ওয়ানডে ক্রিকেটে অবিশ্বাস্য সব ইনিংসের সাক্ষী হয়েছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। তবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শাদাব খানের ব্যাটিং যেন সবকিছুকেই ছাপিয়ে গেছে। দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরিতে পাকিস্তানকে প্রায় অসম্ভব এক জয় এনে দিয়েছেন এই অলরাউন্ডার। তাঁর এমন অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সে মুগ্ধ পাকিস্তানের অধিনায়ক শাহিন শাহ আফ্রিদি। তাঁর মতে, নিজের ক্রিকেটজীবনে এমন ইনিংস আগে কখনও দেখেননি তিনি।
রোববার ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২৪২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১ উইকেটের নাটকীয় জয় তুলে নেয় পাকিস্তান। দলের একের পর এক উইকেট পতনের মধ্যেও শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান শাদাব। তাঁর দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে শেষ পর্যন্ত হাসি ফোটে পাকিস্তান শিবিরে।
শেষ উইকেটে হারিস রউফকে সঙ্গে নিয়ে অবিচ্ছিন্ন ৮৯ রানের জুটি গড়েন শাদাব। ওয়ানডে ক্রিকেটে সফল রান তাড়ায় দশম উইকেটে এটিই রেকর্ড জুটি। একসময় ১৫৪ রানেই ৯ উইকেট হারিয়ে ফেলা পাকিস্তানের জয়ের সম্ভাবনা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শাদাবের অসাধারণ ব্যাটিং ম্যাচের পুরো চিত্র বদলে দেয়।
পাকিস্তানের নবম উইকেট পড়ার পর লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়াম থেকে অনেক দর্শকই বাড়ির পথ ধরেছিলেন। তখন ম্যাচের ফলাফল প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু শাদাব ক্রিজে থেকে ধীরে ধীরে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। অন্য প্রান্তে হারিস রউফকে সঙ্গে নিয়ে একের পর এক দৃষ্টিনন্দন শটে ম্যাচে ফের উত্তেজনা ফিরিয়ে আনেন তিনি।
৪৫তম ওভারের প্রথম বলে গাস অ্যাটকিনসনকে ছক্কা হাঁকিয়ে ৯৭ রানে পৌঁছান শাদাব। পরের বলেই লেগ সাইডে খেলতে গিয়ে বল তাঁর প্যাডে লাগলে আম্পায়ার তাঁকে এলবিডব্লিউ আউট ঘোষণা করেন। শাদাব নিজেও প্রথমে আউট ভেবে হতাশ হয়ে পড়েন। দুই দলের ক্রিকেটারদের মধ্যে হাত মেলানোর প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু রিভিউ নেওয়ার পর রিপ্লেতে দেখা যায়, বলটি আগে তাঁর ব্যাটে লেগেছিল। ফলে জীবন ফিরে পান এই অলরাউন্ডার।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি তুলে নেওয়ার পাশাপাশি দলকে অবিশ্বাস্য জয় এনে দেন শাদাব। ৯৬ বলে ১৩টি চার ও পাঁচটি ছক্কায় অপরাজিত ১১৩ রান করেন তিনি। ওয়ানডে ক্রিকেটে আট নম্বর বা তার নিচে ব্যাটিংয়ে নেমে এটিই সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস।
ম্যাচ শেষে শাদাবের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন পাকিস্তান অধিনায়ক শাহিন শাহ আফ্রিদি। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, শাদাব ও হারিসের এমন লড়াই তাঁর ক্রিকেটজীবনের অন্যতম অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা।
আফ্রিদির ভাষায়, “আমি কিছু বলতে পারছি না। শাদাব ও হারিস যেভাবে ম্যাচটি শেষ করল, তাদের ৮৯ বা ৯০ রানের মতো জুটি। তবে আমার ক্যারিয়ারে, এমনকি ছোটবেলা থেকেও আমার জীবনে এমন ইনিংস আর কখনও দেখিনি। অধিনায়ক হিসেবে আমি সত্যিই খুব খুশি।”
নিজের অসাধারণ ইনিংসে স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বসিত শাদাবও। তবে জয়ের আনন্দকেই সবচেয়ে বড় করে দেখছেন তিনি। একই সঙ্গে শেষ মুহূর্তে হারিস রউফের অবদানের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন এই অলরাউন্ডার।
শাদাব বলেন, “একটি ইনিংস তখনই উপভোগ্য হয় যখন দল জেতে। তাই আমি খুবই খুশি যে, এমন একটি ইনিংস খেলতে পেরেছি এবং আমরা ম্যাচটি জিতেছি।”
শেষ উইকেটে হারিসের সঙ্গে জুটি গড়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, “আমার মনে হয়, আমার চেয়ে হারিসের বেশি কৃতিত্ব প্রাপ্য। কারণ, শেষ দিকে ব্যাট করতে নামা ব্যাটাররা সবসময় ছক্কা মারার চেষ্টায় থাকে। আমি তাকে যেভাবে নির্দেশনা দিচ্ছিলাম, অথবা সে আমাকে যেভাবে সাহায্য করছিল, তাতে আমরা বেশ ভালো একটি জুটি গড়ে তুলতে পেরেছিলাম।”
শেষ পর্যন্ত চার মেরে পাকিস্তানের জয় নিশ্চিত করেন হারিস রউফ। ১৯ বলে ৭ রান করে অপরাজিত থাকেন তিনি। তবে শাদাবের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্রিজে তাঁদের মধ্যে শুধু ক্রিকেট নিয়েই আলোচনা হয়নি; বরং কঠিন পরিস্থিতিতেও তাঁরা নিজেদের মধ্যে হাসি-ঠাট্টা চালিয়ে গেছেন।
এ প্রসঙ্গে মজা করে শাদাব বলেন, “আমি তাকে যতটা না বোঝাচ্ছিলাম, তার চেয়ে বেশি সে আমাকে বোঝাচ্ছিল। সে এমন সব কথা বলছিল, যা আমার মনে হয় না আমরা সরাসরি সম্প্রচারে প্রকাশ করতে পারব। আমাদের মধ্যে অনেক মজার মুহূর্ত ছিল এবং আমরা সত্যিই খুব উপভোগ করেছি। ক্রিকেটের চেয়ে অন্য বিষয়গুলো নিয়েই আমরা বেশি কথা বলেছি।”
শাদাব খানের এই ইনিংস শুধু পাকিস্তানকে রোমাঞ্চকর জয়ই এনে দেয়নি, বরং ওয়ানডে ক্রিকেটের স্মরণীয় ইনিংসগুলোর তালিকায়ও জায়গা করে নিয়েছে। আর তাঁর এই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের সাক্ষী হয়ে অধিনায়ক শাহিন শাহ আফ্রিদির মুখেও উঠে এসেছে বিস্ময়ের কথা-এমন ইনিংস তিনি আগে কখনও দেখেননি।


