স্মিথ-ম্যাক্সওয়েলের শূন্যতা পূরণ
আর মাত্র এক বছর। এরপরই নিজেদের ওয়ানডে বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখার মিশনে নামবে অস্ট্রেলিয়া। আগামী বছরের অ্যাশেজ সিরিজ ঘিরে টেস্ট ক্রিকেটের ব্যস্ততা এখন বেশি আলোচনায় থাকলেও, তার পরপরই শুরু হবে ওয়ানডে বিশ্বকাপ। তাই শিরোপা ধরে রাখার প্রস্তুতিও এখন থেকেই শুরু করতে হচ্ছে অস্ট্রেলিয়াকে।
বিশ্বকাপের আগে অস্ট্রেলিয়ার হাতে অবশ্য খুব বেশি ওয়ানডে নেই। বর্তমান সূচি অনুযায়ী বিশ্বকাপের আগে মাত্র ১২টি ওয়ানডে খেলার সুযোগ পাবে তারা। এর মধ্যে আগামী দুই সপ্তাহে জিম্বাবুয়ে ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দু’টি সিরিজ খেলবে অস্ট্রেলিয়া। বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতে এই দুই সিরিজকে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছে দলটির নির্বাচকেরা।
২০২৩ সালের বিশ্বকাপের পর এখন পর্যন্ত ২৮টি ওয়ানডে খেলেছে অস্ট্রেলিয়া। এর মধ্যে জয় এসেছে ১৩টিতে। দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলেছে আটটি, জিতেছে মাত্র তিনটি। অর্থাৎ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল হলেও ওয়ানডেতে সাম্প্রতিক সময়টা খুব একটা ধারাবাহিক নয়। বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখতে হলে আগামী এক বছরে বেশ কিছু জায়গায় সমাধান খুঁজতে হবে তাদের।
মাঝের সারিতে বড় পরিবর্তন
অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় চিন্তার জায়গাগুলোর একটি এখন ব্যাটিংয়ের মাঝের সারি। ওপেনিংয়ে ট্রাভিস হেড ও মিচেল মার্শকে নিয়ে আপাতত খুব বেশি সংশয় নেই। দুজনকেই দলের ব্যাটিংয়ের ওপরের দিকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কিন্তু তিন থেকে সাত নম্বর পর্যন্ত জায়গাগুলো এখনো পুরোপুরি নির্ধারিত নয়। ২০২৩ বিশ্বকাপজয়ী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য স্টিভেন স্মিথ আন্তর্জাতিক ওয়ানডে থেকে অবসর নিয়েছেন। একই সঙ্গে মার্নাস লাবুশেনকেও বর্তমান ওয়ানডে দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। যদিও বিশ্বকাপের আগে লাবুশেন আবারও নির্বাচকদের ভাবনায় ফিরতে পারেন।
অস্ট্রেলিয়ার হাতে এখন মাঝের সারির জন্য বেশ কয়েকটি বিকল্প। ক্যামেরন গ্রিনকে এখানে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার সঙ্গে আছেন কুপার কনলি, জশ ইংলিস, অ্যালেক্স ক্যারি, ম্যাট রেনশ, অলিভার পিক ও জোয়েল ডেভিস।
বাংলাদেশের বিপক্ষে মিরপুরে কুপার কনলি ওপেন করে দুর্দান্ত ১৪৯ রানের ইনিংস খেলেছিলেন। তবে তাকে তিন নম্বরেও ব্যবহার করা যেতে পারে। আবার প্রয়োজনে নিচের দিকেও খেলতে পারেন তিনি। ফলে অস্ট্রেলিয়ার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে খেলোয়াড়দের শুধু দলে নেওয়া নয়, বরং নির্দিষ্ট ব্যাটিং পজিশনে তাদের স্থির করা।
বিশ্বকাপের আগে মাত্র ১২টি ওয়ানডে থাকায় অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগও কম। তাই অস্ট্রেলিয়া এখন এমন খেলোয়াড়দের নিয়ে এগোতে চাইবে, যারা নিজেদের নির্দিষ্ট ভূমিকায় অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারবেন।
ম্যাক্সওয়েলের জায়গা পূরণ বড় পরীক্ষা
