একসময় ক্রিকেটকে বলা হতো এমন এক খেলার মঞ্চ, যেখানে রাজনীতি থেকে দূরে থেকে মানুষ নিখাদ বিনোদন ও প্রতিযোগিতার স্বাদ নিতে পারে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারণা যেন ভেঙে পড়ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের প্রভাব ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে আলোচনা তীব্রতর হয়েছে। ২০২৬ সালের উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালম্যানাকের ১৬৩তম সংস্করণে এই বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট ও কড়া সমালোচনা করা হয়েছে।
উইজডেনের সম্পাদক লরেন্স বুথ তার ‘নোটস বাই দ্য এডিটর’ অংশে উল্লেখ করেন, ক্রিকেট এখন আর শুধুই খেলা নয়; বরং এটি ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে উঠেছে। তার ভাষায়, “ক্রিকেট এখন বিজেপির ভূ-রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।”
২০২৫ সালের এশিয়া কাপ প্রসঙ্গ টেনে তিনি ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত ওই আসরের সময় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। বিশেষ করে পাহালগাম হত্যাকাণ্ড এবং অপারেশন সিন্দুরকে ঘিরে দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েন মাঠের খেলাতেও প্রভাব ফেলে।
বুথের মতে, টুর্নামেন্ট চলাকালে কিছু আচরণ ক্রিকেটের চেতনার পরিপন্থী ছিল। ভারত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যানমহসিন নাকভির হাত থেকে ট্রফি নিতে অস্বীকৃতি এবং খেলোয়াড়দের কিছু উস্কানিমূলক অঙ্গভঙ্গি খেলাটির সৌন্দর্য নষ্ট করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এসব ঘটনা ক্রিকেটের ঐতিহ্যগত সৌহার্দ্য ও সম্মানের মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বিসিসিআই যেন বিজেপি’র অঙ্গ প্রতিষ্ঠান
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড, বিসিসিআই ধীরে ধীরে ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি, বিজেপি’র প্রভাবাধীন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বুথ উল্লেখ করেন, এই সম্পর্কের প্রতিফলন দেখা যায় মাঠের পারফরম্যান্স ও উদযাপনেও। উদাহরণ হিসেবে তিনি ভারতীয় অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব -এর একটি মন্তব্য তুলে ধরেন,
যেখানে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়কে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি উৎসর্গ করেন। বুথের দৃষ্টিতে, এটি প্রমাণ করে যে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট এখন অনেকাংশেই রাজনৈতিক বার্তা প্রচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এছাড়া, আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কোলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বাংলাদেশের পেসার মুস্তাফিজুর রহমান কে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাকেও তিনি সম্পূর্ণ ক্রীড়াভিত্তিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেননি। বরং তার মতে, এর পেছনেও রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে, যা বর্তমান ক্রিকেট ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রশ্ন তোলে।
সবশেষে বুথ আক্ষেপ করে বলেন, বিশ্ব ক্রিকেটের শাসনব্যবস্থা দিন দিন আরও একপেশে হয়ে উঠছে এবং এতে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তার মতে, ক্রিকেটকে যদি সত্যিকার অর্থে বৈশ্বিক ও নিরপেক্ষ রাখতে হয়, তবে এই রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
