বিশ্বকাপের মহোৎসব শুরু হতে আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। ঠিক এমন মুহূর্তে আন্তর্জাতিক ফুটবল মঞ্চে ঘটে গেল এক বড়সড় ওলটপালট। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল কিংবা রানার্সআপ ফ্রান্সকে পেছনে ফেলে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের হারানো সিংহাসন আবারো নিজেদের দখলে নিয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। একদিকে বিশ্বসেরার মুকুট ফিরে পাওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে দরজায় কড়া নাড়া বিশ্বকাপের এক ‘অভিশপ্ত ইতিহাস’ সব মিলিয়ে আলবিসেলেস্তে শিবিরে এখন স্বস্তি ও উদ্বেগের এক মিশ্র হাওয়া।
আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে ফ্রান্সের অপ্রত্যাশিত হার এবং স্পেনের পয়েন্ট ভাগাভাগির সুবাদেই লিওনেল মেসির দল এই গৌরব ফিরে পেয়েছে।
ফিফার রিয়েল-টাইম র্যাঙ্কিং
চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে ফিফা তাদের র্যাঙ্কিং পদ্ধতিতে নতুন ‘রিয়েল-টাইম’ (তাৎক্ষণিক) হিসাব চালু করেছে। যেখানে প্রতিটি ম্যাচের জয়-পরাজয় ও গোলের ওপর ভিত্তি করে পয়েন্ট তাৎক্ষণিকভাবে পরিবর্তিত হয়।
বৃহস্পতিবার রাতে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে আইভরিকোস্টের কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে বড় ধাক্কা খায় ফ্রান্স। অন্যদিকে, আরেক ম্যাচে শক্তিশালী স্পেন ১-১ গোলে ড্র করে বসে পুঁচকে ইরাকের সঙ্গে। ইউরোপের দুই জায়ান্টের এমন পয়েন্ট হারানোর দিনে শীর্ষস্থানে লাফিয়ে ওঠে আর্জেন্টিনা। আগামী ১০ জুন, বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগের দিন ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে এই র্যাঙ্কিং প্রকাশ করবে।
টানা ৮৯৩ দিন আর্জেন্টিনার শীর্ষস্থান
২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে টানা ৮৯৩ দিন ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে রাজত্ব করেছিল লিওনেল স্কালোনির দল। তবে গত বছরের সেপ্টেম্বরে তারা সাময়িকভাবে সেই সিংহাসন হারিয়েছিল। বিশ্বকাপের আগমুহূর্তে সেই রাজত্ব পুনরুদ্ধার করায় স্বাভাবিকভাবেই স্বস্তিতে আছেন বিশ্বজুড়ে থাকা আর্জেন্টাইন সমর্থকরা।
বিশ্বকাপের চূড়ান্ত প্রস্তুতি হিসেবে আর্জেন্টিনা আগামী রবিবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টায় হন্ডুরাস এবং আগামী বুধবার (সকাল সাড়ে ৬টায়) আইসল্যান্ডের মুখোমুখি হবে। অন্যদিকে, সোমবার রাতে ফ্রান্স মাঠে নামবে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে।
আর্জেন্টিনা শীর্ষে ওঠায় সমর্থকরা যখন উৎসবে মেতেছেন, ঠিক তখনই ফুটবল বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন এক অদ্ভুত ও নির্মম পরিসংখ্যানের কথা। ফুটবল বিশ্বে যা ‘ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের অভিশাপ’ নামে পরিচিত। ১৯৯৩ সালে ফিফা র্যাঙ্কিং প্রথা চালুর পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো দলই বিশ্বকাপের ঠিক আগে র্যাঙ্কিংয়ের ‘এক নম্বর’ দল হিসেবে টুর্নামেন্টে খেলতে নেমে ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে পারেনি!
এক নজরে বিশ্বকাপের সেই ‘অভিশপ্ত’ ইতিহাস:
• ১৯৯৪: শীর্ষ দল জার্মানি — পরিণতি: ব্যর্থ (চ্যাম্পিয়ন: ব্রাজিল)
• ১৯৯৮: শীর্ষ দল ব্রাজিল — পরিণতি: ফাইনালে পরাজয় (চ্যাম্পিয়ন: ফ্রান্স, যারা ছিল ১৮তম)
• ২০০২: শীর্ষ দল ফ্রান্স — পরিণতি: গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় (চ্যাম্পিয়ন: ব্রাজিল, যারা ছিল ২য়)
• ২০০৬: শীর্ষ দল ব্রাজিল — পরিণতি: কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় (চ্যাম্পিয়ন: ইতালি, যারা ছিল ১৩তম)
• ২০১০: শীর্ষ দল ব্রাজিল — পরিণতি: কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় (চ্যাম্পিয়ন: স্পেন, যারা ছিল ২য়)
• ২০১৪: শীর্ষ দল স্পেন — পরিণতি: গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় (চ্যাম্পিয়ন: জার্মানি, যারা ছিল ২য়)
• ২০১৮: শীর্ষ দল জার্মানি — পরিণতি: গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় (চ্যাম্পিয়ন: ফ্রান্স, যারা ছিল ৭ম)
• ২০২২: শীর্ষ দল ব্রাজিল — পরিণতি: কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় (চ্যাম্পিয়ন: আর্জেন্টিনা, যারা ছিল ৩য়)
সর্বশেষ ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও এক নম্বর দল হিসেবে দাপটের সাথে খেলতে নেমেছিল নেইমারের ব্রাজিল। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালেই ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে তাদের যাত্রা থামে। আর সেবার তিন নম্বর দল হিসেবে টুর্নামেন্ট শুরু করে শেষ পর্যন্ত ট্রফি জিতেছিল আর্জেন্টিনা।
আর্জেন্টিনা কি পারবে নতুন ইতিহাস তৈরি করতে?
এবার চাকা ঘুরে গেছে। আর্জেন্টিনা নিজেই এখন এক নম্বর দল হিসেবে বিশ্বকাপে পা রাখতে যাচ্ছে। অর্থাৎ, ইতিহাসের সেই অদ্ভুত ‘অভিশাপ’ ইতিহাস এখন তাড়া করবে খোদ আলবিসেলেস্তেদেরই।
টানা কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ জিতে অপরাজেয় এক মানসিকতা তৈরি করা লিওনেল স্কালোনির দল কি পারবে তিন দশকের এই দীর্ঘদিনের দেওয়াল ভাঙতে? মেসি কি পারবেন এক নম্বর দল হিসেবেই ক্যারিয়ারের শেষ লগ্নে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বজয় করতে? নাকি ইতিহাসের এই অমোঘ নিয়মই সত্যি হবে? সব কিছুরই উত্তর মিলবে মাঠের মহালড়াইয়ে।
স্কোর কার্ড
বিশ্বকাপ ২০২৩



















