বিনা উইকেটে ১৫৮ থেকে ৩২৯ রানে অলআউট দক্ষিণ আফ্রিকা

স্টার্কের ছয় উইকেটে ধস দক্ষিণ আফ্রিকার

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ নির্ধারণী তৃতীয় টেস্টের প্রথম দিনে দুর্দান্ত বোলিংয়ে ম্যাচে ঘুরে দাঁড়িয়েছে অস্ট্রেলিয়া। একসময় ১৫৮ রানে কোনো উইকেট না হারানো দক্ষিণ আফ্রিকা শেষ পর্যন্ত প্রথম ইনিংসে অলআউট হয়েছে ৩২৯ রানে। অস্ট্রেলিয়ার বাঁহাতি পেসার মিচেল স্টার্ক একাই নিয়েছেন ৬ উইকেট। তাঁর বিধ্বংসী বোলিংয়ে বড় সংগ্রহের সম্ভাবনা জাগিয়েও তা কাজে লাগাতে পারেনি স্বাগতিকরা।

কেপটাউনের নিউল্যান্ডসে টেস্ট সিরিজের তৃতীয় ও নির্ধারণী ম্যাচের প্রথম দিনটি ছিল উত্থান-পতনে ভরা। দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে মার্কেস অ্যাকারম্যান, এইডেন মার্করাম ও মার্কো ইয়ানসেন অর্ধশতক করেছেন। তবে চার ব্যাটার পঞ্চাশ পেরোলেও কেউই ইনিংস বড় করতে পারেননি।

দিন শেষে দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রহ ৩২৯ রান। অ্যাকারম্যান করেছেন ৯৫, মার্করাম ৭৮ এবং ইয়ানসেন ৫২ রান। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে স্টার্ক ৭২ রানে ৬ উইকেট নিয়েছেন। নাথান লায়নের শিকার ৭১ রানে ২ উইকেট।

মার্কেস অ্যাকারম্যানের উইকেট পতনে নাথান লায়ন ও এইডেন মার্করামের ভিন্ন প্রতিক্রিয়া।

টস জিতে দক্ষিণ আফ্রিকাকে প্রথমে ব্যাটিংয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। নিউল্যান্ডসে শুরুতে পেসারদের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি পাওয়ার আশায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু নতুন বলে তেমন সুবিধা করতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া।

দক্ষিণ আফ্রিকার দুই ওপেনার অ্যাকারম্যান ও মার্করাম শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ব্যাটিং করেন। তাঁদের উদ্বোধনী জুটিতে আসে ১৫৮ রান। মধ্যাহ্নভোজের বিরতির আগের ২৭ ওভারে ১৪০ রান তুলে অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের চাপে ফেলেন তাঁরা।

অ্যাকারম্যান ছিলেন বেশি আক্রমণাত্মক। মাত্র ৬২ বলে অর্ধশতক পূর্ণ করেন তিনি। অন্যদিকে মার্করামও শুরুতে কিছুটা সতর্ক থাকার পর স্টার্কের বলে দারুণ দুটি বাউন্ডারি হাঁকান। পরে কামিন্সের একটি ছোট দৈর্ঘ্যের বল মিডউইকেটের ওপর দিয়ে সীমানাছাড়া করে নিজের আক্রমণাত্মক মনোভাবের পরিচয় দেন তিনি।

প্রথম সেশনে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিংয়ের সামনে অনেকটাই অসহায় দেখাচ্ছিল অস্ট্রেলিয়াকে। বিরতির ঠিক আগে ট্রাভিস হেডের হাত ফসকে জীবন পান মার্করাম, যখন তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহ ছিল ৩৯ রান।

মিডউইকেটের ওপর দিয়ে দারুণ শটে বল উড়িয়ে মারলেন মার্কেস অ্যাকারম্যান।

মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পরও রান তোলার গতি কমাননি অ্যাকারম্যান। স্টার্কের এক ওভারে টানা চারটি বাউন্ডারি মেরে নিজের আধিপত্য আরও স্পষ্ট করেন তিনি। তবে লাঞ্চের পর নাথান লায়নের বলে আক্রমণাত্মক শট খেলতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত উইকেট হারান এই ওপেনার।

সেঞ্চুরি থেকে মাত্র পাঁচ রান দূরে থাকতে ৯৫ রানে আউট হন অ্যাকারম্যান। লায়নের বল সামনে এগিয়ে এসে খেলতে গিয়ে পরাস্ত হন তিনি। উইকেটের পেছনে অ্যালেক্স ক্যারি সহজেই স্টাম্পিং সম্পন্ন করেন। ৯৪ বলের ইনিংসটি সাজানো ছিল বেশ কয়েকটি দৃষ্টিনন্দন বাউন্ডারি ও আক্রমণাত্মক শটে।

এরপরও মার্করাম ও ডেভিড বেডিংহাম মিলে স্কোরবোর্ড সচল রাখেন। কিন্তু জশ হ্যাজলউডের বলে পুল শট খেলতে গিয়ে ভুল করেন মার্করাম। লং-লেগ অঞ্চলে নিচু ক্যাচ নিয়ে তাঁকে ফেরান স্টার্ক। ৭৮ রান করে আউট হন দক্ষিণ আফ্রিকার এই ব্যাটার।

