পাকিস্তানের বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবার সিরিজ জয়ের পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে হোয়াইটওয়াশ করার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামছে। অন্যদিকে প্রথম টেস্টে ৯০ রানে হারের পর সিরিজে সমতা ফেরাতে মরিয়া পাকিস্তান। দুই দলের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টটি অনুষ্ঠিত হবে ত্রিনিদাদের ঐতিহ্যবাহী কুইন্স পার্ক ওভালে। ম্যাচ শুরু হবে বাংলাদেশ সময় রাত আটটায়।
সিরিজের প্রথম টেস্টে দুই দলের ব্যাটিং শক্তির মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য দেখা যায়নি। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের তুলনামূলক শক্তিশালী পেস আক্রমণই দুই দলের পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। দ্বিতীয় টেস্টেও স্বাগতিকদের সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি হতে পারে তাদের বোলিং শক্তি।
প্রথম টেস্টে ৯০ রানের জয় ওয়েস্ট ইন্ডিজকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজ জয়ের পর পাকিস্তানের বিপক্ষেও দারুণ শুরু পেয়েছে তারা। সাম্প্রতিক সময়ে টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের অবস্থানও শক্ত করেছে ক্যারিবীয়রা।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের পেস আক্রমণে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের ভালো সমন্বয় রয়েছে। পাশাপাশি স্পিন বিভাগেও রয়েছে কার্যকর কিছু বিকল্প। ব্যাটিং অবশ্য এখনো তাদের দুর্বল জায়গা। তবে পাকিস্তানের পেস আক্রমণে ধারাবাহিকতার ঘাটতি থাকায় বল হাতে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার সামর্থ্য রয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের।
প্রথম টেস্টে পাকিস্তান একসময় ভালো অবস্থানে ছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসের চেয়ে মাত্র ৬৭ রানে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় তাদের হাতে ছিল সাত উইকেট। সেখান থেকে বড় লিড নেওয়ার সুযোগ ছিল পাকিস্তানের। কিন্তু পরের ১৬ উইকেট হারিয়ে মাত্র ১০৯ রান যোগ করে তারা। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় সফরকারীরা।
চাপের মুখে পাকিস্তানের ভেঙে পড়ার প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে তাদের বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে নিচের সারির ব্যাটিং এবং তৃতীয় ও চতুর্থ ইনিংসে দলের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গত তিন বছর দেশের বাইরে টেস্ট জয়ের স্বাদও পায়নি পাকিস্তান।
তবে কাগজে-কলমে দুই দলের শক্তির ব্যবধান খুব বেশি নয়। অধিনায়ক শান মাসুদের চোট পাকিস্তানের জন্য বড় ধাক্কা হলেও দলের প্রথম সাত ব্যাটারের মধ্যে একজন ছাড়া বাকিদের গড় ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংশ্লিষ্ট ব্যাটারদের চেয়ে ভালো। বাবর আজমও ফর্মহীনতার মধ্যেও এমন একজন ব্যাটার, যার অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্য ক্যারিবীয় ব্যাটিং লাইনআপে খুব কমই দেখা যায়।
তবে প্রথম টেস্টে পাকিস্তানের মূল শক্তি ছিল বোলিং। গতি কম হলেও মোহাম্মদ আব্বাস দুর্দান্ত কার্যকারিতা দেখিয়েছেন এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটিংয়ে চাপ তৈরি করেছেন। মোহাম্মদ আলী ও খুররম শাহজাদও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ভালো বোলিং করেছেন।
