২০২৬ সালের গণনা অনুযায়ী আর্জেন্টিনার জনসংখ্যা ৪ কোটি ৬০ লক্ষ। মেসির বিদায়ী ম্যাচে কি তাহলে আর্জেন্টিনার সবাই খেলা দেখবে স্টেডিয়ামে বসে? হয়তো ভাবছেন বিদায়ী ম্যাচের সাথে জনসংখ্যার কি সম্পর্ক? না ভাই সম্পর্ক কিছুটা তো আছেই তা না হলে মেসির বিদায়ী ম্যাচের মহাত্ব কোথায়? আর দেশটা যখন আর্জেন্টিনা তখন তো কিছু একটা রহস্য আছেই! আর যদি সেই রহস্য নাই থাকে তাহলে কি আর ‘মেসির বিদায়ী ম্যাচের টিকিট বাংলাদেশের ঈদ যাত্রার ট্রেন টিকিটে পরিনত হয়’!
আর্জেন্টিনায় ফুটবলের জনপ্রিয়তা কেমন? বা কত শতাংশ মানুষ ফুটবল দেখে বা খবর রাখে তার একটা জরিপ দেখা যাক-তবে “কত শতাংশ মানুষ ফুটবল ম্যাচ দেখে বা খবর রাখে”-এটার উত্তর জরিপ ভেদে কিছুটা আলাদা যেমন- ২০২৪ সালের TGM জরিপে ৫৯% আর্জেন্টাইন বলেছেন তারা ফুটবলে আগ্রহী। অন্যদিকে Kantar- এর এক জরিপে ৮৫% আর্জেন্টাইন নিজেদের কোনো না কোন ফুটবল দলের সমর্থক বলে দাবী করেছেন। অপরদিকে দেখা যাচ্ছে ২০২২ সালের YouGov জরিপে ৮০% প্রাপ্ত বয়স্ক আর্জেন্টাইন বলেছেন তারা বিশ্বকাপের অন্তত একটি ম্যাচ দেখার সম্ভাবনা রাখেন- ৬২% “খুব সম্ভব” এবং ১৮% “সম্ভব” বলেছেন। আবার ২০২৬ বিশ্বকাপের সময় Netquest-এর জরিপে দেখা যায় ৭০% আর্জেন্টাইন বিশ্বকাপকে নিয়ে উচ্চমাত্রার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।

তবে ৮০% বা ৭০% নয় এর মাঝামাঝি যদি বলি ৫৯% আর্জেন্টাইনের ফুটবল ম্যাচে আগ্রহ আছে তাহলে তো মেসির বিদায়ী ম্যাচ নিয়ে আগ্রহের মাত্রা আরো বেশী হবেই হবে তাই না? তারপরও ৫৯% ধরলেও আর্জেন্টিনার জনসংখ্যার ৫৯% হলো ২ কোটি ৭১ লক্ষ ৪০ হাজার যারা অন্তত মেসির বিদায় ম্যাচ মাঠে বসে দেখতেই চাইবেন! কিন্তু এত মানুষকে কি টিকিট দেওয়া সম্ভব? না সম্ভব নয়, কারণ যে স্টেডিয়ামের খেলা হবে তার নাম হলো বুয়েনস আয়ার্সের রিভার প্লেট ক্লাবের মাঠ ‘‘স্তাদিও মনুমেন্টাল’’ যার ধারণ ক্ষমতা ৮৫ হাজার। তাহলে এবার বুঝুন যে কোথায় ২ কোটি ৭১ লক্ষ ৪০ হাজার আর কোথায় ৮৫ হাজার এমন একটা ফুটবল পাগল জাতির সামনে মেসির বিদায়ী ম্যাচের টিকিট ২ ঘন্টায় শেষ হবে না তো কি হবে? ভাগ্য ভাল যে ম্যাচটা বাংলাদেশে হচ্ছে না তা না হলে তো বাংলাদেশ রেলওয়ের ঈদ টিকিটের মত ১ মিনিটেই শেষ হয়ে যেত! আর “টিকিট সিন্ডিকেটরা ওঁত পেতে থাকত।” তবে আর্জেন্টিনায় সেন্ডিকেটরা আবার যোগাযোগ করেছে কিনা তা বলতে পারবোনা।
৬ অক্টোবর বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার প্রীতি ম্যাচটির টিকিট বিক্রি শুরু হয় বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় অনলাইনে। রাত ৮টার আগেই সব টিকিট শেষ হয়ে যায়। বিপুলসংখ্যক সমর্থক একসঙ্গে টিকিটের জন্য চেষ্টা করায় বিক্রির প্ল্যাটফর্মে দীর্ঘ ভার্চুয়াল সারিও তৈরি হয়।