এরপর অধিনায়ক টেম্বা বাভুমা কোনো রান না করেই লায়নের বলে বোল্ড হলে চাপে পড়ে যায় স্বাগতিকরা।

তিন বলে দুই উইকেট, স্টার্কের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন

চা-বিরতির আগে দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসে ধস নামতে শুরু করে। তবে বিরতির পর স্টার্কের বোলিংয়ে সেই ধস আরও তীব্র হয়। শর্ট বলের কৌশল কাজে লাগিয়ে মাত্র তিন বলের ব্যবধানে ডেভিড বেডিংহাম ও উইয়ান মুল্ডারকে ফিরিয়ে দেন তিনি।

বেডিংহাম ৫০ রান করে হ্যাজলউডের হাতে ক্যাচ দেন। এরপর মুল্ডার ক্যারির গ্লাভসে ক্যাচ দিয়ে ফিরে গেলে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং লাইনআপে বড় ধাক্কা লাগে।

এর আগে বেডিংহাম ও মার্করাম পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট হারানোয় বড় সংগ্রহের সম্ভাবনা ক্রমেই কমতে থাকে।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের আগের ম্যাচগুলোতে অস্ট্রেলিয়ার বোলিংয়ে ধারাবাহিকতার অভাব দেখা গেলেও স্টার্কের এই প্রত্যাবর্তন দলকে নতুন করে লড়াইয়ে ফিরিয়েছে। ১৬.৩ ওভার বল করে ৭২ রান দিয়ে ৬ উইকেট তুলে নেন তিনি।

দক্ষিণ আফ্রিকা ২০০ রানের আগেই পাঁচ উইকেট হারানোর পর সপ্তম উইকেটে প্রতিরোধ গড়েন মার্কো ইয়ানসেন ও রায়ান রিকেলটন। দুজন মিলে যোগ করেন ৯৫ রান। তাঁদের জুটিতে ইনিংসের শেষ দিকে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে পায় দক্ষিণ আফ্রিকা।

শুরুতে সতর্ক ব্যাটিং করলেও পরে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন ইয়ানসেন। কুপার কনোলির বলে বাউন্ডারি মেরে অর্ধশতক পূর্ণ করেন তিনি। টেস্ট ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো টানা দুই ম্যাচে পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস খেললেন এই অলরাউন্ডার। এর আগে গকেবেরহায় সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে করেছিলেন দুর্দান্ত ৮৫ রান।

রিকেলটনও তাঁকে ভালো সঙ্গ দেন। তবে দ্বিতীয় নতুন বল হাতে পাওয়ার পর আবারও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন স্টার্ক। দুর্দান্ত লেংথের বলে প্রথমে রিকেলটন ও পরে ইয়ানসেনকে ফিরিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিরোধ ভেঙে দেন তিনি।

এরপর জেরাল্ড কোয়েটজি ও কাগিসো রাবাদাকেও দ্রুত ফিরিয়ে দেন স্টার্ক। প্রায় দুই বছর পর টেস্ট দলে ফেরা কোয়েটজিও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংস থামে ৩২৯ রানে।

স্মিথকে ছাড়াই মাঠে অস্ট্রেলিয়া

ম্যাচ শুরুর আগেই বড় ধাক্কা খায় অস্ট্রেলিয়া। ঘাড়ের চোট থেকে পুরোপুরি সেরে উঠতে না পারায় তৃতীয় টেস্ট থেকে ছিটকে যান অভিজ্ঞ ব্যাটার স্টিভ স্মিথ। দ্বিতীয় টেস্টে বড় ব্যবধানে হারের পর গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে তাঁর অনুপস্থিতি অস্ট্রেলিয়ার জন্য বড় ক্ষতি।

স্মিথের পরিবর্তে দলে ফেরানো হয় নাথান লায়ন, কুপার কনোলি, ক্যামেরন গ্রিন ও জশ ইংলিসকে। বাদ পড়েন স্কট বোল্যান্ড, নিক ম্যাডিনসন ও বিউ ওয়েবস্টার। জোহানেসবার্গ টেস্টে বল বিকৃতির বিতর্কের পর এই প্রথম একসঙ্গে চারটি পরিবর্তন আনল অস্ট্রেলিয়া।

প্রথমে বোলিং করার সিদ্ধান্ত নিয়ে কামিন্স শুরুতে চাপে পড়লেও স্টার্কের দুর্দান্ত বোলিংয়ে দল ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছে।

প্রথম দিন শেষে লড়াই জমজমাট

একসময় বড় সংগ্রহের পথে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকা শেষ পর্যন্ত ৩২৯ রানে অলআউট হওয়ায় ম্যাচে ফিরে এসেছে অস্ট্রেলিয়া। চার ব্যাটারের অর্ধশতক সত্ত্বেও কেউ সেঞ্চুরি করতে পারেননি, আর সেটিই স্বাগতিকদের জন্য হতাশার কারণ।

অন্যদিকে স্টার্কের ছয় উইকেট অস্ট্রেলিয়াকে ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তবে ৩২৯ রান এখনও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সংগ্রহ। দ্বিতীয় দিনে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা কীভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার বোলিং সামলান, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে সিরিজ নির্ধারণী এই টেস্টের গতিপথ।

spot_imgspot_img
spot_img

Related Articles