দ্বিতীয় টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওপেনার তেগনারাইন চন্দরপলও আলোচনায় রয়েছেন। প্রথম টেস্টে ২১ ও ৩৫ রানের ইনিংস খেললেও তাঁর ব্যাটিংয়ের গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। কঠিন পরিস্থিতিতে উইকেট ধরে রেখে ১৭৮ বল মোকাবিলা করেছেন তিনি। পাকিস্তানের বোলারদের দীর্ঘ সময় ব্যস্ত রেখে দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ৫৬ রান যোগ করেন চন্দরপল।
অন্যদিকে পাকিস্তানের হয়ে সুযোগ পাচ্ছেন আবদুল্লাহ শফিক। শান মাসুদ আঙুলের চোটে দ্বিতীয় টেস্ট থেকে ছিটকে যাওয়ায় তাঁর জায়গায় দলে এসেছেন শফিক। গত প্রায় তিন বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফর্মের সঙ্গে লড়াই করছেন এই ব্যাটার। তবে অতীতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ হাফ সেঞ্চুরি করে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন তিনি।
দ্বিতীয় টেস্টে পাকিস্তানের একাদশেও কিছু পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। দলে যোগ হওয়া সৌদ শাকিলের কারণে আমের জামালের ব্যাটিং পজিশন পরিবর্তন হতে পারে। একই সঙ্গে দ্রুতগতির পেসার উবায়েদ শাহকে টেস্ট অভিষেক করানোর চিন্তাও করতে পারে পাকিস্তান। প্রথম টেস্টে আলি উসমানের তেমন প্রভাব না থাকায় তাঁর জায়গায় সাজিদ খানকে ফেরানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ অবশ্য প্রথম টেস্টে জয়ী একাদশে বড় কোনো পরিবর্তন না করার দিকেই এগোতে পারে। ব্যাটিংয়ে আরও ভালো পারফরম্যান্সের প্রত্যাশা থাকলেও দলের সামগ্রিক ভারসাম্য নিয়ে সন্তুষ্ট স্বাগতিকরা।
দ্বিতীয় টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সম্ভাব্য একাদশে রয়েছেন—তেগনারাইন চন্দরপল, ব্র্যান্ডন কিং, কেভেম হজ, শাই হোপ, আমির জাঙ্গু, জাস্টিন গ্রিভস, রস্টন চেজ, জোমেল ওয়ারিক্যান, শামার জোসেফ, কেমার রোচ ও জেডেন সিলস।
পাকিস্তানের সম্ভাব্য একাদশে থাকতে পারেন—আজান আওয়াইস, ইমাম-উল-হক, আবদুল্লাহ শফিক, বাবর আজম, সৌদ শাকিল, মোহাম্মদ রিজওয়ান, সালমান আগা, আমের জামাল, সাজিদ খান, মোহাম্মদ আলী/খুররম শাহজাদ/উবায়েদ শাহ এবং মোহাম্মদ আব্বাস।
কুইন্স পার্ক ওভালের উইকেটে প্রথম টেস্টের ভেন্যু ব্রায়ান লারা ক্রিকেট একাডেমির তুলনায় স্পিনাররা বেশি সুবিধা পেতে পারেন। যদিও ওয়েস্ট ইন্ডিজে এখন বর্ষাকাল চলছে, দ্বিতীয় টেস্টের সময় আবহাওয়া তুলনামূলক শুষ্ক থাকার পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে বৃষ্টির কারণে ম্যাচে বড় ধরনের বিঘ্নের সম্ভাবনা কম।
এই ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে রয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটানোর সুযোগ। ২০০০ সালের পর প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জয়ের হাতছানি তাদের সামনে। একই সঙ্গে পাকিস্তানকে হারাতে পারলে টানা দুই টেস্ট সিরিজ জয়ের কৃতিত্বও অর্জন করবে ক্যারিবীয় দল।
অন্যদিকে পাকিস্তানের লক্ষ্য একটাই—হার এড়ানো এবং সিরিজ সমতায় শেষ করা। তবে প্রথম টেস্টের আত্মবিশ্বাসী ওয়েস্ট ইন্ডিজকে তাদের ঘরের মাঠে হারাতে হলে বাবর আজমদের ব্যাটিংয়ে দায়িত্বশীলতা এবং বোলিংয়ে বৈচিত্র্য—দুই ক্ষেত্রেই উন্নতি করতে হবে।
সব মিলিয়ে দ্বিতীয় টেস্টে মানসিকভাবে এগিয়ে থেকেই মাঠে নামবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। প্রথম ম্যাচে পাওয়া আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে পারলে সিরিজ ২-০ ব্যবধানে জিতে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করার ভালো সুযোগ রয়েছে স্বাগতিকদের সামনে। অন্যদিকে পাকিস্তানের জন্য এটি শুধু সিরিজ বাঁচানোর ম্যাচ নয়, বরং সাম্প্রতিক টেস্ট ব্যর্থতার ধারা থেকে বেরিয়ে আসারও বড় পরীক্ষা।


