হারারেতে অনুষ্ঠিত সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডে ম্যাচে জিম্বাবুয়েকে ৭ উইকেটে হারিয়ে সান্ত্বনার জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচে ১৪১ রান ডিফেন্ড করে এবং দ্বিতীয় ম্যাচে ২৪৭ রান তাড়া করে জিতে আগেই সিরিজ নিশ্চিত করেছিল জিম্বাবুয়ে। তবে শেষ ম্যাচে ১৯৯ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে তানজিদ হাসান ও সৌম্য সরকারের ১৫১ রানের অনবদ্য জুটিতে ৮৪ বল (১৪ ওভার) বাকি থাকতেই সহজ জয় তুলে নেয় টাইগাররা।
ধীরগতির শুরু ও জিম্বাবুয়ের বিপর্যয়

টস হেরে প্রথমে ব্যাটিং করতে নেমে শুরুতেই বাংলাদেশি পেসারদের তোপের মুখে পড়ে জিম্বাবুয়ে। পিচে বল কিছুটা আটকে আসায় শুরুটা ছিল বেশ সতর্ক। তাসকিন আহমেদ প্রথম ৩ ওভারে মাত্র ৬ রান দিয়ে দারুণ চাপ সৃষ্টি করেন। অন্য প্রান্তে শরিফুল ইসলাম প্রথম আঘাত হানেন। বেন কারান (০) ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগের দিকে বল গাইড করতে গিয়ে প্লেড-অন হন।
পরের ওভারেই তাসকিনের একটি চমৎকার আউটসুইঙ্গারে উইকেটরক্ষকের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন ব্রায়ান বেনেট। এরপর টানা ১৭ বল কোনো রান করতে পারেনি স্বাগতিকরা। পাওয়ারপ্লে শেষে তাদের সংগ্রহ দাঁড়ায় মাত্র ২১/২।
দলীয় অধিনায়ক ক্রেইগ আরভিন ২০ বলে মাত্র ৫ রান করে শরিফুলের বলে ড্রাইভ খেলতে গিয়ে ক্যাচ আউট হন। এরপর মাঠে আসেন ওয়েসলি মাধেভেরে। শুরুতে তানভীর ইসলামের বলে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ০ রানে জীবন পান তিনি, যা বাংলাদেশের জন্য বেশ মন্থর ও ব্যয়বহুল প্রমাণিত হয়। মাধেভেরে ও ইনোসেন্ট কাইয়া মিলে ৫১ রানের জুটি গড়ে প্রাথমিক বিপর্যয় সামাল দেন। ২৫ ওভার শেষে জিম্বাবুয়ের রান ছিল ৭২/৩।
মাধেভেরে-ইভান্সের প্রতিরোধ ও বাংলাদেশের ভুল

তাসকিন আহমেদ গতি ও শর্ট বলের সাহায্যে কাইয়াকে (যিনি পুল করতে গিয়ে স্কয়ার লেগে ক্যাচ দেন) ফিরিয়ে এই জুটি ভাঙেন। ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক সিকান্দার রাজাও তানভীরের বলে পুল শট খেলতে গিয়ে টপ-এজ হয়ে শর্ট ফাইন লেগে ক্যাচ দেন। ৫ বল পর ক্লাইভ মাদান্দেও ক্যাচ আউট হলে ১০৮ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে চরম সংকটে পড়ে জিম্বাবুয়ে।
সেখান থেকে দলের হাল ধরেন আগের ম্যাচের নায়ক ব্র্যাড ইভান্স (যিনি দ্বিতীয় ম্যাচে ৫৮ রান করেছিলেন)। ইভান্স শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক খেলেন। শরিফুলকে কাভার ড্রাইভে চার মেরে ইনিংস শুরু করার পর তানভীরের বলে কট-বিহাইন্ডের জোরালো আপিল থেকে বেঁচে যান। এরপর মাধেভেরে নিজের অর্ধশতক পূরণ করেন এবং ইভান্সকে সাথে নিয়ে রান তুলতে থাকেন। ১৩ রানের মাথায় মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন নিজের ফলোথ্রুতে ইভান্সের একটি সহজ ক্যাচ মিস করেন।