টিকিট বিক্রির হিসাব বাদ দিয়ে এবার চলুন মেসির বিদায়ী ম্যাচের কল্পনার রাজ্য থেকে ঘুরে আসি। ধরুন আপনি ফুটবলের পাঁড় ভক্ত তারপর আবার মেসির ভক্ত তাহলে মেসির বিদায়ী ম্যাচ ঘিরে আপনার প্রস্তুতি কেমন হবে? নিশ্চয়ই আর্জেন্টিনার যে কোন বড় উৎসবের চাইতেও অনেক বেশী! কি ভুল বললাম? আমার মনে হয় না, কারণ আপনি মেসিকে ইতি মধ্যেই সর্বকালের সেরা ফুটবলারের কাতারে স্থান দিয়েছেন তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম তা নয় তাহলে মেসির স্থান কোথায়? নিশ্চয়ই ম্যারাডোনা ও পেলের কাতারে? এর নিচে নিশ্চয়ই নয় তাহলে বর্তমান পৃথিবীর এমন একজন চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়ের বিদায়ী ম্যাচ আপনি স্টেডিয়ামে বসে দেখতেই চাইবেন তাই না?
পেলে-ম্যারাডোনাকে নিয়ে একজন ফুটবল ভক্তের আবেগ কেমন হতে পারে তার সময়ের খেলা দেখা বা তাদের বিদায় নিয়ে না দেখা নিয়ে হয়তো আক্ষেপ হতেই পার সেই বিবেচনায় একজন ফুটবল ভক্ত মেসির বিদায়ী ম্যাচে তা আর মিস করতে চাইবেন না এটাই স্বাভাবিক। স্টেডিয়ামে না হোক অন্তত টিভির পর্দায়, অথবা জায়ান্ট স্ক্রিনের সামনে বসে রাস্তার মোড়ে মোড়ে খেলা দেখা আর পিকনিক মুডে বিরানী খাওয়ার উৎসবটা সিদিন কি কেউ মিস করতে চাইবেন? না এই বিদায়ী ফুটবল আবেগের মহারণ কেউই মিস করতে চাইবেনা। সেদিন আর্জেন্টিনায় কি হবে? আমাদের দেশে মেসি পাগলদের উন্মাদনা কেমন হবে? ৬ অক্টোবর বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার উৎসবের রাত্রি অথবা রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সের উৎসবের পাগলামিটা কেমন হবে! নিশ্চয়ই আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের চাইতেই কোন অংশে কম নয়!

বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জার্সিতে ৩৯ বছর বয়সী মেসির প্রায় ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৮ তম ম্যাচের মনুমেন্টালের আকাশের অবস্থা কেমন হবে। বিশ্বকাপ জেতা, দুইবার বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলা, দুই কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা জয়, অলিম্পিকের সোনার পদকসহ যুববিশ্বকাপের শিরোর জয়ের সব হিসেব কি সেদিন চুকে যাবে মেসির বিদায়ী ম্যাচে? নাকি আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠবে বিদায়ের করুন সুরে, নাকি শুধুই চোখের জলে নিরব মনুমেন্টালকে স্তব্ধ করে মেসি হাত নাড়তে নাড়তে হারিয়ে যাবেন ড্রেসিং রুমের অন্দর মহলে! এমন হাজারো প্রশ্ন আর কল্পনায় মেসি স্মৃতি কি কাতর করে তুলছেনা আর্জেন্টিনা বাসি আর বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মেসি ভক্ত সকল সমর্থকদের? জানি প্রিয় তারকার বিদায় কতটা করুণ হয়, কতটা বিদনাবিধুর হয়! তারপরও তো বিদায় দিতেই হবে কারণ এটাই পৃথিবীর রীতি যার শুরু আছে তার শেষ ও আছে তাই মেসির এই বিদায়ের সুরটা হবে বিশ্বজয়ের, এমন বিদায়ী অনুষ্ঠান তো করুণ হবেই কারণ যার অর্জন যত বেশী তার বিদায়ের বেদনা তত বেশী।
মেসির বিদায়ী ম্যাচ উপলক্ষে বিশেষ আয়োজনে থাকছে তার দীর্ঘদিনের স্পনসর অ্যাডিডাস। তারা ইতোমধ্যে বিশেষ সংস্করণের জার্সি প্রকাশ করেছে, যেখানে মেসির নাম ও নম্বরে সোনালি রঙের নকশা রাখা হয়েছে। তবে জাতীয় দলকে বিদায় জানালেও ক্লাব ফুটবলে খেলা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে মেসির। ফলে ৬ অক্টোবরের রাতটি হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়। মেসিরি বিদায়ী ম্যাচের সকল দর্শকদের জন্য “খেলা লাইভের’’ পক্ষ থেকে প্রাণ ঢালা অভিনন্দন।




