গোলের পর গোল, পাল্টা আক্রমণ, নাটকীয়তা আর রোমাঞ্চ। ম্যানচেস্টার সিটি ও সান্ডারল্যান্ডের ম্যাচটি যেন ছিল নব্বই মিনিটের এক রোলারকোস্টার। শেষ পর্যন্ত সান্ডারল্যান্ডকে ৫-৩ গোলে হারিয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের শীর্ষস্থান নিজেদের দখলে নিয়েছে ম্যানচেস্টার সিটি। আট গোলের এই ম্যাচে দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবলের নমুনা দেখালেও শেষ হাসি হেসেছে স্বাগতিকরাই।
এদিনের জয়ের মধ্য দিয়ে চলতি মৌসুমে লিগে নিজেদের শতভাগ জয়ের রেকর্ড ধরে রেখেছে ম্যানচেস্টার সিটি। পাঁচ ম্যাচে পাঁচ জয় নিয়ে তারা আন্তর্জাতিক বিরতিতে গেল। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্সেনালের চেয়ে তিন পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছে সিটি।
ফার্নান্দেজের গোলে শুরু
ম্যাচের শুরু থেকেই বল দখলে রেখে আক্রমণে ওঠে ম্যানচেস্টার সিটি। মাত্র নবম মিনিটেই আসে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। বক্সের বাইরে থেকে পাওয়া ফ্রি-কিকে দারুণ এক বাঁকানো শটে সান্ডারল্যান্ডের গোলরক্ষক রবিন রুফসকে পরাস্ত করেন এনজো ফার্নান্দেজ।
চেলসি থেকে ট্রান্সফার ডেডলাইনের দিনে বিপুল অর্থে ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেওয়া ফার্নান্দেজের জন্য গোলটি ছিল বিশেষ। ক্লাবটির হয়ে এটিই ছিল তার প্রথম গোল। গোলের পর সিটি সমর্থকদের উচ্ছ্বাস অবশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। মাত্র তিন মিনিট পরই ম্যাচে সমতা ফেরায় সান্ডারল্যান্ড।
ব্রোবির পাল্টা জবাব
১২ মিনিটে এনজো লে ফির পাস থেকে বল পেয়ে ঠান্ডা মাথায় গোল করেন ব্রায়ান ব্রোবি। সিটির গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মাকে পরাস্ত করে বল জালে পাঠান তিনি।
সমতায় ফেরার পর সান্ডারল্যান্ডের আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে। তবে সিটির আক্রমণও থামেনি। ২৯ মিনিটে আবার এগিয়ে যায় স্বাগতিকরা। সান্ডারল্যান্ডের রক্ষণভাগ বিপদমুক্ত করতে ব্যর্থ হলে সুযোগ কাজে লাগান রায়ান শেরকি। কাছ থেকে বল জালে পাঠিয়ে সিটিকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন ফরাসি ফরোয়ার্ড।
আবারও সমতা
এক গোল পিছিয়ে পড়েও সান্ডারল্যান্ড দমে যায়নি। ৩৩ মিনিটে আবারও সিটির রক্ষণভাগের দুর্বলতা কাজে লাগান ব্রোবি। এনজো লে ফে ও থমাস মুনিয়েরের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বল পান এই ডাচ ফরোয়ার্ড। কাছ থেকে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনি। গোলটির বৈধতা নিয়ে অবশ্য কিছুক্ষণ অনিশ্চয়তা ছিল। অফসাইডের সম্ভাবনা যাচাই করতে প্রায় তিন মিনিট ধরে ভিএআর পর্যালোচনা চলে। শেষ পর্যন্ত গোলটি বৈধ ঘোষণা করা হয়।
বিরতির আগে সিটির স্বস্তি
প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগে আবারও এগিয়ে যায় ম্যানচেস্টার সিটি। ৪৩ মিনিটে অঁতোয়ান সেমেনিওর গোলে স্কোরলাইন হয় ৩-২। রায়ান শেরকির পাস ক্লিয়ার করতে গিয়ে সিটির ডিফেন্ডার মার্ক গুয়েহি ভারসাম্য হারান। বলটি সেমেনিওর সামনে চলে গেলে ঘানার এই ফরোয়ার্ড কাছ থেকে শক্তিশালী শটে বল জালে পাঠান। ফলে পাঁচ গোলের এক উত্তেজনাপূর্ণ প্রথমার্ধ শেষে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে থাকে ম্যানচেস্টার সিটি।
দ্বিতীয়ার্ধেও গোলের বন্যা
