ইতিহাসের সর্বনিম্ন টেস্ট ইনিংস
টেস্ট ক্রিকেটকে শুধু ব্যাট-বলের লড়াই বললে কম বলা হয়। টেস্ট খেলা অনেকটাই মানসিক শক্তি, ধৈর্য, কৌশল ও পরিস্থিতি সামলানোর খেলা। ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টির তুলনায় এখানে একজন খেলোয়াড়কে মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষা দিতে হয় অনেক বেশি। তাই কখনও কখনও ব্যাটাররা এতটাই মানসিক চাপে থাকেন যে সেই চাপ থেকে বেরিয়ে এসে উইলো হাতে সম্মান জনক রানের তীরে নোঙ্গর করা সম্ভব হয় না। টেস্টে প্রতিটি দেশ কোন না কোন সময় ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে হারিয়েছে টপাটপ উইকেট আর তখনই হয়েছে দলীয় সর্বনিম্ন রানের ইনিংস। দেখুন টেস্ট ক্রিকেটে ১২টি দেশের সর্বনিম্ন রানের ইনিংস।

টেস্ট ক্রিকেট মানসিক খেলাঃ
টেস্ট ক্রিকেট সবচেয়ে বড় মানসিক পরীক্ষার খেলা। একজন ব্যাটারকে কখনো ৪-৫ ঘণ্টা ক্রিজে থাকতে হয়। প্রথম ঘণ্টায় বল সুইং করতে পারে, পরে স্পিন আসতে পারে, আবার পুরোনো বলে রিভার্স সুইং হতে পারে। প্রতিটি মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিতে হয়-কোন বল খেলবেন, কোনটা ছাড়বেন, কখন আক্রমণ করবেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ধৈর্য।
ধরুন একজন ব্যাটার ৯৫ রানে অপরাজিত তখন শতরানের অপেক্ষায় তার মন অস্থির হয়ে উঠতে পারে। ঠিক তখনই একটি ভুল শট তাকে আউট করে দিতে পারে। আবার একজন বোলার ২০ ওভার বল করে কোনো উইকেট পেলেন না—তবুও তাকে পরের স্পেলেও একই মনোযোগ ধরে রাখতে হবে। এ কারণে টেস্ট ক্রিকেটে দেখা যায় শরীরের চেয়ে অনেক সময় মস্তিষ্কই আগে ক্লান্ত হয়ে যায়।
বোলারদের প্রাধান্যঃ
টেস্ট ক্রিকেটে বোলারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ম্যাচ জিততে হলে প্রতিপক্ষের ২০টি উইকেট নিতে হয়। শুধু ভালো ব্যাটিং করে টেস্ট জেতা যায় না। বিশেষ করে চার-পাঁচ দিনের ম্যাচে বোলারদের কয়েকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ যেমন- নতুন বলে পেসারদের সুইং ও সিম থেকে সুবিধা আদায় করা। পুরোনো বলে রিভার্স সুইং বা রাফ সাইডের সুবিধা নেওয়া। ম্যাচের শেষ দিকে বিশেষ করে ৩য় ও ৪র্থ দিন থেকে স্পিনাররা টার্ন সুবিধা পেতে পারেন কারণ তখন পিচ ভাঙতে শুরু করলে ব্যাটিং ক্রমেই কঠিন হয়ে যায়। একজন বোলারকে দীর্ঘ সময় ধৈর্য ধরে একই জায়গায় বল করতে হয়। তবেই সফল হওয়া যায়।

ব্যাটার বনাম বোলারঃ
টেস্ট ক্রিকেটে দু-জনের ভূমিকা দুরকম। তবে ম্যাচের ফল নির্ধারণে বোলারদের ভূমিকা একটু বেশি। কারণ একজন ব্যাটার ২০০ রান করেও ম্যাচ জেতাতে পারবেন না, যদি না তার দল প্রতিপক্ষের ২০ উইকেট নিতে না পারে। অন্যদিকে একজন বোলার ৫ বা ৬ উইকেট নিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আছে—বোলারকে সফল হওয়ার জন্য ব্যাটারকে চাপে ফেলতে হয়, আর ব্যাটারকে সফল হওয়ার জন্য বোলারের ধৈর্য ভাঙতে হয়। অর্থাৎ ‘‘টেস্ট ক্রিকেটের আসল লড়াইটা অনেক সময় হয়-বোলারের ধৈর্য বনাম ব্যাটারের ধৈর্য, বোলারের পরিকল্পনা বনাম ব্যাটারের সিদ্ধান্ত এবং শেষ পর্যন্ত-কার মানসিক শক্তি আগে ভাঙ্গে।’’ এই কারণেই টেস্ট ক্রিকেটকে ক্রিকেটের সবচেয়ে কঠিন ও পরিপূর্ণ সংস্করণ বলা হয়।
টেস্ট ক্রিকেট খেলা বর্তমান ১২টি পুরুষ দলের সর্বনিম্ন দলীয় ইনিংস।
| দেশ | সর্বনিম্ন রান | প্রতিপক্ষ | ভেন্যু | বছর | |
| নিউজিল্যান্ড | ২৬ | ইংল্যান্ড | অকল্যান্ড | ১৯৫৫ | |
| অস্ট্রেলিয়া | ৩৬ | ইংল্যান্ড | বার্মিংহাম | ১৯০২ | |
| দক্ষিণ আফ্রিকা | ৩০ | ইংল্যান্ড | পোর্ট এলিজাবেথ | ১৮৯৬ | |
| ভারত | ৩৬ | অস্ট্রেলিয়া | অ্যাডিলেড | ২০২০ | |
| আয়ারল্যান্ড | ৩৮ | ইংল্যান্ড | লর্ডস | ২০১৯ | |
| শ্রীলঙ্কা | ৪২ | দক্ষিণ আফ্রিকা | ডারবান | ২০২৪ | |
| বাংলাদেশ | ৪৩ | ওয়েস্ট ইন্ডিজ | নর্থ সাউন্ড | ২০১৮ | |
| ইংল্যান্ড | ৪৫ | অস্ট্রেলিয়া | সিডনি | ১৮৮৭ | |
| পাকিস্তান | ৪৯ | দক্ষিণ আফ্রিকা | জোহানেসবার্গ | ২০১৩ | |
| জিম্বাবুয়ে | ৫১ | নিউজিল্যান্ড | নেপিয়ার | ২০১২ | |
| আফগানিস্তান | ১০৩ | ভারত | বেঙ্গালুরু | ২০১৮ | |
| ওয়েস্ট ইন্ডিজ | ২৭ | অস্ট্রেলিয়া | কিংস্টন | ২০২৫ | |
নিউজিল্যান্ডের ২৬ রান এখনো টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বনিম্ন দলীয় ইনিংস। ১৯৫৫ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অকল্যান্ডে মাত্র ২৬ রানে অলআউট হয়েছিল তারা। আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের ২৭ রান ২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আসে, যা টেস্ট ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। বাংলাদেশের রেকর্ড ৪৩ রানের যা ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। তবে আজ, ২২ আগস্ট ২০২৬, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ ৬৪ রানে অল আউট হয়ে বাংলাদেশের ৪র্থ সর্বনিম্ন, আর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সর্বনিম্ন টেস্ট ইনিংস করেছে। এছাড়া বাংলাদেশ দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২০২২ সালে ডারবানে ৫৩ রানে এবং শ্রীলংকার বিপক্ষে ২০০৭ সালে কলম্বোতে ৬২ রানে অল আউট হয়েছিল।


