এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের জন্য দিনটি ছিল মিশ্র অনুভূতির। একদিকে অ্যাথলেটিক্সে ১০০ মিটারের সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছেন দেশের দ্রুততম মানব ইমরানুর রহমান। অন্যদিকে নারী হকিতে দুর্দান্ত লড়াই করে কাজাখস্তানের সঙ্গে ৩-৩ গোলে ড্র করেছে বাংলাদেশ।
এ ছাড়া ব্যাডমিন্টন, ভারোত্তোলন, সার্ফিং ও শুটিংয়েও মাঠে নেমেছিলেন বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদরা। তবে এসব ইভেন্টে উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি। ফলে দিনের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক হয়ে থাকল নারী হকি দলের লড়াকু পারফরম্যান্স।
নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে কাজাখস্তানের সঙ্গে ড্র
নারী হকিতে বাংলাদেশের শুরুটা ছিল স্বপ্নের মতো। ম্যাচের প্রথম মিনিটেই আইরিন আক্তারের গোলে এগিয়ে যায় লাল-সবুজের দল। দ্রুত গোল পাওয়ায় আত্মবিশ্বাসও বেড়ে যায় বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের।
তবে ম্যাচের পরের অংশে ঘুরে দাঁড়ায় কাজাখস্তান। ধারাবাহিক আক্রমণ থেকে তিনটি গোল করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় তারা। একপর্যায়ে বাংলাদেশ ১-৩ গোলে পিছিয়ে পড়ে।
সেখান থেকে ম্যাচে ফেরার লড়াই শুরু করে বাংলাদেশ। ৩৯ মিনিটে কণা আক্তার ব্যবধান কমিয়ে ২-৩ করেন। গোলটি বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করে।
শেষ পর্যন্ত ৪৬ মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত সমতা। অর্পিতা পাল গোল করে স্কোরলাইন ৩-৩ করে দেন। এরপর দুই দলই জয়ের জন্য চেষ্টা করলেও আর কোনো গোল হয়নি।
ফলে ৩-৩ সমতায় শেষ হয় ম্যাচ। এশিয়ান গেমসের নারী হকিতে এবারই প্রথম অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ, আর এই ম্যাচেই প্রথমবার ড্রয়ের স্বাদ পেল দলটি। তিন গোল করে ম্যাচে ফিরে আসাটাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সেমিফাইনালেই থামলেন ইমরানুর
অ্যাথলেটিক্সে বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত প্রতিযোগী ছিলেন ইমরানুর রহমান। পুরুষদের ১০০ মিটারে নিজের সেরা সময়ের কাছাকাছি যেতে না পারলেও আগের রাউন্ডের তুলনায় সেমিফাইনালে কিছুটা উন্নতি করেছেন তিনি।
প্রাথমিক পর্বের হিটে ইমরানুর ১০.৪৯ সেকেন্ড সময় নিয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছিলেন। সেমিফাইনালে নিজের লেনে নেমে দৌড় শেষ করেন ১০.৪৪ সেকেন্ডে। অর্থাৎ আগের দৌড়ের চেয়ে সময় কমাতে সক্ষম হন তিনি।
তবে ফাইনালে ওঠার জন্য এই সময় যথেষ্ট ছিল না। সেমিফাইনালের প্রথম হিটে তিনি অষ্টম লেন থেকে দৌড়ান এবং আট প্রতিযোগীর মধ্যে সপ্তম হন। তিনটি সেমিফাইনাল হিট মিলিয়ে তার অবস্থান হয় ২১তম।
নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি হিটের শীর্ষ দুই প্রতিযোগী সরাসরি ফাইনালে ওঠেন। পাশাপাশি তিন হিট মিলিয়ে সেরা আরও দুই টাইমিংধারী ফাইনালের টিকিট পান। সেই হিসাবেও জায়গা হয়নি বাংলাদেশের স্প্রিন্টারের।
হতাশ ইমরানুর, তবু দেখছেন ইতিবাচক দিক
সেমিফাইনালের দৌড় শেষে হতাশা লুকাননি ইমরানুর রহমান। নিজের পারফরম্যান্সকে চলতি বছরের অন্যতম খারাপ দৌড় হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
ইমরানুরের ব্যক্তিগত সেরা সময় ১০.১১ সেকেন্ড। চলতি মৌসুমে তার সেরা টাইমিং ১০.২৪ সেকেন্ড। এশিয়ান গেমসের মঞ্চে এর কোনোটির কাছাকাছি যেতে না পারায় স্বাভাবিকভাবেই হতাশ তিনি।
