ছোট্ট শহর কালচিন থেকে জুলিয়ান আলভারেজের বিশ্বজয়ের গল্প

ফুটবলার হওয়ার জন্যই যেন জন্ম

আর্জেন্টিনার কর্দোবা প্রদেশের ছোট্ট শহর কালচিন। মাত্র সাড়ে তিন হাজার মানুষের এই জনপদ থেকেই শুরু হয়েছিল জুলিয়ান আলভারেজের স্বপ্নযাত্রা। ফুটবল ছিল শুধু একটি খেলা নয়, তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা। খুব ছোটবেলা থেকেই আলভারেজের একটাই লক্ষ্য ছিল-একদিন পেশাদার ফুটবলার হওয়া।

অনুশীলন শেষ হওয়ার পরও তার কাজ শেষ হতো না। অন্য শিশুরা যখন বাড়ি ফিরত কিংবা অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ত, আলভারেজ তখন কোচের কাছ থেকে কয়েকটি বল নিয়ে একাই অনুশীলন চালিয়ে যেত। কখনো দুই দিক থেকে আসা ক্রসে শট, কখনো ফ্রি-কিক, পেনাল্টি, হেড কিংবা ড্রিবলিং-সবকিছুই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলন করত সে। তখনও তার বয়স ১০ বছরও হয়নি।

ছোটবেলা থেকেই পেশাদারের মতো মানসিকতা

কালচিনে বেড়ে ওঠা আলভারেজের পরিবার ছিল পরিশ্রমী ও সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত। ফুটবল থেকে কোনো আয় ছিল না, ভবিষ্যতেরও কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। তবু সে এমনভাবে অনুশীলন করত, যেন ইতোমধ্যেই একজন পেশাদার ফুটবলার।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা ভবিষ্যতে কী হতে চাও জানতে চাইলে তার উত্তর কখনো বদলায়নি-‘আমি ফুটবলার হতে চাই।’

দুই বছর বয়স থেকেই বলের সঙ্গে বন্ধুত্ব

মাত্র দুই বছর বয়স থেকেই বড় দুই ভাই আগুস্তিন ও রাফায়েলের সঙ্গে ফুটবল স্কুলে যাওয়া শুরু করেন আলভারেজ। অন্য শিশুরা ক্লান্ত হয়ে পড়লেও বা খেলতে না চাইলে, ছোট্ট জুলিয়ান নিজের চেয়ে বড় একটি বল নিয়ে খেলায় মেতে থাকত।

তার মা মারিয়ানা ছিলেন একটি নার্সারি স্কুলের শিক্ষক এবং বাবা গুস্তাভো প্রথমে কৃষিকাজ, পরে পরিবহন খাতে কাজ করতেন। বাবা-মা ব্যস্ত থাকায় দাদি টিটাই প্রায়ই তিন ভাইকে ফুটবল অনুশীলনে নিয়ে যেতেন।

ফিফা

কোচের ভবিষ্যদ্বাণী

শৈশবের কোচ রাফায়েল ভারাস একদিন মজা করেই বলেছিলেন, ‘এই ছেলেটা একদিন আমাদের সবার মুখ উজ্জ্বল করবে।” পরে সেই কথাই বাস্তবে রূপ নেয়।

চার থেকে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত আলভারেজকে প্রশিক্ষণ দেন ভারাস। তার মতে, এত অল্প বয়সেই আলভারেজের প্রতিভা ছিল অন্যদের থেকে আলাদা। শুধু গোল করাই নয়, খেলার পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতাও ছিল অসাধারণ।

যে ক্লাবকে বদলে দিয়েছে আলভারেজ

শৈশবের ক্লাব ক্লাব আতলেতিকো কালচিন আজ অনেকটাই বদলে গেছে আলভারেজের সাফল্যের কারণে। রিভার প্লেট, ম্যানচেস্টার সিটি ও আতলেতিকো মাদ্রিদে তার দলবদল থেকে পাওয়া প্রশিক্ষণ ক্ষতিপূরণের অর্থ দিয়ে ক্লাবটি আধুনিক ঘাসের মাঠ, স্বয়ংক্রিয় সেচব্যবস্থা ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন করেছে।

ছোটবেলা থেকেই ছিলেন গোলমেশিন

শৈশবের প্রায় প্রতিটি বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন আলভারেজ। ১১-১২ বছর বয়সে একটি ম্যাচে চার গোল করার পর শেষ গোলটি করেছিলেন দুর্দান্ত এক রাবোনা শটে। সেই গোল দেখে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়, দর্শক এবং দুই দলের সমর্থকেরাও দাঁড়িয়ে করতালি দিয়েছিলেন।

ফিফা

বড় ক্লাবের ডাক ফিরিয়ে দিয়েছিল পরিবার

রিভার প্লেট, বোকা জুনিয়র্সসহ একাধিক বড় ক্লাব খুব অল্প বয়সেই আলভারেজকে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু পরিবার তাড়াহুড়া করেনি। তারা চেয়েছিল ছেলে স্বাভাবিক পরিবেশে বড় হোক।

অবশেষে ১৫ বছর বয়সে আলভারেজ নিজেই সিদ্ধান্ত নেন রিভার প্লেটের একাডেমিতে যোগ দেওয়ার। ২০১৮ সালে কোচ মার্সেলো গায়ার্দোর অধীনে প্রথম দলে অভিষেক হয় তার। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন থেকে আর্জেন্টিনার নির্ভরতার প্রতীক

২০২২ সালে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন আলভারেজ। এরপর থেকে তিনি দেশের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ফরোয়ার্ডে পরিণত হয়েছেন।

আজও কালচিনের মানুষ তাকে নিজেদের সবচেয়ে বড় গর্ব বলে মনে করে। শহরের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এখন জুলিয়ান আলভারেজের মতো ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখে।

ফিফা

‘স্পাইডার’ নামের গল্প

শৈশবে বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলার সময়ই আলভারেজের ডাকনাম হয়ে যায় ‘স্পাইডার’। মাঠে তার অবিশ্বাস্য গতি, সর্বত্র উপস্থিতি এবং প্রতিপক্ষকে মুহূর্তেই চাপে ফেলার ক্ষমতার কারণেই এই নাম দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে সেটিই তার পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।

শিকড় ভুলে যাননি আলভারেজ

বিশ্বখ্যাত ফুটবলার হলেও আলভারেজ এখনও নিজের শহরে গেলে খুবই সাধারণভাবে সময় কাটান। বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে নীরবে সময় কাটাতেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

কালচিনের মেয়র ক্লদিও কাওনের বিশ্বাস, ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার পরও একদিন আলভারেজ নিজের জন্মশহরেই ফিরে আসবেন। কারণ, এখানেই তার শৈশব, এখানেই জীবনের প্রথম শিক্ষা, আর এখানেই তার শিকড়।

ছোট্ট একটি শহর থেকে উঠে এসে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ডে পরিণত হওয়া জুলিয়ান আলভারেজ প্রমাণ করেছেন-অদম্য পরিশ্রম, ধৈর্য ও স্বপ্ন থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles