জাতীয় স্কুল হ্যান্ডবলে দুর্বাচারার মেয়েদের টানা দ্বিতীয় শিরোপা

জাতীয় পর্যায়ের হ্যান্ডবলে আবারও শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরল কুষ্টিয়ার দুর্বাচারা বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মেয়েরা। ৫৩তম জাতীয় গ্রীষ্মকালীন স্কুল, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা ক্রীড়া প্রতিযোগিতার বালিকা হ্যান্ডবলে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে বিদ্যালয়টি। লিগভিত্তিক প্রতিযোগিতায় তিন ম্যাচের প্রতিটিতেই বড় ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে দুর্বাচারার অদম্য মেয়েরা।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) কুমিল্লার ইস্পাহানী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ মাঠে নিজেদের শেষ ম্যাচে ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগ নিয়ে গঠিত পদ্ম অঞ্চলকে ৩২-৩ গোলের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে গোলাপ অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করা দুর্বাচারা বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়। পদ্ম অঞ্চলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার মানকোন উচ্চ বিদ্যালয়।

দুর্বাচারার হয়ে গোলবন্যার ম্যাচে সর্বোচ্চ আটটি করে গোল করেন তাহসিনা আক্তার ও ফারজানা আক্তার নিধী। তাঁদের দুর্দান্ত নৈপুণ্যে প্রতিপক্ষকে দাঁড়াতেই দেয়নি দলটি। এই জয়ের মধ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব আরও একবার প্রমাণ করে কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি।

এর আগে ৫২তম জাতীয় গ্রীষ্মকালীন প্রতিযোগিতায়ও অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল দুর্বাচারা বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এবারও একই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করে স্কুলটির মেয়েরা বুঝিয়ে দিয়েছে, জাতীয় স্কুল হ্যান্ডবলে তাদের আধিপত্য কেবল এক আসরের সাফল্য নয়; বরং ধারাবাহিক পরিশ্রম, পরিকল্পনা ও দলীয় সংহতির ফল।

প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিয়ে শিরোপা জয়

জাতীয় পর্যায়ে দুর্বাচারার মেয়েদের জয়যাত্রা শুরু হয় বকুল অঞ্চলকে ১৬-১ গোলে বিধ্বস্ত করার মধ্য দিয়ে। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচে চাঁপা অঞ্চলকে ২৭-১ গোলে উড়িয়ে দেয় দলটি। আর শেষ ম্যাচে পদ্ম অঞ্চলকে ৩২-৩ গোলে হারিয়ে তিন ম্যাচে পূর্ণ জয় নিয়ে চ্যাম্পিয়নশিপ নিশ্চিত করে তারা।

তিন ম্যাচে প্রতিপক্ষের জালে মোট ৭৫টি গোল করেছে দুর্বাচারা। বিপরীতে তাদের জালে বল ঢুকেছে মাত্র পাঁচবার। গোল ব্যবধান ও ধারাবাহিক পারফরম্যান্সেই স্পষ্ট, পুরো প্রতিযোগিতায় কতটা অপ্রতিরোধ্য ছিল দলটি।

বাংলাদেশ জাতীয় স্কুল, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা ক্রীড়া সমিতির আয়োজনে দেশকে চারটি অঞ্চলে ভাগ করে অনুষ্ঠিত হয় এই প্রতিযোগিতা। বকুল, চাঁপা, গোলাপ ও পদ্ম—এই চার অঞ্চলের মধ্যে লড়াইয়ে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের প্রতিনিধিত্বকারী গোলাপ অঞ্চলের হয়ে শিরোপা জেতে দুর্বাচারা।

উপজেলা থেকে জাতীয় মঞ্চে দুর্বাচারার জয়যাত্রা

জাতীয় পর্যায়ের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার গল্প। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার উজানগ্রাম ইউনিয়নের দুর্বাচারা বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রথমে উপজেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে কুষ্টিয়া জেলা চ্যাম্পিয়ন হয়।

