১৯৮৬ বিশ্বকাপের ম্যারাডোনা-শিল্টন লড়াইয়ের উত্তাপ, মেসি-কেইনের চোখে

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে সেমিফালে উঠেছিল ততকালীন ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা। কিন্তু সেই ম্যাচ শুধুই অন্য একটা ম্যাচের মত ছিলনা, সেখানে ছিল ম্যারাডোনার ”গোল অব সেঞ্চুরি” এবং “হ্যান্ড অব গড” খ্যাত বিতর্কিত গোল! সেই থেকে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা শুরু হয় ফকল্যান্ড যুদ্ধ পেছনে ফেলে নতুন ফুটবল যুদ্ধ- “হ্যান্ড অব গড” বিতর্কিত গোল-যুদ্ধ। সেই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডকে কোয়ার্টারে হারিয়ে সেমিতে গিয়েছিল। আর ২০২৬ বিশ্বকাপে দেখা হচ্ছে সেমিফাইনালে। এ যেন ১৯৮৬ বিশ্বকাপের ম্যারাডোনা-শিল্টন লড়াইয়ের উত্তাপ, মেসি-কেইনের চোখে।

বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ১৯৮৬ বিশ্বকাপের আগে লড়াই হয়েছে ২বার প্রথম দেখা ১৯৬২ সালে সেবার ইংল্যান্ড গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ৩-১ গোলে হারিয়েছিল আর্জেন্টিনাকে আবার ১৯৬৬ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে ১-০ গোলে পরাজিত হয় আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপে একে অপরের ৩ নম্বর সাক্ষাতের ম্যাচে প্রথম জয় পায় ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে দিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে। যে জয় নিয়ে আছে বিতর্ক আবার আছে ঐতিহাসিক গোলের স্বাক্ষর। সেবার ম্যারাডোনা নিজের প্রথম গোলটি করেছিলেন হাতের সহায়তায় যে গোল নিয়ে ম্যারাডোনা ব্যাখ্যায় বলেছিলেন “হ্যান্ড অব গড” ম্যারাডোনার সেই গোল নিয়ে আর্জেন্টিনা বাসি যেমন গর্ব করে তেমনী ইংল্যান্ড বাসি ঠিক তার উল্টোটা অর্থাৎ ঘৃনা ভরে ম্যারাডোনার “হ্যান্ড অব গড” গোলকে স্মরণ করে প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে যায়। তবে সেই বিতর্কিত গোলের পর ম্যারাডোনা মাঝ মাঠ থেকে ইংল্যান্ডের ৬ জনকে কাটিয়ে যে গোলটি করেছিলেন তা ফুটবল ইতিহাসে হয়ে আছে “গোল অব দ্যা সেঞ্চুরী” আর এ গোলের কারণেই অনেকটা আড়ালে পড়ে যায় “হ্যান্ড অব গোল” ম্যারাডোনা হয়ে যান আর্জেন্টাইনদের কাছে বিশ্ব জয়ী ম্যারাডোনা অপরদিকে ব্রিটিশরা পুড়তে থাকেন প্রতিশোধের আগুনে।  

মুলতঃ বিশ্বকাপের আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ফুটবল দ্বৈরথ ওখান থেকেই শুরু, ৮৬ বিশ্বকাপের পর ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড প্রতিশোধ নেওয়ার ম্যাচে উল্টো টাইব্রেকার হেরে যেন ফুঁসছিল কবে নিবে সেই প্রতিশোধ। অবশেষে ২০০২ বিশ্বকাপে ব্রিটিশরা আর্জেন্টিনাকে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ২-১ গোলে পরাজিত করে কিছুটা ঝাল মিটায়। তবে ৮৬ বিশ্বকাপের সেই হারের কথা ইংল্যান্ড কখনই ভুলতে পারেনা কারণ সেই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডকে পরাজিত করে সেমির বাঁধা পেরিয়ে ২য় বারের মত বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আর এ কারণেই ইংল্যান্ড দলের যত ক্ষোভ আর রাগ যে, সেদিনের সেই গোলের কারণেই ব্রিটিশদের শিরোপার খুব কাছ থেছে বিদায় নিতে হয়েছিল।

