স্বদেশী মুচোভাকে হারিয়ে প্রথম উইম্বলডন শিরোপা জিতলেন চেক খেলোয়াড় নোসকোভা

অল ইংল্যান্ড ক্লাবের ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় ও রোমাঞ্চকর ফাইনালে জয়ী হলেন লিন্ডা নোসকোভা। শনিবার সেন্টার কোর্টে ৫টি ম্যাচ পয়েন্ট হাতছাড়া করে কান্নায় ভেঙে পড়ার পরও, অবিশ্বাস্য মানসিক শক্তির পরিচয় দিয়ে ক্যারোলিনা মুচোভাকে হারিয়ে নিজের প্রথম উইম্বলডন শিরোপা জিতলেন এই চেক তারকা।

টুর্নামেন্টের ৯ম বাছাই ২১ বছর বয়সী নোসকোভা হলিউড ব্লকবাস্টার সিনেমার চেয়েও বেশি টুইস্টে ভরা এই ফাইনালে ১০ম বাছাই এবং স্বদেশী ক্যারোলিনা মুচোভাকে ৬-২, ৫-৭, ৬-৩ ব্যবধানে পরাজিত করে ক্যারিয়ারের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম মুকুট মাথায় তুললেন। ২ ঘণ্টা ২৮ মিনিটের এই অনবদ্য লড়াইয়ে জয়ী হয়ে নোসকোভা গত ১৫ বছরের মধ্যে উইম্বলডনের সর্বকনিষ্ঠ নারী চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করলেন।

ম্যাচের প্রথম সেটটি সহজেই ৬-২ ব্যবধানে জিতে নেন নোসকোভা। কিন্তু দ্বিতীয় সেটে যখন তিনি জয়ের জন্য সার্ভিস করছিলেন, তখনই শুরু হয় আসল নাটকীয়তা। একের পর এক ৪টি ম্যাচ পয়েন্ট হাতছাড়া করেন তিনি, যার সুযোগ নিয়ে ম্যাচে ব্রেক-ব্যাক করেন মুচোভা। গ্যালারির দর্শকদের স্তব্ধ প্রতিক্রিয়া এড়াতে নোসকোভাকে কানের ওপর আঙুল দিয়ে রাখতে দেখা যায়। এরপর আরও একটি (পঞ্চম) ম্যাচ পয়েন্ট নষ্ট করার পর মুচোভা স্কোর ৫-৫ করেন।

মানসিক চাপে ভেঙে পড়ে নোসকোভা কোর্টের বেঞ্চে মাথার ওপর তোয়ালে চেপে ধরেন এবং তাঁকে চোখের জল মুছতে দেখা যায়। মুচোভা দ্বিতীয় সেটটি ৭-৫ ব্যবধানে জিতে নিলে ম্যাচ সমতায় ফেরে। এরপর চূড়ান্ত সেটের আগে কোর্ট ছেড়ে বাইরে যান নোসকোভা, আর এই বিরতিই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেয়। চরম হতাশার অতল থেকে ফিরে এসে তৃতীয় সেটের শুরুতেই প্রতিপক্ষের সার্ভিস ব্রেক করেন তিনি এবং শেষ পর্যন্ত জয় নিশ্চিত করে অবিশ্বাস্য এক ঘোর নিয়ে কোর্টের ঘাসের ওপর লুটিয়ে পড়েন।

নোসকোভার এই গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয় তাঁর শৈশবের আদর্শ পেত্রা কেভিতোভার স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। ২০১১ সালে কেভিতোভা যখন তাঁর প্রথম উইম্বলডন জিতেছিলেন, তখন তাঁর বয়সও ছিল ২১ বছর। কাকতালীয়ভাবে, এদিন নোসকোভার এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে রয়্যাল বক্সে উপস্থিত ছিলেন কেভিতোভা নিজেই।

উইম্বলডনের ইতিহাসে ওপেন জুগে এটিই ছিল দুই চেক নারীর মধ্যে প্রথম ফাইনাল। এই জয়ের মাধ্যমে গত চার বছরের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো কোনো চেক নারী উইম্বলডন জিতলেন। এর আগে ২০২৪ সালে বারবোরা ক্রেচিকোভা এবং ২০২৩ সালে মার্কেতা ভনড্রোউসোভা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। এই জয়ের জন্য নোসকোভা পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন ৩.৬ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৪.৮ মিলিয়ন ডলার)।

ম্যাচ পয়েন্ট বাঁচিয়ে চ্যাম্পিয়ন: এই টুর্নামেন্টের তৃতীয় রাউন্ডে সোরানা কার্স্টিয়ার বিপক্ষে নিজেই ম্যাচ পয়েন্টের মুখোমুখি হয়েছিলেন নোসকোভা। টুর্নামেন্টের কোনো এক পর্যায়ে ম্যাচ পয়েন্ট বাঁচিয়ে শেষ পর্যন্ত উইম্বলডন চ্যাম্পিয়ন হওয়া তৃতীয় নারী তিনি। এর আগে ভেনাস উইলিয়ামস (২০০৫) এবং সেরেনা উইলিয়ামস (২০০৯) এই কীর্তি গড়েছিলেন।

  • ডাবল ধামাকা: ২০০৪ সালে মারিয়া শারাপোভার পর নোসকোভা প্রথম নারী, যিনি একই বছরে জুনে বার্লিনে ঘাসের কোর্টের টুর্নামেন্ট জেতার পর উইম্বলডনও নিজের করে নিলেন।
  • ঘাসের কোর্টে আধিপত্য: ২০২৩ সালে বার্মিংহামে ঘাসের কোর্টে নিজের প্রথম ম্যাচ খেলা নোসকোভা গত দুই বছরে ডব্লিউটিএ (WTA) ট্যুরে ঘাসের কোর্টে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জিতেছেন। অথচ এই উইম্বলডনের আগে কোনো গ্র্যান্ড স্ল্যামের কোয়ার্টার ফাইনালের গণ্ডিই পার হতে পারেননি তিনি।

একটু অদ্ভুত স্বভাবের নোসকোভা উইম্বলডনের চ্যাম্পিয়নদের তালিকায় এক রঙিন সংযোজন। নাকে পিয়ার্সিং করা নোসকোভার কিছু নির্দিষ্ট কুসংস্কার ও রীতিনীতি রয়েছে, যেমন বেকিং করতে ভালোবাসা, লাকি চার্ম রাখা এবং টুর্নামেন্ট চলাকালীন প্রতিদিন সকালে এক বন্ধুর হাত থেকে ‘মাচা চা’ (Matcha tea) খাওয়া।

নোসকোভার উইম্বলডন নিয়ে একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক স্মৃতি রয়েছে। ২০২৪ সালের উইম্বলডনে তিনি অংশ নিয়েছিলেন তাঁর মা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার ঠিক পরপরই। ২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক ও আনন্দের জয় হয়তো তাঁর সেই পুরনো শোকের ক্ষত কিছুটা হলেও উপশম করবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles