বৃষ্টিবিঘ্নিত লো স্কোরিং ম্যাচে চার রানের জয় নিয়ে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ২-০ তে ব্যবধানে লিড নিলো ভারত। দুর্দান্ত বোলিং করে ভারতের জয়ের নায়ক হয়েছেন পেসার গুরনুর ব্রার। ৪ ওভারের স্পেলে নয়, বরং নিজের নির্ধারিত বোলিংয়ে ৩০ রান খরচায় ৪ উইকেট নিয়ে কিউইদের ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামান এই ভারতীয় পেসার। তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্সে ভর করেই ওয়েলিংটনে নিউজিল্যান্ডকে ১৩৪ রানে অলআউট করে দেয় ভারত। শেষ পর্যন্ত ডিএলএস পদ্ধতিতে মাত্র ৪ রানের রোমাঞ্চকর জয় পায় সফরকারীরা। পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে সফরকারীদের লিড এখন ২-০।
ম্যাচজয়ের পর নিজের সাফল্যের কৃতিত্ব এককভাবে নিতে চাননি ব্রার। বরং দলের ইতিবাচক পরিবেশ, অধিনায়ক শুভমান গিলের আস্থা এবং কোচিং স্টাফের ধারাবাহিক সহযোগিতাকেই নিজের উন্নতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতার পর ব্রার জানান, দলের প্রত্যেক ক্রিকেটারকে সমানভাবে সমর্থন করা হয়। একটি খারাপ পারফরম্যান্সের কারণে কাউকে বিচার করা হয় না। বরং উন্নতির চেষ্টা, অনুশীলনের মান এবং দলের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়াকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ম্যাচ শেষে ব্রার বলেন, ‘বিরাট ও রোহিত ভাইয়ের সঙ্গে আমি ওপেন নেটে অনুশীলন করেছি। তাঁরা আমাকে অনেক পরামর্শ দিয়েছেন। শুভমানও আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছে।’
ক্যারিয়ারের কঠিন সময়গুলোও নিজের উন্নতির জন্য কাজে লাগিয়েছেন বলে জানান এই পেসার। গুয়াহাটি ও লর্ডসে প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করতে না পারার অভিজ্ঞতা তাঁকে মানসিকভাবে হতাশ করেছিল। তবে সেসব ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়াকেই নিজের এগিয়ে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন তিনি।
ব্রার বলেন, ‘গুয়াহাটি ও লর্ডসের ম্যাচগুলো আমার জন্য হতাশাজনক ছিল। তবে ওই অভিজ্ঞতাগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
নিজের বোলিংয়ের উন্নতিতে বোলিং কোচ মরনে মরকেলের অবদানও বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন ব্রার। লম্বা উচ্চতা এবং বোলিংয়ের ধরনে মরকেলের সঙ্গে নিজের কিছুটা মিল খুঁজে পান তিনি। আর সে কারণেই বিভিন্ন কন্ডিশনে কোন লেংথে বল করলে বেশি কার্যকর হওয়া যাবে, সে বিষয়ে মরকেলের কাছ থেকে নিয়মিত পরামর্শ পান।
ব্রারের ভাষায়, ‘মরনে মরকেল আমাদের অনেক কিছু শেখান। আমার উচ্চতা এবং বোলিংয়ের ধরন তাঁর সঙ্গে অনেকটা মিলে যায়। তাই নির্দিষ্ট পিচে কোন লেংথে বল করা আমাদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে তিনি নিয়মিত দিকনির্দেশনা দেন। এই আলোচনা সব সময় চলতে থাকে।’
অধিনায়ক শুভমান গিলের নেতৃত্বের ধরন নিয়েও প্রশংসায় পঞ্চমুখ ব্রার। তাঁর মতে, দলের প্রত্যেক ক্রিকেটারই অধিনায়কের কাছ থেকে সমান সমর্থন পান। কোনো খেলোয়াড়ের একটি ম্যাচের পারফরম্যান্স দিয়ে তাঁর সামর্থ্য কিংবা ভবিষ্যৎ বিচার করা হয় না। বরং দলের পরিবেশ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে প্রত্যেকেই নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে উন্নতির সুযোগ পাচ্ছেন।
ভারতীয় এই পেসার বলেন, ‘শুভমান সবাইকে একইভাবে সমর্থন করে। এখানে কেউ একটি পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে বিচারিত হয় না। একজন খেলোয়াড় কতটা পরিশ্রম করছে, অনুশীলনে কোন দিকে মনোযোগ দিচ্ছে এবং কীভাবে নিজের উন্নতি করতে চাইছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুভমান নিজেও সব সময় আরও ভালো হওয়ার ক্ষুধা ধরে রাখে। দলের জন্য সেরাটা দিতে চায়। সে নিয়মিত আমাদের সঙ্গে নিজের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করে। আমরা সবাই একসঙ্গে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি।’
