দক্ষিণ আফ্রিকা-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট সিরিজ
অস্ট্রেলিয়া তাদের সর্বশেষ চার টেস্টের দুটিতেই হেরেছে, তাও আবার বড় ব্যবধানে। দলটিকে সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে জুটি গড়তে না পারা-অথবা একই সময়ে একাধিক ব্যাটারের দায়িত্ব নিয়ে দাঁড়াতে না পারার ব্যর্থতা। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে। তবে দলটির সর্বশেষ ৪টি ম্যাচ, যার দুটিতেই তারা বড় ব্যবধানে হেরেছে, সমস্যাটিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বাংলাদেশ ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সাত ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার কোনো ইনিংসেই একের বেশি ব্যাটার ফিফটির দেখা পাননি। ট্রাভিস হেড মনে করেন সম্মিলিত ব্যাটিংয়ে ঘুরে দাঁড়াবে অস্ট্রেলিয়া।
ডারউইন টেস্টে ৯ উইকেটের হার, আর গেবেখা টেস্টে ইনিংস ও ৩১ রানের বড় পরাজয়। দুই ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসেই প্রতিরোধ গড়ে সেঞ্চুরি করেছিলেন ক্যামেরন গ্রিন ও ট্রাভিস হেড। কিন্তু তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিলেন না। মূলত প্রথম ইনিংসেই ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। এই দুই ম্যাচের প্রথম ইনিংসে শুধু ডারউইনে স্টিভ স্মিথ ফিফটি করতে পেরেছিলেন।
সেন্ট জর্জেস পার্কে প্রথম ইনিংসে মাত্র ৯৯ রানে অলআউট হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং নিয়ে নিজের মূল্যায়নে ট্রাভিস হেড বলেন, “আমরা কোথায় ভুল করেছি, সেটা বেশ পরিষ্কার। আমাদের একটা ভয়াবহ বাজে দিন গেছে।”
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক প্যাট কামিন্সও বলেন, জয় অনেক সময় দলের দুর্বলতাগুলো আড়াল করে দেয়। এমনকি তাদের দুটি বড় জয়-ম্যাকেতে দ্রুত শেষ হওয়া দুই দিনের ম্যাচ এবং ডারবানে দারুণ পারফরম্যান্স-সেখানেও দলীয় ব্যাটিংয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যাকের ম্যাচে মিচেল স্টার্কের অবদানে মাত্র ২১০ রান করেই ইনিংস ব্যবধানে জয় পেয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু ব্যাটিংয়ে তাদের অবস্থা ছিল নড়বড়ে। ৭ উইকেটে ১৪৬ রান তুলতেই হিমশিম খেয়েছিল দলটি, যেখানে গ্রিন ছাড়া কেউ ফিফটি করতে পারেননি। অন্যদিকে কিংসমিডে ম্যাট রেনশ এক ম্যাচেই করেছিলেন ২৭২ রান, যা সতীর্থদের পারফরম্যান্সকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছিল।
গেবেখায় দ্বিতীয় ইনিংসে ১২১ রান করার পর হেড বলেন, “সিরিজ শুরুর আগে দল হিসেবে আমরা আলোচনা করেছিলাম, প্রতিবারই আমাদের একজন করে খেলোয়াড় ভালো করছে। প্রতিবারই সেই খেলোয়াড় আলাদা, কিন্তু দল হিসেবে আমরা যে সম্মিলিত ব্যাটিং পারফরম্যান্স চাই, সেটা দেখাতে পারছি না।
“ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সই ম্যাচ জেতায়, তবে দল হিসেবেও আমাদের সেটা করে দেখাতে হবে। গেবেখায় দ্বিতীয় ইনিংসে ছয় নম্বরে নেমে বাজ (স্কট বোল্যান্ড) তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ব্যাট করে ৪০ রান করেছে। দলের জন্য ওর এই অবদান ছিল অসাধারণ। অন্যদের কাছ থেকে একটু বেশি সহায়ক ভূমিকা পাওয়া গেলেও অনেক কাজে দিত। কিন্তু আমরা সেটা খুঁজে পাচ্ছি না।
“দীর্ঘ সময় ধরে বড় জুটি গড়া এবং ক্রিকেটে ম্যাচ জেতানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ জুটি তৈরি করা আমাদের দলের অন্যতম শক্তি ছিল। কিন্তু গত কয়েক মাসে আমরা সেটা করতে পারছি না। কেন এমন হচ্ছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। আমরা অসাধারণ সব বোলিং আক্রমণের মুখোমুখি হচ্ছি, কঠিন কন্ডিশনেও খেলছি। তবে চেষ্টা বা পরিশ্রমের কোনো ঘাটতি নেই।”
দীর্ঘদিনের সমস্যায় অস্ট্রেলিয়া: অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘদিন ধরেই সফল একটি দল। তবে আরও পেছনে তাকালে দেখা যায়, টপ অর্ডারে জুটি গড়তে না পারার সমস্যা কেবল সাম্প্রতিক নয়।