সেঞ্চুরির পথে থাকা মাধেভেরেকে (৭৫ রান) ফিরিয়ে এই বিপজ্জনক জুটি ভাঙেন তানভীর ইসলাম। কম গতির বলে বিভ্রান্ত হয়ে মাধেভেরে কাভারে মিরাজের হাতে ক্যাচ দেন। এরপর মাসাকাদজা রানআউট হন তৌহিদ হৃদয়ের সরাসরি থ্রোতে। শেষ পর্যন্ত ইভান্স তাসকিনকে চার ও ছক্কা মেরে নিজের ওয়ানডে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় অর্ধশতক তুলে নেন। তবে শরিফুলের শর্ট বলে আউট হওয়ার আগে তিনি ৫০ রান করেন। জিম্বাবুয়ে ১১ বল বাকি থাকতেই ১৯৯ রানে অলআউট হয়।
বাংলাদেশের পক্ষে শরিফুল ইসলাম ৪৪ রানে ৪টি এবং তাসকিন আহমেদ ও তানভীর ইসলাম ২টি করে উইকেট নেন। দীর্ঘ বিরতির পর দলে ফেরা মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন ৩১ রানে ১টি উইকেট নেন।
তানজিদ-সৌম্যর বিধ্বংসী ওপেনিং জুটি
২০০ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিং করতে নেমে বাংলাদেশ যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন উইকেটে খেলছিল। তানজিদ হাসান তামিম এবং সৌম্য সরকার শুরু থেকেই জিম্বাবুয়ের বোলারদের ওপর চড়াও হন। বিশেষ করে নিজের দ্বিতীয় ওয়ানডে খেলতে নামা আর্নেস্ট মাসুকু প্রথম ৩ ওভারে ২৬ রান দিয়ে বসেন।
পুরো ইনিংসে জিম্বাবুয়ের ফিল্ডাররা চরম ফিল্ডিং বিপর্যয়ের পরিচয় দেন। তানজিদ হাসান একাই তিনবার জীবন পান। প্রথমে ২৩ রানের মাথায় ইভান্সের বলে মাসাকাদজা তার সহজ ক্যাচ মিস করেন। এরপর ৩৭ রানে চনাকার বলে এবং ৬৫ রানে সিকান্দার রাজার বলে ডিপ ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগে ইনোসেন্ট কাইয়া তার ক্যাচ ফেলে দেন।
পাওয়ারপ্লেতে বাংলাদেশ কোনো উইকেট না হারিয়ে ৫৯ রান তোলে। তানজিদ মাত্র ৪৯ বলে নিজের অর্ধশতক পূরণ করেন, যা ২০২৬ সালে তার ১২টি ওয়ানডে ইনিংসে ষষ্ঠ পঞ্চাশোর্ধ্ব রান। অন্য প্রান্তে কিছুটা ধীরগতির হলেও সৌম্য সরকার রাজাকে ছক্কা ও চার মেরে দলের রান ১০০ পার করেন। অবশেষে দলীয় ১৫১ রানের মাথায় চনাকার একটি নিচু হওয়া বলে বোল্ড হয়ে ফেরেন সৌম্য সরকার (৬৯ রান)।
সেঞ্চুরির আক্ষেপ ও জয় নিশ্চিত
সৌম্যর বিদায়ের পর বাংলাদেশের জয় যখন সময়ের ব্যাপার, তখন সবার নজর ছিল তানজিদের সেঞ্চুরির দিকে। নাজমুল হোসেন শান্ত মাঠে এসে চিভাঙ্গার এক ওভারে ৩টি চার মেরে ব্যবধান কমিয়ে আনেন। তানজিদও মাধেভেরের বলে ১০ রান নিয়ে দ্রুত ৮০ এবং পরে ৯০-এর ঘরে পৌঁছান।
বাংলাদেশের জয়ের জন্য যখন মাত্র ৩ রান প্রয়োজন, তখন তানজিদ ৯৪ রানে ব্যাটিং করছিলেন। সেঞ্চুরি করার উদ্দেশ্যে তিনি সিঙ্গেলস নেওয়া বন্ধ করে বড় শট খেলার চেষ্টা করেন। শান্তও তাকে স্ট্রাইক দেওয়ার জন্য অন্য প্রান্তে একটি মেডেন ওভার খেলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেঞ্চুরির জন্য বড় শট খেলতে গিয়ে লং-অনে ব্র্যাড ইভান্সের হাতে ক্যাচ দিয়ে বসেন তানজিদ। ১১২ বলে খেলা তার ৯৪ রানের চমৎকার ইনিংসে ছিল দারুণ সব শটের মার।
তানজিদ সেঞ্চুরি না পেলেও শান্ত বাকি কাজ সহজেই শেষ করেন এবং বাংলাদেশ ৭ উইকেটের বড় ব্যবধানে ম্যাচটি জিতে মাঠ ছাড়ে। জিম্বাবুয়ের পক্ষে চনাকা, ইভান্স ও মাসুকু ১টি করে উইকেট নেন।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
- জিম্বাবুয়ে: ১৯৯/১০ (৪৮.১ ওভার; মাধেভেরে ৭৫, ইভান্স ৫০; শরিফুল ৪-৪৪, তাসকিন ২-৩২, তানভীর ২-৩৬)
- বাংলাদেশ: ২০০/৩ (৩৬ ওভার; তানজিদ ৯৪, সৌম্য ৬৯, শান্ত ১৪*; মাসুকু ২-৩৩, চনাকা ১-১৪)
- ফল: বাংলাদেশ ৭ উইকেটে জয়ী।


