মানুষের মতো দেখতে রোবটদের নিয়ে শুরু হয়েছে এক অভিনব ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। চীনের বেইজিংয়ে বসেছে দ্বিতীয় বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমস। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মহড়ায় সারিবদ্ধভাবে মার্চ করেছে হিউম্যানয়েড রোবট। আর এখন শুরু হয়েছে মূল প্রতিযোগিতা।
পাঁচ দিনব্যাপী এই আয়োজনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অংশ নিয়েছে দুই হাজারের বেশি হিউম্যানয়েড রোবট। মোট ৫১টি ইভেন্টে অনুষ্ঠিত হবে ১ হাজার ৩০১টি ম্যাচ। এবারের আসরটি ২২ থেকে ২৬ আগস্ট বেইজিংয়ের ন্যাশনাল স্পিড স্কেটিং ওভালে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
দ্বিতীয় বার্ষিক বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমস চীনের বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিযোগিতাটি ২০২৬ সালের ২২ আগস্ট থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত চলবে।
শুধু রোবটের দৌড় কিংবা ফুটবলই নয়, এবারের প্রতিযোগিতার পরিধি আরও বড়। ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন খেলাধুলার পাশাপাশি রোবটদের বাস্তব জীবনের কাজ করার সক্ষমতাও পরীক্ষা করা হচ্ছে। মোট ৫১টি প্রতিযোগিতার মধ্যে ৩০টি প্রচলিত ক্রীড়াভিত্তিক এবং ২১টি বাস্তব কাজের পরিস্থিতি অনুকরণ করে সাজানো হয়েছে।
দৌড়, ফুটবল, টেবিল টেনিস, ওজন তোলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন শারীরিক দক্ষতার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে রোবটগুলো। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক গাড়িতে চার্জ দেওয়া, রেস্তোরাঁয় সেবা দেওয়া, জরুরি পরিস্থিতিতে কাজ করা কিংবা বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সংযোগের মতো কাজও করতে হচ্ছে তাদের।
এবারের আসরে অংশ নিচ্ছে ১৬টি দেশের ৬৬৬টি দল। মোট রোবটের সংখ্যা ২ হাজার ৫৬টি। চীনের অংশগ্রহণই সবচেয়ে বেশি। দেশটির ৬৪১টি দল নিয়ে এসেছে ১ হাজার ৯৭৫টি রোবট।
তবে এই আয়োজনকে শুধু বিনোদন বা প্রদর্শনী হিসেবে দেখছেন না আয়োজকরা। হিউম্যানয়েড রোবটকে ভবিষ্যতে বাস্তব জীবনের কাজে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব, সেটিই বড় পরীক্ষার বিষয়। তাই রোবটগুলোর গতি, ভারসাম্য ও শক্তির পাশাপাশি তাদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে কাজ করার সক্ষমতাও যাচাই করা হচ্ছে।
এবারের আসরে স্বয়ংক্রিয়তার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ৪০ শতাংশের বেশি কাজ এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেখানে রোবটকে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে। অর্থাৎ দূর থেকে মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই পরিস্থিতি বুঝে কাজ সম্পন্ন করতে হবে রোবটকে।
উদ্বোধনের পর থেকেই রোবটদের পারফরম্যান্সে চমক দেখা গেছে। ১০০ মিটার দৌড়ে চীনের একটি হিউম্যানয়েড রোবট ৯ দশমিক ৩৯ সেকেন্ড সময় নিয়ে দৌড় শেষ করেছে। সংখ্যার হিসাবে এই সময় উসাইন বোল্টের ৯ দশমিক ৫৮ সেকেন্ডের বিশ্বরেকর্ডের চেয়েও দ্রুত। তবে রোবটের এই সময়কে মানুষের বিশ্বরেকর্ডের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত পার্থক্যও বিবেচনায় রাখতে হয়।
শুধু দৌড় নয়, উচ্চলাফেও রোবটের সক্ষমতা নজর কেড়েছে। একটি হিউম্যানয়েড রোবট ২ দশমিক ৮৮ মিটার স্ট্যান্ডিং হাই জাম্প করে চমক দেখিয়েছে। মানুষের বর্তমান বিশ্বরেকর্ড ২ দশমিক ৪৫ মিটার।
তবে প্রযুক্তির এই অগ্রগতির পাশাপাশি সীমাবদ্ধতাও চোখে পড়ছে। দ্রুত দৌড়ানোর পর অনেক রোবট ঠিকভাবে থামতে না পেরে নিরাপত্তা ব্যারিয়ারে ধাক্কা খাচ্ছে। অর্থাৎ গতি বাড়ানোর পাশাপাশি ভারসাম্য, নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তব পরিস্থিতিতে নিরাপদভাবে কাজ করার সক্ষমতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
এই কারণেই এবারের বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমসকে শুধু কে কত দ্রুত দৌড়াতে পারে, তার প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং মানুষের মতো জটিল পরিবেশে রোবট কতটা নির্ভুলভাবে কাজ করতে পারে, সেটিই হয়ে উঠেছে বড় পরীক্ষা।
চীনের জন্যও এই আয়োজনের গুরুত্ব অনেক। দেশটি হিউম্যানয়েড রোবট প্রযুক্তির উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক ব্যবহারে বড় বিনিয়োগ করছে। বিশ্ব রোবট সম্মেলনের সঙ্গেও এই গেমস আয়োজন করা হয়েছে, ফলে একসঙ্গে প্রদর্শিত হচ্ছে রোবট প্রযুক্তির গবেষণা, ক্রীড়া সক্ষমতা এবং বাস্তব জীবনে ব্যবহারের সম্ভাবনা।
২০২৫ সালে প্রথমবার বেইজিংয়ে আয়োজন করা হয়েছিল বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমস। প্রথম আসরে অংশ নিয়েছিল ৫০০টির বেশি রোবট। মাত্র এক বছর পর এবার অংশগ্রহণের পরিসর অনেক বেড়েছে। দ্বিতীয় আসরে দুই হাজারের বেশি রোবট এবং ৬৬৬টি দল অংশ নিচ্ছে।
ফলে বেইজিংয়ের এই আয়োজন এখন শুধু রোবটদের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং ভবিষ্যতের প্রযুক্তির সক্ষমতা যাচাইয়ের এক বড় মঞ্চ। মানুষের মতো হাঁটা, দৌড়ানো, খেলাধুলা কিংবা কাজ করার সক্ষমতা কতটা এগিয়েছে। আগামী পাঁচ দিন ধরে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমস।


