ম্যানচেস্টার সিটি ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড-দুই দলই আগামী মৌসুমে চ্যাম্পিয়নশিপে (ইংলিশ ফুটবলের দ্বিতীয় বিভাগ) খেলতে পারে। তবে দুই দলের কারণ এক নয়। মাঠের পারফরম্যান্সে বড় কোনো অবনতির কারণে সিটির অবনমন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়নি। প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নিয়ম ১১৪ বার লঙ্ঘনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিরুদ্ধে করা সিটির আপিল ব্যর্থ হলে সম্ভাব্য শাস্তিগুলোর একটি হতে পারে অবনমন। অন্যদিকে, ইংলিশ ফুটবলের শীর্ষ লিগের সবচেয়ে বাজে তিন দলের একটিতে পরিণত হওয়ায় প্রচলিত নিয়মেই রেলিগেশনের শঙ্কায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও সিটি।
মাইকেল ক্যারিকের দল বর্তমানে গোল ব্যবধানে অবনমন অঞ্চল থেকে সামান্য ওপরে রয়েছে। ২০২৬-২৭ মৌসুমে লিগের প্রথম ৯ ম্যাচে জয় পেয়েছে মাত্র ১টিতে। এটিকে নিছক সাময়িক ছন্দপতন বলার সুযোগ নেই। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে নিজেদের সর্বশেষ ৯ ম্যাচের ৬টিতে হেরেছে এবং ৩টিতে ড্র করেছে রেড ডেভিলরা। এই সময়ে প্রতিপক্ষের জালে মাত্র ৬টি গোল করতে পেরেছে তারা, বিপরীতে হজম করেছে ১৮ গোল। পরিস্থিতি দেখে সত্যিই মনে হচ্ছে, এই দুর্দশা হয়তো বড়দিন পর্যন্ত গড়াতে পারে।

শিগগিরই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ডাগআউটে আরেকটি পরিবর্তন আসতে পারে। তবে ক্লাবটির সংকট এখন এতটাই গভীরে পৌঁছেছে যে, নতুন কোচের আগমনেও জানুয়ারিতে ক্যারিকের অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব গ্রহণের পর যে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম। সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, প্রিমিয়ার লিগের শিরোপার লড়াইয়ে থাকার বদলে ইউনাইটেড যে এখন টিকে থাকার সংগ্রামে ব্যস্ত, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। অথচ ক্লাবটির ১৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ২০২৮ সালের মধ্যে ওল্ড ট্রাফোর্ডে প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল কর্তৃপক্ষ।
ক্লাবটির জন্য ১৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এখন আনন্দের চেয়ে আক্ষেপের উপলক্ষ্য হয়ে ওঠার আশঙ্কাই বেশি। যে ক্লাব একসময় নিজেদের ইউরোপের অভিজাতদের কাতারে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরত, তারা এখন সেই পরিচয় হারানোর পথে। কিন্তু বিপুল আর্থিক সামর্থ্য ও সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছাল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড? আর এই ভয়াবহ পতনের জন্য প্রকৃতপক্ষে সবচেয়ে বেশি দায়ী কে?
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের পতনের সূচনা খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হবে ২০০৩ সালে। ওই বছরের মার্চে ফ্লোরিডা ভিত্তিক ব্যবসায়ী ম্যালকম গ্লেজার ‘রেড ফুটবল’ নামের একটি হোল্ডিং কোম্পানির মাধ্যমে ৯ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে ক্লাবটির ২.৯ শতাংশ শেয়ার কিনে নেন। নভেম্বরের শেষ নাগাদ গ্লেজার ও তাঁর পরিবারের মালিকানায় চলে আসে রেড ডেভিলসের ১৫ শতাংশ শেয়ার।
ইউনাইটেডের সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারহোল্ডার জন ম্যাগনিয়ার ও জে পি ম্যাকম্যানাসের সঙ্গে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের মধ্যেই নীরবে এসব শেয়ার কিনছিলেন ম্যালকম। ঘোড় দৌড়ের প্রতি ভালোবাসার সূত্র ধরেই আইরিশ ব্যবসায়ী ম্যাগনিয়ার ও ম্যাকম্যানাসের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল স্কটিশ এই কোচের। একপর্যায়ে ম্যাগনিয়ার ফার্গুসনকে ‘রক অব জিব্রাল্টার’ নামের সম্ভাবনাময় একটি ঘোড়ার অর্ধেক মালিকানাও উপহার দেন।
