“একজন গোলরক্ষকের গল্প। যে ছোটবেলায় গোলপোস্টে দাঁড়াতে চাইতই না। স্বপ্ন ছিল স্ট্রাইকার হওয়ার। কিন্তু ভাগ্য তাকে বানিয়েছে এমন একজন নায়ক, যার হাত ধরে বিশ্বকাপের ইতিহাস লিখেছে মরক্কো। তিনি ইয়াসিন বুনো।”
কানাডার মন্ট্রিয়ালে জন্ম তাঁর। বাবা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক, আর মা ছিলেন একজন হেয়ারড্রেসার। জন্মের কয়েক বছর পরই পরিবার ফিরে যায় মরক্কোতে। তখন বুনোর বয়স মাত্র তিন।
পরবর্তীতে কানাডা একাধিকবার তাকে নিজেদের জাতীয় দলের হয়ে খেলার প্রস্তাব দেয়। এমনকি ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত কানাডার কোচ বেনিতো ফ্লোরো ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু বুনোর উত্তর ছিল একটাই, তিনি খেলবেন শুধু মরক্কোর হয়েই।

কাসাব্লাঙ্কার রাস্তাতেই শুরু তাঁর ফুটবলজীবন। বন্ধুদের সঙ্গে গাড়ি পার্কিংয়ের ঢালু জায়গায় খেলতেন। এক পাশে দুটি ময়লার ডাস্টবিন ছিল গোলপোস্ট, আর অন্য পাশে দেয়ালে আঁকা ছিল গোল। অসমান মাঠে খেলারও ছিল আলাদা নিয়ম।
মজার বিষয় হলো, বুনো কখনোই গোলরক্ষক হতে চাননি। তাঁর স্বপ্ন ছিল স্ট্রাইকার কিংবা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হওয়া। ছোটবেলায় তিনি মুগ্ধ ছিলেন রোনালদো, রোনালদিনিয়ো, রিভালদো, সার্জিও আগুয়েরো আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর খেলায়। তবে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি এরিয়েল ওর্তেগা। তাঁর ড্রিবল আর ফিনিশিং নকল করার চেষ্টা করতেন ছোট্ট বুনো।
এদিকে পরিবারের সংগ্রামও ছিল সমানতালে। বাবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন, আর মা ছোট্ট একটি হেয়ার সেলুন দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। পরে সেটি ফ্যাশন বুটিক, এরপর রেস্টুরেন্টে রূপ নেয়। পেশাদার ফুটবলার হিসেবে প্রথম বড় অঙ্কের অর্থ পাওয়ার পর বুনো পুরো ভবনটাই কিনে দেন মায়ের নামে। কারণ, তিনি চেয়েছিলেন জীবনে কোনো দিন যেন তাঁর মাকে সেই জায়গা ছেড়ে যেতে না হয়।

সাত বছর বয়সে তিনি প্রথম যে বিশ্বকাপটি মনে রাখতে পারেন, সেটি ছিল ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপ। সেবার অল্পের জন্য নকআউট পর্বে উঠতে পারেনি মরক্কো। সেই আক্ষেপই একদিন তাঁর ভেতরে দেশের হয়ে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন জাগিয়ে তোলে।
মাত্র দশ বছর বয়সে প্রথমবার স্পেনে যান। জারাগোজার একটি বাজারে চাচার সঙ্গে কাজ করতেন। সেই বাজারের পাশেই ছিল লা রোমারেদা স্টেডিয়াম। ভাগ্যের কী অদ্ভুত পরিহাস! প্রায় এক দশক পর সেই একই স্টেডিয়ামেই রিয়াল জারাগোজার হয়ে খেলেন ইয়াসিন বুনো।
২০১৮ বিশ্বকাপে দুই দশক পর মরক্কোর বিশ্বকাপে ফেরার অংশ ছিলেন তিনি। কিন্তু আসল ইতিহাস লেখেন ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে। শেষ ষোলোর টাইব্রেকারে স্পেনের বিপক্ষে দুটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন। তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্সে মরক্কো প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছে যায়।

আজও যখন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ আসে, বুনো যেন আরও বড় হয়ে ওঠেন। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে দুটি পেনাল্টি সেভ, ফ্রান্সের বিপক্ষে কিলিয়ান এমবাপ্পের পেনাল্টি ঠেকানো, বারবার প্রমাণ করেছেন, বড় মঞ্চের জন্যই যেন তাঁর জন্ম।
কাসাব্লাঙ্কার সেই ছোট্ট রাস্তা থেকে বিশ্বকাপের মহামঞ্চ; ইয়াসিন বুনোর যাত্রা আমাদের শেখায়, স্বপ্নের পথ সব সময় পরিকল্পনামতো হয় না। কখনো কখনো জীবন নিজেই আমাদের জন্য আরও বড় এক গল্প লিখে রাখে। আর সেই গল্পের নাম, ইয়াসিন বুনো।