তবে নিজের ক্যারিয়ারের সাম্প্রতিক বাস্তবতাও সামনে রেখেছেন এই স্প্রিন্টার। প্যারিস অলিম্পিকের পর প্রায় দুই বছর চোটের কারণে মাঠের বাইরে ছিলেন তিনি। দীর্ঘ বিরতির পর এটিই তার ফিরে আসার প্রথম মৌসুম।
সেই কারণে বর্তমান অবস্থাকে পুরোপুরি নেতিবাচক হিসেবে দেখতে চান না ইমরানুর। বরং চোট থেকে ফিরে আবার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারাটাকেও তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও ভালো টাইমিং করার প্রত্যয়ও জানিয়েছেন।
ব্যাডমিন্টনে জয়ের দেখা নেই
ব্যাডমিন্টনেও বাংলাদেশের দিনটি ভালো কাটেনি। পুরুষদের দ্বৈত ইভেন্টে আল আমিন ঝুমার ও মোজাম্মেল হোসেন ওহিদুল জাপানের প্রতিপক্ষের বিপক্ষে সরাসরি দুই গেমে হেরে যান।
বাংলাদেশি জুটি প্রথম গেমে ৯ পয়েন্ট এবং দ্বিতীয় গেমে ১১ পয়েন্ট সংগ্রহ করে। শেষ পর্যন্ত ৯-২১, ১১-২১ ব্যবধানে ম্যাচটি হারতে হয় তাদের।
মিশ্র দ্বৈতেও বাংলাদেশের সামনে জয় আসেনি। ঝুমার ও উর্মি আক্তারের জুটি মালয়েশিয়ার প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ১৪-২১ ও ৯-২১ ব্যবধানে পরাজিত হয়।
ভারোত্তোলনে পঞ্চম স্মৃতি
ভারোত্তোলনেও অংশ নেন বাংলাদেশের স্মৃতি আক্তার। প্রতিযোগিতায় মোট ১৭৫ স্কোর করে সাত প্রতিযোগীর মধ্যে পঞ্চম অবস্থানে থেকে ইভেন্ট শেষ করেন তিনি।
পদকের লড়াইয়ে যেতে না পারলেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন স্মৃতি। প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের আসরগুলোতে তার প্রস্তুতিতে কাজে লাগতে পারে।
সার্ফিংয়ে বাছাইপর্বে তৃতীয় ফাতেমা
সার্ফিংয়েও বাংলাদেশের হয়ে লড়েছেন ফাতেমা আক্তার। বাছাইপর্বে তৃতীয় অবস্থানে থেকে পরবর্তী পর্যায়ের জন্য নিজের অবস্থান জানান দিয়েছেন তিনি।
সমুদ্রনির্ভর এই খেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে নতুন। তাই আন্তর্জাতিক মঞ্চে অভিজ্ঞতা অর্জনও বাংলাদেশের সার্ফারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
শুটিংয়ে ২৩তম আবদুল্লাহ হেল বাকী
৫০ মিটার রাইফেল থ্রি পজিশন ইভেন্টে বাংলাদেশের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আবদুল্লাহ হেল বাকী। প্রতিযোগিতা শেষ করেন ২৩তম অবস্থানে।
শুটিংয়ে বাংলাদেশের অন্যতম অভিজ্ঞ মুখ হলেও এবারের প্রতিযোগিতায় প্রত্যাশিত অবস্থানে যেতে পারেননি বাকী। ফলে এই ইভেন্ট থেকেও পদকের সম্ভাবনা তৈরি হয়নি।
সামনে আরও সুযোগ
এশিয়ান গেমসের মতো বড় আসরে একটি দিনের ফলাফল দিয়ে বাংলাদেশের সামগ্রিক পারফরম্যান্সের চিত্র পাওয়া যায় না। ইতোমধ্যে কিছু ইভেন্টে প্রত্যাশা পূরণ না হলেও নারী হকি দলের কামব্যাক নতুন আশার জায়গা তৈরি করেছে।
কাজাখস্তানের বিপক্ষে একসময় দুই গোল পিছিয়ে থেকেও ম্যাচে ফিরে আসা বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের লড়াইয়ের মানসিকতারই প্রমাণ দিয়েছে। অন্যদিকে ইমরানুরের ক্ষেত্রে দীর্ঘ চোটের পর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ফেরাটিও আলাদা গুরুত্ব বহন করছে।
বাকি ইভেন্টগুলোতে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের সামনে এখন নিজেদের সেরাটা দেওয়ার সুযোগ। পদকের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সেরা পারফরম্যান্স, অভিজ্ঞতা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের উন্নতি করাও এবারের গেমসে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে থাকবে।