মাঝের সারির পাশাপাশি আরেকটি বড় প্রশ্ন, গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের শূন্যতা পূরণ করবে কে? ২০২৩ বিশ্বকাপে ম্যাক্সওয়েল ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। ব্যাট হাতে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বল হাতেও দলের ভারসাম্য বাড়াতেন তিনি। তার উপস্থিতির কারণে অস্ট্রেলিয়া কার্যত সাতজন মূল ব্যাটার নিয়ে খেলতে পারত। আডাম জাম্পার সঙ্গে দ্বিতীয় স্পিনার হিসেবেও কাজ করতেন ম্যাক্সওয়েল।
এখন সেই ভারসাম্য তৈরি করাই অস্ট্রেলিয়ার বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমান দলে একমাত্র বিশেষজ্ঞ স্পিনার হিসেবে জাম্পাই আছেন। বিশ্বকাপেও সম্ভবত এই পরিকল্পনাই থাকবে। তবে ম্যাক্সওয়েলের মতো দ্বিতীয় স্পিনারের প্রয়োজনীয়তা ভারতের কন্ডিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে। কারণ ক্যামেরন গ্রিনকে চতুর্থ পেসার হিসেবে বল হাতে বড় ভূমিকা রাখার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ম্যাট রেনশ, কুপার কনলি, ট্রাভিস হেড ও জোয়েল ডেভিসও প্রয়োজনে স্পিন করতে পারেন। বাংলাদেশের বিপক্ষে কনলি পিঠের চোটের কারণে বোলিং করতে পারেননি। এখন অবশ্য তিনি পুরোপুরি ফিট।
রেনশর অফস্পিন ম্যাক্সওয়েলের মানের না হলেও দলের জন্য কার্যকর বিকল্প। হেডও নিয়মিত অফস্পিন করতে পারেন। অন্যদিকে বাঁহাতি স্পিনার জোয়েল ডেভিসও আলোচনায় উঠে এসেছেন। যদিও লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে তার অভিজ্ঞতা এখনো মাত্র তিন ম্যাচের।
ছয় ও সাত নম্বরে কে?
অস্ট্রেলিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছয় ও সাত নম্বর নিয়ে। ২০২৩ বিশ্বকাপে এই ভূমিকায় ম্যাক্সওয়েল ও মার্কাস স্টয়নিস বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। এখন তাদের জায়গায় এমন খেলোয়াড় দরকার, যারা শেষ দিকে দ্রুত রান তুলতে পারবেন এবং প্রয়োজনে বলও করতে পারবেন।
২০২৩ বিশ্বকাপের পর থেকে সাত নম্বরে ব্যাট করা খেলোয়াড়দের গড়ের দিক থেকে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান খুব একটা ভালো নয়। শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও জিম্বাবুয়ের গড় অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে কম। স্ট্রাইক রেটও খুব একটা উঁচু নয়।
ক্যামেরন গ্রিনের বড় শট খেলার সামর্থ্য রয়েছে। তবে দলের প্রয়োজনে তাকে হয়তো আরও ওপরের দিকে খেলতে হবে। একই কথা প্রযোজ্য জশ ইংলিসের ক্ষেত্রেও। তরুণ অলিভার পিক কিছুটা দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার পথচলা এখনো একেবারে শুরুর দিকে।
অর্থাৎ বিশ্বকাপের এক বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার সামনে সবচেয়ে বড় কাজগুলোর একটি হলো, কে হবে দলের শেষ দিকের ব্যাটিংয়ের নির্ভরযোগ্য ভরসা, সেটি নিশ্চিত করা।
তিন পেসারের বিকল্প পরিকল্পনা
অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণ নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজলউড ও প্যাট কামিন্স, এই তিন বিশ্বকাপজয়ী পেসারকে নিয়ে আবারও বিশ্বকাপে খেলতে চায় অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাদের সামনে টেস্ট ক্রিকেটের অত্যন্ত ব্যস্ত সূচি।
এই সফরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজে স্টার্ক ও কামিন্স যোগ দেবেন। তবে বিশ্বকাপের আগে তারা আর কতগুলো ওয়ানডে খেলবেন, তা নিশ্চিত নয়। এমনকি পরবর্তী সময়ে খুব বেশি ওয়ানডে খেলার সুযোগ নাও হতে পারে তাদের।
গত বছরের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেও এই তিনজনকে ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণ কিছুটা দুর্বল দেখিয়েছিল। অবশ্য সেটি খুব বেশি বিস্ময়েরও নয়। স্টার্ক, হ্যাজলউড ও কামিন্স মিলে ওয়ানডেতে ৫৩২ উইকেট নিয়েছেন। ২০২৩ সালের আহমেদাবাদ বিশ্বকাপ ফাইনালের পর এই তিনজন একসঙ্গে মাত্র একটি ওয়ানডে খেলেছেন।
