মোস্তাক ও সুমিতা রানী। মশাল প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমে গতি আসে। পরে খেলোয়াড় ও বিচারকদের পক্ষ থেকে প্রতিযোগিতায় সুষ্ঠু, নিয়মতান্ত্রিক ও ক্রীড়াসুলভ মনোভাব নিয়ে অংশগ্রহণের শপথ পাঠ করানো হয়।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা অ্যাথলেটদের অংশগ্রহণে শুরু হওয়া এ প্রতিযোগিতা নতুন প্রতিভা তুলে আনা এবং জাতীয় পর্যায়ে অ্যাথলেটিক্সের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তৃণমূল থেকে আন্তর্জাতিক সাফল্যের প্রত্যাশা
‘কোকো ১৮তম জাতীয় সামার অ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতা-২০২৬’ শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়, বরং দেশের অ্যাথলেটিক্সের বিকাশ এবং তরুণ প্রজন্মকে মাঠমুখী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। নিয়মিত প্রতিযোগিতা, উন্নত প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে দেশের অ্যাথলেটরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের সামর্থ্য তুলে ধরতে পারবেন।
মাদক ও মোবাইল আসক্তি থেকে তরুণদের দূরে রাখা, নারী অ্যাথলেটদের সমান সুযোগ সৃষ্টি এবং প্রতিটি এলাকায় খেলাধুলার পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর রাষ্ট্রপতির আহ্বানও অনুষ্ঠানে বিশেষ গুরুত্ব পায়। তৃণমূল পর্যায়ে খেলাধুলার বিস্তার ঘটিয়ে একটি সুস্থ ও মাদকমুক্ত প্রজন্ম গড়ে তোলার প্রত্যাশা নিয়েই শুরু হলো এবারের জাতীয় সামার অ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতা।