বিদেশের মাটিতে বোলিং করার চ্যালেঞ্জ নিয়েও কথা বলেছেন ব্রার। তাঁর মতে, ভারত ও নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশনে বোলিংয়ের ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য থাকলেও দলের পরিকল্পনা এবং কোচিং স্টাফের বার্তা একই। নিজের শক্তির জায়গায় আস্থা রেখে ধারাবাহিকভাবে সঠিক লেংথে বল করে যাওয়ার নির্দেশনা পেয়েছেন তাঁরা।
ব্রার জানান, ভারতে তুলনামূলক ব্যাটিং-সহায়ক উইকেটেও বোলারদের একইভাবে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছিল। এমনকি প্রতিপক্ষের ব্যাটাররা চার কিংবা ছক্কা মারলেও নিজেদের পরিকল্পনা থেকে সরে না আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক খেলোয়াড়ের জন্য সমর্থন পাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের দলেও সবাই সেই সমর্থন পাচ্ছে। পরিবেশটা খুবই ইতিবাচক।’
নিজের বোলিং পরিকল্পনা সম্পর্কে ব্রার বলেন, ‘ভারতে ফ্ল্যাট উইকেটেও আমরা একইভাবে বোলিং করছিলাম। অবশ্যই সেখানে ভালোভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। তখনও দল আমাদের সমর্থন করেছে এবং বলেছে, যত বেশি ধারাবাহিকভাবে সঠিক লেংথে বল করতে পারব, ফলাফল তত ভালো হবে।’
‘নিউজিল্যান্ডে এসেও তারা একই কথা বলেছে। নিজেদের শক্তির জায়গায় আস্থা রাখতে এবং নির্দ্বিধায় নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী বল করতে বলেছে। এমনকি কোনো বল চার কিংবা ছক্কা হলেও সমস্যা নেই। তারা চায় আমরা ভয় না পেয়ে নিজের স্বাভাবিক বোলিংটা করি। আমি সেটাই করার চেষ্টা করছি এবং এখন তার ফলও পাচ্ছি।’
এদিকে সামনে আইসিসি পুরুষদের ক্রিকেট বিশ্বকাপকে বড় লক্ষ্য হিসেবে দেখলেও আপাতত এক ম্যাচ করে এগিয়ে যেতে চান ব্রার। ব্যক্তিগতভাবে প্রতিটি ম্যাচে নিজের ভুলগুলো শুধরে আরও ভালো পারফরম্যান্স করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য।
বিশ্বকাপ নিয়ে নিজের ভাবনা জানিয়ে ব্রার বলেন, ‘বিশ্বকাপ জেতাই আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি আমাদের সবার মাথায় রয়েছে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি ম্যাচ ধরে এগোতে পছন্দ করি। পরের ম্যাচে কীভাবে আরও ভালো পারফর্ম করা যায়, সেটিতেই মনোযোগ দিই।’
সিরিজের পরবর্তী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে হ্যামিল্টনে। সেখানে মাঠে নামার আগে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে করা ভুলগুলো চিহ্নিত করে শুধরে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
ব্রার বলেন, ‘হ্যামিল্টনে যাওয়ার আগে আজকের ম্যাচে কোথায় ভুল করেছি, সেগুলো শুধরে নেওয়াই আমার প্রধান লক্ষ্য। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু আপাতত ম্যাচ ধরে ধরে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচেই ভারতের সাফল্যের পেছনে দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার কথা উঠে এসেছে ব্রারের বক্তব্যে। বিশেষ করে অধিনায়ক শুভমান গিলের আস্থা, অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের পরামর্শ এবং কোচিং স্টাফের সহযোগিতা যে তরুণ পেসারের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে, তা স্পষ্ট। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ৪ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হওয়া ব্রার এখন সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখে হ্যামিল্টনেও নিজের সেরাটা দিতে চান।