তাই আগামী বিশ্বকাপে তিনজন একসঙ্গে খেললেও অস্ট্রেলিয়াকে স্কোয়াডে আরও কয়েকজন পেসার রাখতে হবে। সেখানেই সামনে আসছে নাথান এলিসের নাম।
এলিসের ভূমিকা বদলের পরীক্ষা
২০২৩ বিশ্বকাপের দলে জায়গা না পাওয়া নাথান এলিস এবার নিজেকে আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সফরে নতুন বলে বোলিং করে নজর কেড়েছেন তিনি। এতে প্রমাণ হয়েছে, এলিস শুধু ডেথ ওভারের বা টি-টোয়েন্টির বোলার নন।
নতুন বলে বোলিং করার দায়িত্ব নেওয়াটাও তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দীর্ঘ সময় পর নতুন বল হাতে পাওয়ায় শুরুতে কিছুটা নার্ভাস ছিলেন এলিস। তবে ঘরোয়া ক্রিকেটে ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি নিয়মিত নতুন বলেই বোলিং করতেন। পরে অস্ট্রেলিয়ার দলে নতুন বলের বোলারের সংখ্যা বেশি থাকায় তার ভূমিকা বদলে মাঝের ওভার থেকে ডেথ ওভারের দিকে চলে যায়।
এখন সেই অভিজ্ঞতাই বিশ্বকাপের আগে তাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।
নজরে স্পেন্সার জনসন ও বার্টলেট
জিম্বাবুয়ে ও দক্ষিণ আফ্রিকা সফর স্পেন্সার জনসনের জন্যও বড় সুযোগ। দীর্ঘদিন ধরে তাকে স্টার্কের মতো বাঁহাতি পেসার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে পিঠের চোট থেকে ফিরে এবার তাকে প্রমাণ করতে হবে, ৫০ ওভারের ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় ধরে বোলিং করার মতো ফিটনেস ও ধারাবাহিকতা তার আছে কি না।
এদিকে জেভিয়ার বার্টলেটও অস্ট্রেলিয়ার পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি মূলত নতুন বলের সুইং বোলার। দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশন তার বোলিংয়ের জন্য সহায়ক হতে পারে। তাই এই সফরেই নিজের জায়গা আরও শক্ত করার সুযোগ রয়েছে তার সামনে।
বিলি স্ট্যানলেকও নতুন করে আলোচনায় এসেছেন। চলতি বছর ওয়ানডেতে ফিরে এসে তিনি আবারও নিজেকে বিভিন্ন সংস্করণে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছেন। রাইলি মেরেডিথও বিশ্বকাপের পরিকল্পনায় ঢুকে পড়তে পারেন। অন্যদিকে ২০২৩ বিশ্বকাপের স্কোয়াডে থাকা শন অ্যাবট আপাতত নির্বাচকদের বিবেচনায় কিছুটা পিছিয়ে পড়েছেন।
সময় কম, কাজ অনেক
বিশ্বকাপের আগে অস্ট্রেলিয়ার হাতে সময় আছে এক বছর। কিন্তু ওয়ানডে ম্যাচ মাত্র ১২টি। ফলে প্রতিটি সিরিজই তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জিম্বাবুয়ে ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আসন্ন সিরিজ তাই শুধু ফলের লড়াই নয়, বিশ্বকাপের দল গঠনের পরীক্ষাও।
স্টিভেন স্মিথের জায়গায় কে আসবেন, ম্যাক্সওয়েলের অলরাউন্ড সামর্থ্য কীভাবে পূরণ করা হবে, ছয় ও সাত নম্বরে কে শেষের ঝড় তুলবেন, গ্রিনকে কোথায় ব্যবহার করা হবে, আর স্টার্ক-কামিন্স-হ্যাজলউডের বিকল্প হিসেবে কারা প্রস্তুত, এসব প্রশ্নের উত্তর আগামী কয়েক মাসেই খুঁজে নিতে হবে অস্ট্রেলিয়াকে।
২০২৩ সালে ভারতকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিল অস্ট্রেলিয়া। এবার লক্ষ্য সেই শিরোপা ধরে রাখা। কিন্তু বর্তমান পরিসংখ্যান বলছে, পথটা সহজ হবে না। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে হলে আগামী এক বছরেই দলটির মাঝের সারি, অলরাউন্ড ভারসাম্য ও পেস আক্রমণের কাঠামো নতুন করে সাজাতে হবে।