বিরতির পরও ম্যাচের গতি কমেনি। ৫২ মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোল করে সিটির ব্যবধান বাড়ান সেমেনিও। রায়ান শেরকির কাছ থেকে পাওয়া পাস নিয়ন্ত্রণ করে ঠান্ডা মাথায় সান্ডারল্যান্ডের জালে বল পাঠান তিনি। তখন মনে হচ্ছিল, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিয়ে নিয়েছে ম্যানচেস্টার সিটি। কিন্তু সান্ডারল্যান্ডের ব্রোবি তখনও থামেননি।
ব্রোবির হ্যাটট্রিক, আবার জমে উঠল ম্যাচ
সিটির দ্বিতীয় গোলের মাত্র দুই মিনিট পরই ম্যাচে নতুন করে উত্তেজনা ফিরিয়ে আনেন ব্রোবি। ৫৪ মিনিটে নিলসন আঙ্গুলোর পাস থেকে তৈরি হওয়া সুযোগে বল জালে পাঠিয়ে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন তিনি।
সিটির রক্ষণভাগ বল ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হলে ব্রোবি নিশ্চিত করেন যে বলটি কোনোভাবেই গোলের বাইরে না যায়। স্কোরলাইন তখন ৪-৩। অর্থাৎ ম্যাচের শেষ ৩৫ মিনিটে মাত্র এক গোলের ব্যবধান ছিল দুই দলের মধ্যে। সান্ডারল্যান্ড এরপর সমতা ফেরানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। অন্যদিকে সিটি চেষ্টা করে দ্রুত পঞ্চম গোল করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে।
রক্ষণে চাপ, শেষ পর্যন্ত হলান্ডের গোল
সান্ডারল্যান্ডের আক্রমণের চাপে একপর্যায়ে নিজেরাই বিপদ ডেকে আনে সিটি। রুবেন দিয়াসের একটি ভুলে বল প্রায় নিজেদের জালেই ঢুকে যাচ্ছিল। শেষ মুহূর্তে তিনি বলটি ক্লিয়ার করে বিপদ কাটান।
অবশেষে ৮১ মিনিটে ম্যানচেস্টার সিটির স্বস্তি ফেরে। দলের আক্রমণ থেকে পাওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে এরলিং হলান্ড দূরের পোস্টে বল পাঠিয়ে স্কোর ৫-৩ করেন। এটি চলতি মৌসুমে ছয় ম্যাচে হলান্ডের সপ্তম গোল। তার গোলের পর আর ম্যাচে ফিরে আসতে পারেনি সান্ডারল্যান্ড।
নিখুঁত শুরু মারেসকার
পেপ গার্দিওলা দীর্ঘ সময় ম্যানচেস্টার সিটির দায়িত্ব পালন করে ক্লাবটির হয়ে ২০টি ট্রফি জেতার পর গত মৌসুম শেষে দায়িত্ব ছাড়েন। তার জায়গায় দায়িত্ব নেওয়া এনজো মারেসকার অধীনে এখন পর্যন্ত স্বপ্নের মতো শুরু পেয়েছে সিটি।
চলতি মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এটি সিটির টানা সপ্তম জয়। শুধু প্রিমিয়ার লিগেই পাঁচ ম্যাচে পাঁচ জয় তাদের। পাঁচ ম্যাচে ১৩ গোল করেছে দলটি।
তবে আক্রমণভাগের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি রক্ষণ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত হওয়ার কারণও রয়েছে। সান্ডারল্যান্ডের বিপক্ষে তিন গোল হজম করা এবং বেশ কয়েকটি রক্ষণাত্মক ভুল দেখিয়েছে যে দলের এই জায়গায় এখনও উন্নতির সুযোগ রয়েছে।
সামনে কঠিন পরীক্ষা
আন্তর্জাতিক বিরতির পর ম্যানচেস্টার সিটির সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন সময়। প্রিমিয়ার লিগে ১১ অক্টোবর লিভারপুলের মাঠে খেলবে তারা। এর মাত্র কয়েক দিন পর ১৫ অক্টোবর চ্যাম্পিয়নস লিগে ঘরের মাঠে প্যারিস সাঁ-জার্মাঁর মুখোমুখি হবে সিটি।
তাই সান্ডারল্যান্ডের বিপক্ষে ৫-৩ জয় যেমন ম্যানচেস্টার সিটির আক্রমণাত্মক শক্তির প্রমাণ দিয়েছে, তেমনি ম্যাচটি তাদের রক্ষণভাগের কিছু দুর্বলতাও সামনে এনেছে। নিখুঁত জয়যাত্রা ধরে রেখে শীর্ষে থাকলেও আন্তর্জাতিক বিরতির পর বড় ম্যাচগুলোতে সেই রক্ষণ কতটা সামলাতে পারে, সেটিই হবে মারেসকার দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।




