ফুটবলে সব গল্প ট্রফি জয়ে বা হারিয়ে শেষ হয় না। কিছু গল্প শেষ বাঁশির পরও বেঁচে থাকে মানুষের স্মৃতিতে, পরিসংখ্যানে, আবেগে। কিছু দল আছে, যারা একদিনের পরাজয়ে নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা কীর্তিতে নিজেদের পরিচয় লিখে যায়। লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা ঠিক তেমনই এক দল।
২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে শিরোপা হারিয়ে আকাশছোঁয়া স্বপ্ন ভেঙেছে ঠিকই, কিন্তু সেই হার তাদের অর্জনের আলোকে ম্লান করতে পারেনি। বরং আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন-এটাই আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সেরা জাতীয় দল।
এএফএর স্পনসর ডে অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে তাপিয়া শুধু একটি দলের প্রশংসা করেননি; তিনি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন একটি যুগকে। এমন এক দলকে, যারা কয়েক বছরের ব্যবধানে আর্জেন্টিনার ফুটবলকে হতাশার অতল গহ্বর থেকে টেনে এনে গৌরবের সর্বোচ্চ চূড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
তাঁর কণ্ঠে ছিল গর্বের দৃঢ়তা। তিনি বলেছেন, ‘পাঁচটি ফাইনাল খেলেছে এই দল, জিতেছে চারটিতে। আমার বিশ্বাস, এটাই আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সেরা দল। ফলাফলই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে হারলেও তাদের পারফরম্যান্স নিয়ে আমরা গর্বিত। এই ছেলেরা আমাদের পতাকাকে বিশ্বের সর্বোচ্চ উচ্চতায় তুলে ধরেছে।’

এই কথাগুলো শুধু পরিসংখ্যানের মূল্যায়ন নয়, বরং একটি স্বর্ণযুগের স্বীকৃতি। স্কালোনির হাত ধরে আর্জেন্টিনা জিতেছে ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালের ফিনালিসিমা, ২০২২ বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা। টানা পাঁচটি বড় ফাইনালে খেলে চারটি শিরোপা জেতা-আর্জেন্টাইন ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন ধারাবাহিক সাফল্যের নজির আর নেই।
২০২৬ বিশ্বকাপও সহজ ছিল না। দল বেড়েছে, ম্যাচ বেড়েছে, ভ্রমণ বেড়েছে, সময়ের পার্থক্য ও ভিন্ন আবহাওয়ার মতো নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ যুক্ত হয়েছে। তবু স্কালোনির দল শেষ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে ফাইনালে। শিরোপা না এলেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে গেছে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মর্যাদা নিয়ে।
তাপিয়ার ভাষায়, এটাই এই দলের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তিনি বলেন, এবারের বিশ্বকাপ ছিল আগের যেকোনো আসরের চেয়ে কঠিন। কিন্তু সেই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও আর্জেন্টিনা তাদের মান, শৃঙ্খলা এবং প্রতিযোগিতার ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে।
আসলে এই আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল শুধু প্রতিভা নয়, একটি বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসের নাম লিওনেল স্কালোনি। তাঁর নেতৃত্বে তারকাদের সমাহার কখনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে ওঠেনি; বরং প্রতিটি ফুটবলার নিজেদের একটি বৃহত্তর স্বপ্নের অংশ হিসেবে দেখেছে। বিশ্বকাপ ফাইনালে গার হয়েছে, কিন্তু সেই হার তাদের কীর্তির পাশে কেবল একটি কমা হয়ে থাকবে, পূর্ণচ্ছেদ নয়।
এএফএর স্পনসর ডে-তেও ছিল সেই সাফল্যের প্রতিধ্বনি। বিশ্বকাপজুড়ে জাতীয় দলকে সমর্থন দেওয়া শতাধিক ব্র্যান্ডের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন অনুষ্ঠানে। সেখানে স্কালোনির সহকারী কোচ রবার্তো আয়ালা ও কোচিং স্টাফের সদস্যরা অংশ নেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি গোলরক্ষক সের্হিও গোয়কোচেয়া। আর মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাপিয়া পুরো জাতির অনুভূতিকেই সম্মান জানালেন।
ফুটবলে ট্রফি জয় ইতিহাস লেখে, কিন্তু চরিত্র, ধারাবাহিকতা আর আত্মত্যাগ কিংবদন্তি তৈরি করে।
হয়তো ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ট্রফি আর্জেন্টিনার হাতে ওঠেনি। কিন্তু স্কালোনির এই দল এমন এক উত্তরাধিকার রেখে গেছে, যা কোনো এক ফাইনালের ফল দিয়ে মাপা যায় না। বহু বছর পরও যখন আর্জেন্টিনার ফুটবলের স্বর্ণযুগের কথা উঠবে, তখন শুধু চারটি ট্রফির কথা নয়, বলা হবে একটি দলের কথা-যারা জিতেছিল মানুষের বিশ্বাস, একটি দেশের ভালোবাসা এবং ইতিহাসের সর্বোচ্চ সম্মান।
সম্ভবত সে কারণেই ক্লদিও তাপিয়ার কণ্ঠে এত দৃঢ়তা-শিরোপা হারানো যায়, কিন্তু শ্রেষ্ঠত্ব নয়।


