গ্যালাতাসারেকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিলো বার্সেলোনা

উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে গ্যালাতাসারে’র বিপক্ষে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছে বার্সেলোনা। মঙ্গলবার রাতে ইস্তাম্বুলের র‍্যামস পার্কে স্বাগতিকদের ৪-১ গোলে হারিয়েছে হান্সি ফ্লিকের দল। প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়েও দ্বিতীয়ার্ধে দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দিয়ে বড় জয় তুলে নেয় কাতালানরা। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে লামিনে ইয়ামালের অসাধারণ নৈপুণ্যই হয়ে ওঠে বার্সেলোনার জয়ের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ।

এই জয়ের মধ্য দিয়ে মৌসুমের শুরুতে টানা ১০ ম্যাচে জয়ের ধারা ধরে রেখেছে বার্সেলোনা। চ্যাম্পিয়নস লিগের লিগ পর্বেও দুই ম্যাচে দুই জয়ে পূর্ণ ছয় পয়েন্ট নিয়ে নিজেদের নিখুঁত যাত্রা অব্যাহত রেখেছে তারা।

ম্যাচের শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখে বার্সেলোনা। গ্যালাতাসারের সমর্থকদের তুমুল গর্জন এবং স্বাগতিক দলের আক্রমণাত্মক প্রেসিংয়ের মধ্যেও প্রথম ২০ মিনিট বেশ ভালোভাবেই সামাল দেয় সফরকারীরা। প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করতে উঁচুতে উঠে প্রেসিং এবং অফসাইড ফাঁদ ব্যবহার করছিল তুরস্কের ক্লাবটি।

মাঝমাঠে রদ্রি ও পেদ্রি খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করেন। অন্যদিকে পাউ কুবারসি ও জেরার্ড মার্তিন রক্ষণ সামলে গ্যালাতাসারে এর ভিক্টর ওসিমেনকে কার্যকরভাবে আটকে রাখেন। বারবার অফসাইডে পড়ে হতাশ হয়ে পড়েন নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার।

বল দখল এবং আক্রমণ তৈরিতে এগিয়ে ছিল বার্সেলোনা। অ্যান্থনি গর্ডন, দানি ওলমো ও জোয়াও কানসেলো গোলের সুযোগ তৈরি করলেও প্রথম দিকে সেগুলো কাজে লাগাতে পারেনি দলটি।

ম্যাচের গতিপ্রকৃতি যখন বার্সেলোনার পক্ষেই ছিল, তখনই আসে অপ্রত্যাশিত ধাক্কা। বক্সের মধ্যে গর্ডন পড়ে গেলে পেনাল্টির দাবি জানায় বার্সেলোনা। কিন্তু খেলা চলতে থাকায় দ্রুত পাল্টা আক্রমণে উঠে যায় গ্যালাতাসারে।

গতি ব্যবহার করে এরিক গার্সিয়াকে পেছনে ফেলে দেন রাফায়েল লেয়াও। এরপর বক্সের মধ্যে নিচু ক্রস পাঠালে অ্যালেক্সেই বাতরাকভের শট জোয়াও কানসেলোর গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে জড়ায়। ফলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণে থাকা বার্সেলোনাকেই ম্যাচের ২৮তম মিনিটে পিছিয়ে পড়তে হয়।

প্রথম গোলের পর ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগও পেয়েছিল গ্যালাতাসারে। কর্নার থেকে আসা বলে ওসিমেনের হেড বারিস ইলমাজের গায়ে লেগে জালে ঢুকে যায়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআরের পর্যালোচনার পর অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল করা হয়।

এই সিদ্ধান্তের পর নতুন উদ্যমে আক্রমণে ফেরে বার্সেলোনা। প্রথমার্ধের শেষ ১৫ মিনিটে বেশ কয়েকটি ভালো আক্রমণ গড়ে তোলে সফরকারীরা।

বক্সের প্রান্তে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল কেড়ে নেন দানি ওলমো। এরপর জোয়াও কানসেলো সুযোগ কাজে লাগিয়ে গোল করে বার্সেলোনাকে সমতায় ফেরান ম্যাচের ৪৩তম মিনিটে।

সমতায় ফেরার পরপরই ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ পান গর্ডন। তবে গালাতাসারাইয়ের গোলরক্ষক উগুরচান চাকির দুর্দান্ত সেভে রক্ষা পায় স্বাগতিকরা। শেষ পর্যন্ত প্রথমার্ধ শেষ হয় ১-১ সমতায়।

