টেস্ট সিরিজজুড়ে যে পাকিস্তানি ব্যাটিং সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল, পোর্ট অব স্পেনে দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় দিনে সেই ব্যাটিংই যেন নতুন রূপে ধরা দিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩৪৪ রানের জবাবে দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে সফরকারী পাকিস্তান। দিনের খেলা শেষে ২ উইকেটে ২৬৬ রান তুলে প্রথম ইনিংসে ক্যারিবীয়দের থেকে মাত্র ৭৮ রান পিছিয়ে রয়েছে পাকিস্তান।
এই দাপুটে অবস্থানের মূল নায়ক আবদুল্লাহ শফিক ও বাবর আজম। তৃতীয় উইকেটে তাদের অবিচ্ছিন্ন ১৬৮ রানের জুটি পাকিস্তানকে শুধু বিপদমুক্তই করেনি, ম্যাচেও ফিরিয়ে এনেছে জোরালোভাবে। দিনের শেষ বিকেলে নিজের ষষ্ঠ টেস্ট সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন শফিক। ২০২৪ সালের পর এটিই তার প্রথম শতক। অন্যদিকে ৮৬ রানে অপরাজিত থাকা বাবর আজম চার বছর পর টেস্ট শতকের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম ইনিংসে ৩৪৪ রান তুলে কিছুটা এগিয়ে থাকলেও পাকিস্তানের ইনিংস শুরু থেকেই ছিল ইতিবাচক। অধিনায়ক শান মাসুদের অনুপস্থিতিতে ওপেনিংয়ে নামা আজান আওয়াইস শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেন। কেমার রোচকে এক ওভারে টানা তিনটি চার মেরে স্বাগতিকদের চাপে ফেলে দেন তিনি।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম সাফল্য আসে অষ্টম ওভারে। গতি বাড়িয়ে ইমাম-উল-হককে আউট করেন শামার জোসেফ। কিন্তু সেই ধাক্কায় ভেঙে না পড়ে পাল্টা লড়াই শুরু করেন আওয়াইস ও আবদুল্লাহ শফিক। বিশেষ করে শামার জোসেফের প্রায় ১৫০ কিলোমিটার গতির বলও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খেলেছেন আওয়াইস। একই সময়ে স্পিনার জোমেল ওয়ারিকানকে ছয় ও সুইপে চাপে রাখেন শফিক।
৫৭ রানের দারুণ ইনিংস খেলেও এলবিডব্লিউ হয়ে ফিরতে হয় আওয়াইসকে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ রিভিউ নিয়ে উইকেটটি আদায় করে নেয়। কিন্তু এরপরই ম্যাচের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দেন বাবর আজম ও শফিক।
দুজনই শুরুতে ধৈর্যের পরিচয় দেন। পরে ধীরে ধীরে বোলারদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে থাকেন। রোচের বিপক্ষে একের পর এক দৃষ্টিনন্দন কভার ড্রাইভে ফিফটি পূর্ণ করেন শফিক। ওয়ারিকানের স্পিনও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সামলান তিনি। শেষ পর্যন্ত ৯৯ রানে পৌঁছে কিছুটা অপেক্ষা করতে হলেও মিডউইকেট দিয়ে চার মেরে শতক পূর্ণ করেন এই ডানহাতি ব্যাটার।

অন্য প্রান্তে বাবর আজমের ইনিংস ছিল আরও পরিণত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আত্মবিশ্বাসের অভাবে যে বাবরকে অনেক সময় রক্ষণাত্মক ব্যাটিং করতে দেখা গেছে, এবার তার কোনো ছাপ ছিল না। জেইডেন সিলসের বিপক্ষে শুরুতেই তিনটি দৃষ্টিনন্দন বাউন্ডারি হাঁকিয়ে নিজের ছন্দের জানান দেন তিনি। এরপর পুরো ইনিংসজুড়ে ঝুঁকিমুক্ত ক্রিকেট খেলেই ধীরে ধীরে ইনিংস বড় করেন। দিনের শেষ ঘণ্টায় স্ট্রাইক ঘুরিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে কোনো সুযোগই দেননি পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক।
এর আগে সকালে অবশ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটাররা লড়াই চালিয়ে যান। আগের দিনের অপরাজিত দুই ব্যাটার জাস্টিন গ্রিভস ও অধিনায়ক রস্টন চেজ আরও ১০৫ রান যোগ করে দলের সংগ্রহ সমৃদ্ধ করেন। দুজনই অর্ধশতক পূর্ণ করেন।
তবে নতুন বল হাতে পাকিস্তানের বোলাররা দ্রুত ম্যাচে ফেরে। বাঁহাতি স্পিনার আলি উসমান প্রথম বলেই গ্রিভসকে ফিরিয়ে দেন। এরপর উবায়েদ শাহ তার প্রথম বলেই রস্টন চেজকে বোল্ড করে বড় ধাক্কা দেন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। শেষদিকে সাজিদ খান শামার জোসেফকে আউট করলে ৩৪৪ রানেই থামে স্বাগতিকদের ইনিংস।
দিনের শুরুতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিছুটা এগিয়ে থাকলেও শেষ বিকেলে দৃশ্যপট পুরো বদলে যায়। দীর্ঘদিন পর পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ে দেখা গেছে আত্মবিশ্বাস, ধৈর্য ও নিয়ন্ত্রণের দুর্লভ সমন্বয়। আবদুল্লাহ শফিকের শতক আর বাবর আজমের অপরাজিত ইনিংস পাকিস্তানকে শুধু ম্যাচেই ফিরিয়ে আনেনি, সিরিজজুড়ে সমালোচিত ব্যাটিং ইউনিটের আত্মবিশ্বাসও যেন নতুন করে ফিরিয়ে দিয়েছে।


