ম্যাচ শেষ হওয়ার পরপরই বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মনে একটাই প্রশ্ন, দলের সেরা ফর্মে থাকা পেনাল্টি স্পেশালিস্ট ভিনিসিয়ুস জুনিয়র নিজে শট না নিয়ে কেন ব্রুনো গুইমারেসকে বল ছেড়ে দিলেন? ভিনিসিয়ুস কি চাপের মুখে দায়িত্ব ছেড়ে পালালেন?
ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে এসে এই প্রশ্নের উত্তর দেন ব্রাজিলের প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তির ছেলে তথা দলের সহকারী কোচ ডেভিড আনচেলত্তি। সব সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন:
“এখানে ভুল বোঝাবুঝির কোনো সুযোগ নেই। ম্যাচের আগেই আমাদের রণকৌশল সাজানো হয়েছিল এবং এটি নির্ধারিত ছিল যে পেনাল্টি পেলে ব্রুনো গুইমারেসই প্রথম শটটি নেবেন। ভিনিসিয়ুস কেবল দলের সিদ্ধান্ত ও শৃঙ্খলা মেনে চলেছেন। ফুটবলে পেনাল্টি মিস হওয়া একটি সাধারণ ঘটনা। আজ আমাদের ভাগ্য খারাপ ছিল, তাই মিস হয়েছে।”
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, ভিনিসিয়ুস দায়িত্ব এড়াননি, বরং একজন সুশৃঙ্খল ‘টিম প্লেয়ার’ হিসেবে কোচের পূর্বপরিকল্পনাকে সম্মান জানিয়েছেন। নিজের ব্যক্তিগত রেকর্ডের চেয়ে দলের সিদ্ধান্তকে বড় করে দেখিয়েছেন তিনি।
মাঠে যা ঘটেছিল: ভিএআর নাটক ও পেনাল্টি মিস
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলই আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে লড়ছিল। প্রথমার্ধের ১৪তম মিনিটে ব্রাজিলের ম্যাথিউস কুনিয়া বল নিয়ে নরওয়ের ডি-বক্সে ঢুকে পড়লে তাঁকে লক্ষ্য করে একটি স্লাইডিং ট্যাকল করেন নরওয়ের ডিফেন্ডার। প্রথমে রেফারি ফাউলের বাঁশি না বাজালেও, ব্রাজিলের ফুটবলারদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR)-এর সাহায্য নেন। রিপ্লে দেখে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন রেফারি।
বল হাতে ভিনিসিয়ুস যখন স্পটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন নিউক্যাসল ইউনাইটেডের মিডফিল্ডার ব্রুনো গুইমারেস তাঁর কাছে আসেন। ভিনিসিয়ুস বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বলটি তাঁর হাতে তুলে দিয়ে বক্সের বাম পাশে গিয়ে দাঁড়ান। গুইমারেস তাঁর চেনা ভঙ্গিতে ‘স্টাটার-স্টেপ’ (থেমে থেমে দৌড়ানো) নিয়ে শট নিলেও নরওয়ের গোলরক্ষক ওরজান নিল্যান্ড ভুল করেননি। তিনি বাম দিকে চমৎকার ডাইভ দিয়ে বলটি রুখে দেন।
টাইব্রেকার বাদে বিশ্বকাপের মূল সময়ে ব্রাজিলের পেনাল্টি মিস করার ঘটনা ১৯৮৬ সালের পর এই প্রথম। এই একটি মিস পুরো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেয়। এরপর একের পর এক আক্রমণ করেও নরওয়ের রক্ষণভাগ ভাঙতে পারছিল না সেলেসাওরা।
নেইমারের রেকর্ড ও অধরা ‘হেক্সা’ মিশন
ম্যাচের ৬৮তম মিনিটে দলের আক্রমণভাগ শক্তিশালী করতে চোট কাটিয়ে ফেরা অভিজ্ঞ তারকা নেইমারকে মাঠে নামান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে (স্টপেজ টাইম) ব্রাজিল আরেকটি পেনাল্টি পেলে এবার আর কোনো ভুল হয়নি। নেইমার ঠান্ডা মাথায় বল জালে জড়ান।
এই গোলের মাধ্যমে ব্রাজিলের মহানায়ক পেলের পর দ্বিতীয় ব্রাজিলীয় হিসেবে চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য কীর্তি গড়েন নেইমার। কিন্তু তাঁর এই ঐতিহাসিক রেকর্ডও ব্রাজিলের বিদায়ের বিষাদকে কমাতে পারেনি। ১৯৯০ বিশ্বকাপে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার কাছে শেষ ষোলোতে হেরে বিদায় নেওয়ার পর, এই প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেল ব্রাজিল।
১৯৯৪ সালে যখন শেষবার যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল, সেবার ট্রফি জিতেছিল ব্রাজিল। ২০০২ সালে তারা ঘরে তোলে পঞ্চম বিশ্বকাপ। এরপর থেকে দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে ষষ্ঠ শিরোপা বা ‘হেক্সা’ জয়ের মিশন ব্রাজিলের জন্য কেবলই এক দূর আকাশের তারা হয়ে রইল। কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে আরও চার বছরের জন্য দ্বিতীয় guessing (অনুশোচনা) আর আফসোসের সাগরে ডুবল সাম্বার দেশ।