২০২৪ সালের শুরু থেকে, ডেভিড ওয়ার্নারের অবসরের পর ব্যাটিং অর্ডারে পরিবর্তন আসতে শুরু করলে, এক থেকে ছয় নম্বর উইকেট পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া মাত্র ১১টি শতরানের জুটি গড়তে পেরেছে। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়া দেশগুলোর মধ্যে এ সংখ্যা কেবল ওয়েস্ট ইন্ডিজের চেয়ে বেশি।
গেবেখায় প্রথম ইনিংসে মাত্র ৯৯ রানে অলআউট হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ডও ব্যাটিং অর্ডারের ব্যর্থতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, প্রতিপক্ষের চাপ সামলে খেলার গতি থামানোর জন্য ব্যাটাররা যথেষ্ট সময় উইকেটে টিকে থাকতে পারেননি।
হেড বলেন, “ক্রিকেটে সবকিছুই গতির ওপর নির্ভর করে। কীভাবে খেলার গতি নিজেদের পক্ষে আনা যায়, প্রতিপক্ষের চাপ সামলানো যায় এবং পাল্টা চাপ তৈরি করা যায়-সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। আর সেটা করার বিভিন্ন উপায় রয়েছে। আপনি কি পিছু হটে রক্ষণাত্মক খেলবেন, নাকি আক্রমণাত্মক হয়ে পাল্টা লড়াই করবেন? এটাই ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়।
“কেউ কেউ বলবেন, কখনো আমরা যথেষ্ট আক্রমণাত্মক নই, আবার কখনো যথেষ্ট রক্ষণাত্মক নই। বিষয়টি দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত সবকিছু নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং কৌশলের ওপর।
“যখন আপনি কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়বেন, তখন আপনার কৌশল, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিখুঁত হতে হবে। আর যখন তা হয় না, তখনই ব্যাটিংয়ে ধস নামে। আমার মনে হয়, ক্রিকেটের ইতিহাসজুড়েই এমনটা হয়ে আসছে।”
অন্যদিকে, দ্বিতীয় ইনিংসে সাইমন হারমারের বলে মিড-অনে ক্যাচ তুলে দিয়ে আউট হওয়ার পর মারনাস লাবুশেনের প্রতিক্রিয়া দেখে তাঁর ওপর চাপের বিষয়টি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল বলে স্বীকার করেছেন হেড। ওই আউটের মধ্য দিয়ে তাঁদের ৯২ রানের জুটির সমাপ্তি ঘটে। এর মাত্র ১৩ বল আগে ডিআরএসে এলবিডব্লিউর সিদ্ধান্ত থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন লাবুশেন। রিপ্লেতে দেখা যায়, বলটি লেগ স্টাম্পের বাইরে দিয়ে যাচ্ছিল-ব্যবধান ছিল ৫ মিলিমিটারেরও কম।
লাবুশেনের পরিস্থিতি নিয়ে হেড বলেন, “আমি নিজেও এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছি। যখন মনে হয় ভালো ব্যাটিং করছেন, কিন্তু তারপরও রান পাচ্ছেন না, তখন পরিস্থিতিটা খুব কঠিন হয়ে যায়। আমার বয়স ত্রিশ ও চল্লিশের ঘরে থাকার সময় এমন অভিজ্ঞতা সম্ভবত অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি হয়েছে। মনে হয়, আপনি লক্ষ্যের খুব কাছাকাছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা হচ্ছে না।
“চাপ রয়েছে, আর তাঁর প্রতিক্রিয়া দেখেই সেটা স্পষ্ট বোঝা যায়। এলবিডব্লিউর সিদ্ধান্ত থেকে বেঁচে যাওয়ার পরও বোঝা যাচ্ছিল, তিনি জানেন এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল এবং তিনি হতাশ। “খেলায় কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়। ভবিষ্যতে কী হবে, সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারি না। তবে আমি জানি, সে একজন ভালো খেলোয়াড়।
“টেস্ট ক্রিকেট ভীষণ কঠিন। কিন্তু আমরা এমন একটি খেলায় আছি, যেখানে পারফরম্যান্সের ভিত্তিতেই সবকিছু বিচার করা হয়। তাই সবাই চাপ অনুভব করে। গত কয়েক সপ্তাহে আমিও চাপ অনুভব করেছি, রান করার জন্য মরিয়া ছিলাম। আপনি যে অবস্থানেই থাকুন না কেন, সবাই এই চাপ অনুভব করে। “স্টিভ স্মিথের ১১ হাজার টেস্ট রান রয়েছে। আমার মনে হয়, কোনো না কোনো সময় সেও চাপ অনুভব করবে। সবাই রান করতে চায়।”