দ্বিতীয়ার্ধে ইয়ামালের জাদু, পাল্টে যায় ম্যাচের চিত্র

দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম ১০ মিনিটেই ম্যাচের চিত্র বদলে দেন লামিনে ইয়ামাল। প্রথমার্ধে তুলনামূলকভাবে নিষ্প্রভ থাকলেও বিরতির পর তাঁর পারফরম্যান্সে নতুন গতি পায় বার্সেলোনার আক্রমণ।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ফেরমিন লোপেজের সঙ্গে দারুণ ওয়ান-টু খেলেন ইয়ামাল। এরপর পায়ের বাইরের অংশ দিয়ে অসাধারণ এক ক্রস পাঠান দূরের পোস্টে। কিন্তু গোলের সামনে থেকেও লক্ষ্যভেদ করতে ব্যর্থ হন গর্ডন।

তবে সেই সুযোগ নষ্ট হওয়ার পরও থেমে থাকেনি বার্সেলোনা। ম্যাচের ৫০তম মিনিটে ইয়ামাল আবারও নিখুঁত ক্রস পাঠান প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের পেছনে। এবার দৌড়ে এসে বলের নাগাল পান ফেরমিন লোপেজ। হেডে বল জালে পাঠিয়ে বার্সেলোনাকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি।

বার্সেলোনার তৃতীয় গোলের আগে ইয়ামাল দেখান তাঁর ব্যক্তিগত দক্ষতার অসাধারণ নমুনা। ৫৩তম মিনিটে বক্সের ভেতরে রাবোনা কিকের ভঙ্গিতে ক্রস করার ইঙ্গিত দিয়ে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারকে বিভ্রান্ত করেন তিনি। এরপর কৌশলে ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বল বাড়িয়ে দেন গর্ডনের দিকে।

এবার আর ভুল করেননি গর্ডন। কাছের পোস্ট দিয়ে জোরালো শটে গোলরক্ষককে পরাস্ত করে ব্যবধান ৩-১ করেন তিনি।

পরপর দুই গোল হজম করার পর দৃশ্যত চাপে পড়ে যায় গালাতাসারাই। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাল্টা আক্রমণে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে বার্সেলোনা।

ম্যাচের ২৫ মিনিট বাকি থাকতে চতুর্থ গোলটি পায় বার্সেলোনা। দ্রুতগতির এক পাল্টা আক্রমণের শেষ পর্যায়ে বল পেয়ে নিচের দূরের কোণে দুর্দান্ত শটে জাল খুঁজে নেন করিম আদেয়েমি ম্যাচের ৬৫তম মিনিটে।

স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৪-১। অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনটি গোল করে কার্যত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয় কাতালানরা।

এরপর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে খেলতে থাকে বার্সেলোনা। কোচ হান্সি ফ্লিক একাধিক পরিবর্তন এনে দলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন খেলোয়াড়কে বিশ্রাম দেওয়ার সুযোগ পান। শেষ পর্যন্ত আর কোনো গোল না হওয়ায় ৪-১ গোলের বড় জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে সফরকারীরা।

চ্যাম্পিয়নস লিগে নিখুঁত শুরু বার্সেলোনার

গালাতাসারাইয়ের মাঠে এই জয় শুধু তিন পয়েন্ট অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রতিকূল পরিবেশে পিছিয়ে পড়েও ম্যাচে ফিরে আসার সক্ষমতাও দেখিয়েছে বার্সেলোনা। প্রথমার্ধে একাধিক সুযোগ তৈরি করেও গোল করতে ব্যর্থ হওয়ার পর দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের ধার বাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে কার্যত কোণঠাসা করে ফেলে তারা।

বিশেষ করে লামিনে ইয়ামালের দ্বিতীয়ার্ধের পারফরম্যান্স ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তাঁর নিখুঁত ক্রস, সৃজনশীলতা ও ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে সতীর্থকে দিয়ে গোল করানোর দক্ষতা বার্সেলোনার আক্রমণকে আরও কার্যকর করে তোলে।

টানা ১০ ম্যাচে জয় এবং চ্যাম্পিয়নস লিগের লিগ পর্বে দুই ম্যাচে ছয় পয়েন্ট। সব মিলিয়ে মৌসুমের শুরুতে বার্সেলোনার ধারাবাহিকতা এখন নজরকাড়া। ইস্তাম্বুলের কঠিন পরিবেশে ৪-১ গোলের এই প্রত্যাবর্তন জয় তাদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়াবে।

spot_imgspot_img
spot_img

Related Articles