ফার্গুসনের স্বাক্ষর করা ইউনাইটেডের বিখ্যাত লাল রঙের জার্সির আদলে ঘোড়াটির রেসিং পোশাক তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেটি হয়ে ওঠে ঘোড়দৌড়ের সুপারস্টার। টানা ৭টি গ্রুপ ওয়ান রেসে জয় পায় ঘোড়াটি। কিন্তু অবসরে যাওয়ার পর ঘোড়াটির ভবিষ্যৎ প্রজনন থেকে পাওয়া আয়ের অর্ধেক নিজের প্রাপ্য বলে মনে করেন ফার্গুসন। অন্যদিকে ম্যাগনিয়ার ও ম্যাকম্যানাসের দাবি ছিল, ঘোড়াটির প্রতিযোগিতায় জেতা পুরস্কারের অর্থের অর্ধেকই শুধু ফার্গুসনকে দেওয়া হয়েছিল। এই বিরোধের জেরে নজিরবিহীন এক সিদ্ধান্ত নেন ইউনাইটেড কোচ। ক্লাবটির প্রধান মালিকদের বিরুদ্ধে ১০ মিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত আদালতের বাইরে ম্যাগনিয়ার ও ম্যাকম্যানাসের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছান ফার্গুসন। তবে তত দিনে তাঁদের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। আর সেই সুযোগ কাজে লাগান গ্লেজার। ২০০৫ সালের মে মাসে ইউনাইটেডে নিজেদের পুরো ২৮.৭ শতাংশ শেয়ার সরাসরি গ্লেজারের কাছে বিক্রি করে দেন আইরিশ দুই বিনিয়োগকারী। এরপর লিভারেজড বাইআউটের মাধ্যমে ক্লাবটির ৯৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার উদ্যোগ নেন গ্লেজার। তাঁর এই মালিকানা প্রতিষ্ঠার ফলে সাত দশকেরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো শত শত মিলিয়ন পাউন্ড ঋণের বোঝা চাপে ইউনাইটেডের কাঁধে।
মালিকানা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পরদিনই নতুন মালিকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ওল্ড ট্রাফোর্ডে জড়ো হন প্রায় ৩০০ সমর্থক। নতুন মালিকপক্ষের মধ্যে ছিলেন নির্বাহী দায়িত্ববিহীন পরিচালক আভরাম, জোয়েল ও ব্রায়ান গ্লেজার। ক্ষুব্ধ সমর্থকদের আরেকটি দল প্রতিষ্ঠা করে নতুন ক্লাব ‘এফসি ইউনাইটেড অব ম্যানচেস্টার’।
এরপর ২০০৬ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে টানা তিনটি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা ও একটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতে ইউনাইটেড। তবে মাঠের সাফল্যের আড়ালে গ্লেজার পরিবারের মালিকানায় ক্লাবটির ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৭১৬ মিলিয়ন পাউন্ডে।
ঋণ পুনঃঅর্থায়নের পরিকল্পনা ঘোষণা করার পর নতুন করে প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে ইউনাইটেড সমর্থকদের মধ্যে। গ্লেজার পরিবারের মালিকানার বিরোধিতা জানাতে সমর্থকেরা পরতে শুরু করেন সবুজ ও সোনালি রঙের পোশাক। ১৮৭৮ সালে প্রতিষ্ঠার সময় ক্লাবটির নাম ছিল নিউটন হিথ। সেই ক্লাবের আদি রং ছিল সবুজ ও সোনালি। তাই এই রং ধারণের মধ্য দিয়ে পুরোনো পরিচয়ের প্রতি সমর্থন এবং নতুন মালিকদের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেন সমর্থকেরা।
তবে মাঠের বাইরের এসব বিতর্ক থেকে দলকে দূরে রাখতে ছিলেন ওস্তাদ ফার্গুসন। চারপাশে সমালোচনা ও প্রতিবাদ চললেও তিনি দলকে একের পর এক শিরোপা এনে দিতে থাকেন।
এর ফলে ইউনাইটেডের ট্রান্সফার বাজারে খেলোয়াড় কেনার আর্থিক সক্ষমতা ক্রমেই কমে আসা সত্ত্বেও গ্লেজার পরিবারের পক্ষ নিয়ে কথা বলার সুযোগ পান ফার্গুসন। ২০১২ সালে তিনি বিখ্যাতভাবে বলেছিলেন, ‘তাঁরা (গ্লেজার পরিবার) দারুণ। গ্লেজাররা যখন এখানে মালিকানা নেয়, তখন অসন্তোষ ছিল। তাই সব সময়ই সমর্থকদের একটি অংশের নিজস্ব মতামত ছিল। তবে আমার মনে হয়, অধিকাংশ প্রকৃত সমর্থক বিষয়টি বাস্তবসম্মত ভাবে দেখবেন এবং বলবেন, এটি দলের পারফরম্যান্সে কোনো প্রভাব ফেলছে না।’