এরপর খুলনায় অনুষ্ঠিত উপ-অঞ্চল পর্যায়ের ফাইনালে নড়াইল জেলাকে ২১-২ গোলে পরাজিত করে শিরোপা জেতে দলটি। সেই সাফল্যে খুলনা বিভাগের প্রতিনিধি হিসেবে বিভাগীয় পর্যায়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায় তারা।

বরিশালে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় পর্যায়ের ম্যাচে স্বাগতিক বরিশাল বিভাগকে ২০-২ গোলে হারিয়ে জাতীয় পর্যায়ের টিকিট নিশ্চিত করে দুর্বাচারা। প্রতিটি ধাপেই বড় ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে জাতীয় আসরে অংশ নেয় দলটি। সেখানেও নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখে শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।

সাফল্যের নেপথ্যে কোচ সাইদুল ইসলাম

দুর্বাচারার মেয়েদের এই ঐতিহাসিক সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন বিদ্যালয়ের ক্রীড়াশিক্ষক মো. সাইদুল ইসলাম (সাইদ)। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, নিয়মিত অনুশীলন ও খেলোয়াড়দের মধ্যে জয়ের মানসিকতা গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি দলটিকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছেন।

নিজের শিষ্যদের সাফল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি মেয়েদের মধ্যে চেষ্টা ও ভালো করার মানসিকতা দেখেছি। সেই থেকে চেষ্টা করে চলেছি। তার ফসল পেয়ে খুব ভালো লাগছে। ওরা যেন বাংলাদেশের হয়ে খেলে দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে, সেই আশা করি।’

দলের খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে উজ্জীবিত রাখা এবং প্রতিটি সফরে তাদের পাশে থাকার ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের শিক্ষক মৌসুমী সুলতানার অবদানও উল্লেখযোগ্য। মাঠের অনুশীলন থেকে শুরু করে প্রতিযোগিতার বিভিন্ন পর্যায়ে খেলোয়াড়দের মনোবল ধরে রাখতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

দুর্বাচারার মেয়েদের গৌরবময় অর্জন

চ্যাম্পিয়ন দলের হয়ে প্রতিযোগিতার প্রতিটি ম্যাচে নজরকাড়া পারফরম্যান্স প্রদর্শন করেন মোছা. জুঁই খাতুন, মোছা. সুরাইয়া খাতুন, ইশরাত জাহান রত্না, মোছা. মিম খাতুন, মোছা. তাহসিনা আক্তার, মোছা. মাইমুনা খাতুন, ফারজানা আক্তার নিধী, মোছা. লিজা খাতুন, বৈশাখী খাতুন, মোছা. করবী, রূদ্রানী দাস ও শাফিয়া খাতুন শান্তা।

তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, আক্রমণাত্মক খেলা ও দলীয় বোঝাপড়াই এনে দিয়েছে এই অনন্য সাফল্য। বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং দুর্বাচারা গ্রামের মানুষের মধ্যে এ অর্জন ঘিরে বইছে আনন্দের জোয়ার।

ক্রীড়াঙ্গনে নতুন প্রেরণা

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে আয়োজিত ৫৩তম জাতীয় গ্রীষ্মকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব গত ৬ অক্টোবর কুমিল্লার শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এ প্রতিযোগিতায় দেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। শুক্রবার প্রতিযোগিতার সব খেলা শেষ হয়েছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করবেন।

ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের বাধা পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে এসে চ্যাম্পিয়ন হওয়া দুর্বাচারা বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মেয়েদের এই সাফল্য তৃণমূল পর্যায়ে নারী ক্রীড়ার বিকাশে নতুন অনুপ্রেরণা জোগাবে। সীমিত পরিসর থেকে উঠে এসে ধারাবাহিক অনুশীলন, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের দিকনির্দেশনা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে যে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন সম্ভব, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে কুষ্টিয়ার এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

টানা দ্বিতীয়বারের মতো জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়ে দুর্বাচারার মেয়েরা শুধু নিজেদের বিদ্যালয় কিংবা গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করেনি; গর্বিত করেছে কুষ্টিয়া জেলা ও খুলনা বিভাগকেও। তাদের এই সাফল্যের ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতে জাতীয় দলের জার্সিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্নকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।

spot_imgspot_img
spot_img

Related Articles