১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার কাছে ২-১ গোলে পরাজিত হওয়ার পর তৎকালীন ইংল্যান্ড দলের নিয়মিত অধিনায়ক ব্রায়ান রবসন (যিনি ইনজুরির কারণে ওই ম্যাচে খেলতে পারেননি) এবং মাঠে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করা গোলরক্ষক পিটার শিলটন তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ  করে  বলেছিলেন ম্যারাডোনার ওই গোলটি সরাসরি প্রতারণা তিনি বলেছিলেন “আমরা যে সময় আমাদের ছন্দ ফিরে পাচ্ছিলাম, দারুণ খেলছিলাম এবং আমাদের বিশ্বকাপ জেতার একটা বড় সুযোগ তৈরী হয়েছিল ঠিক তখনই স্রেফ প্রতারণা করে আমাদের জয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। ম্যারাডোনা কখনও সেই গোলের জন্য ক্ষমা না চাওয়ায় শিলটন তার খেলোয়াড় সুলভ আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। শিল্টন আরো বলেন “আমি অন্য খেলোয়াড়দের দেখেছি যারা নিয়ম ভেঙে বা প্রতারণা করে পরে সেটা স্বীকার করেছে এবং ক্ষমা চেয়েছে। কিন্তু সে (ম্যারাডোনা) কখনোই ক্ষমা চায়নি। ফুটবলার হিসেবে সে ইতিহাসের অন্যতম সেরা হতে পারে, কিন্তু একজন খেলোয়াড়সুলভ মানসিকতার মানুষ (Sportsman) হিসেবে আমি তাকে কখনোই সম্মান করি না এবং করবও না। ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগের অন্যতম স্তম্ভ ও পরবর্তী সময়ে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হওয়া টেরি বুচার ম্যাচ শেষের অভিজ্ঞতা নিয়ে বলেছিলেন:”এটি সম্ভবত ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জালিয়াতি (Fraud) ছিল এবং সে (ম্যারাডোনা) খুব সহজেই পার পেয়ে গেল, তিনি বলেন ম্যাচ শেষে ডোপ টেস্টের ঘরে যখন আমি ম্যারাডোনাকে আকার-ইঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলাম যে এটি মাথা নাকি হাত ছিল? সে মাথার দিকে ইশারা করল। ওটা একটা ছোট ঘর ছিল, সেখানে আমরা তিনজন ইংলিশ খেলোয়াড় রাগে ফুঁসতে থাকা অবস্থায় ছিলাম সে যদি ‘হাত’ বলত, তবে আমরা হয়তো তাকে মেরেই বসতাম!”

তিনি আরও যোগ করেন, “সে যদি এসে বলত যে ওটা হাত ছিল এবং দুঃখ প্রকাশ করত, তবে হয়তো আমি তাকে ২০ বার মারার বদলে ৪-৫ বার মারতাম।”

ঐ ম্যাচ নিয়ে তৎকালীন ইংল্যান্ড দলের মূল বক্তব্য ছিল-আর্জেন্টিনার কাছে তারা ফুটবলীয় দক্ষতায় হারেনি, বরং রেফারির চোখ এড়িয়ে যাওয়া একটি পরিষ্কার হ্যান্ডবল এবং প্রতারণার কাছে হেরেছে। এই হারের ক্ষোভ পিটার শিলটন বা টেরি বুচারদের মনে এতটাই গভীর ছিল যে ম্যারাডোনার মৃত্যুর পরও তারা সেই ‘ইনজাস্টিস’ বা অন্যায়ের কথা ভুলতে পারেননি। তবে কি ৪০ বছর পর ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রতিশোধের আগুনে পড়তে থাকা ইংল্যান্ড আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে শিরোপা জিতে সব ঝাল মেটাতে মেটাবে আর যদি জিতেও যায় তবে কি ম্যারাডোনাকে ক্ষমা করে দিবেন? এমন নানান গুঞ্জন নিয়েই যেন এখন শুধুই অপেক্ষা ফুটবলপ্রেমীদের আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ফুটবল সেমির মহারণের জন্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles