অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্তি ঘটল ইংল্যান্ড টেস্ট ক্রিকেটের বহুল আলোচিত ‘বাজবল’ যুগের। জুলাইয়ের শুরুতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ হারের পর টেস্ট ক্রিকেট থেকে আচমকা অবসর নেন অধিনায়ক বেন স্টোকস। আর তার ঠিক দুই সপ্তাহ পর, গত রবিবার, ৯টি টেস্টের ৭টিতেই পরাজয়ের গ্লানি মাথায় নিয়ে বরখাস্ত হন প্রধান কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালাম।
অধিনায়ক স্টোকস এবং কোচ ম্যাককালামের জুটিতে ইংল্যান্ড ক্রিকেটকে যেমন রোমাঞ্চের চূড়ায় ভাসিয়েছে, তেমনি ভক্ত ও ক্রিকেট পণ্ডিতদের ক্ষোভের কারণও হয়েছে। এই আগ্রাসী খেলার ধরন ক্রিকেট বিশ্বকে দুই ভাগে বিভক্ত করলেও, এটি যে অত্যন্ত স্মরণীয় ছিল তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ম্যাককালামের ৪ বছরের মেয়াদে ‘ব্যাবজল’ যুগের সেই ভালো ও মন্দের সেরা কিছু মুহূর্তের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. বেয়ারস্টোর টর্নেডো ও বাজবল যুগের শুরু (জুন ২০২২)

পূর্ববর্তী ১৭টি টেস্টের মধ্যে মাত্র ১টিতে জয় পাওয়া এক বিধ্বস্ত দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন ম্যাককালাম ও স্টোকস। লর্ডসে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে শুরুটা ভালোই হয়েছিল, কিন্তু ট্রেন্ট ব্রিজের দ্বিতীয় টেস্টেই বোঝা যায় এই দল আসলে কী করতে চায়।
খেলার পঞ্চম দিনে জয়ের জন্য ৭২ ওভারে ইংল্যান্ডের লক্ষ্য ছিল ২৯৯ রান। ৯৩ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে যখন ম্যাচ ড্র হওয়াই একমাত্র নিয়তি মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই ম্যাজিক দেখান জনি বেয়ারস্টো। মাত্র ৭৭ বলে সেঞ্চুরি হাঁকান তিনি (যা গিলবার্ট জেসপের করা ইংল্যান্ডের দ্রুততম টেস্ট সেঞ্চুরির রেকর্ডের চেয়ে মাত্র ১ বল বেশি)। বেয়ারস্টো ৯২ বলে ১৩৬ রান করে আউট হলেও স্টোকস ম্যাচ জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন। ২২ ওভার বাকি থাকতেই অবিশ্বাস্য জয় পায় ইংল্যান্ড।
২. ভারতের বিপক্ষে রেকর্ড রান তাড়া (জুলাই ২০২২)

নিউজিল্যান্ডকে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করার এক মাসের মধ্যেই আরেকটি ইতিহাস গড়ে ইংল্যান্ড। ভারতের বিপক্ষে পুনর্নির্ধারিত পঞ্চম টেস্টে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় ৩৭৮ রান। টেস্ট ইতিহাসে ইংল্যান্ড কখনো এত রান তাড়া করে জেতেনি।
১০৭-০ থেকে আচমকা ১০৯-৩ হয়ে গেলে ম্যাচ কঠিন রূপ নেয়। কিন্তু জো রুট ও জনি বেয়ারস্টোর মধ্যে ২৬৯ রানের এক অবিচ্ছিন্ন মহাকাব্যিক জুটি ম্যাচটি সহজ বানিয়ে দেয়। রুট ১৪২* এবং বেয়ারস্টো ১১৪* (ম্যাচের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি) রানে অপরাজিত থাকেন। প্রতি ওভারে ৫-এর বেশি রান তুলে ২০০৭ সালের পর ইংল্যান্ডের মাটিতে ভারতের প্রথম সিরিজ জয়ের স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দেয় তারা।
৩. রাওয়ালপিন্ডির ঐতিহাসিক জয় (ডিসেম্বর ২০২২)

ম্যাককালামের অধীনে এটিই ছিল প্রথম বিদেশ সফর এবং সম্ভবত সবচেয়ে স্মরণীয়। ১৭ বছর পর পাকিস্তানে খেলতে গিয়ে প্রথম টেস্টের প্রথম দিনেই টেস্ট রেকর্ড ৫০৬-৪ রান তোলে ইংল্যান্ড। দুই ইনিংস মিলিয়ে ১৩৬.৫ ওভারে ৬.৭৩ রান রেটে তারা মোট ৯২১ রান সংগ্রহ করে।
পঞ্চম দিনের শেষ বিকেলে রোমাঞ্চকর এক জয় পায় ইংলিশরা। জেমস অ্যান্ডারসন ও অলি রবিনসন রিভার্স সুইংয়ের জাদুতে ৪টি করে উইকেট নিয়ে পাকিস্তানের প্রতিরোধ ভাঙেন। শেষ উইকেটে নাসিম শাহকে জ্যাক লিচ এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেললে বাঁধভাঙা উল্লাসে মাতে ইংল্যান্ড। পরবর্তীতে ৩-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতে নেয় তারা।
৪. ওয়েলিংটনে মাত্র ১ রানের হৃদয়বিদারক হার (ফেব্রুয়ারি ২০২৩)

১১ টেস্টে ১০ জয় নিয়ে অপ্রতিরোধ্য গতিতে ছুটছিল ব্যাবজল। নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটনে রুট ও হ্যারি ব্রুকের সেঞ্চুরিতে ৪৩৫-৮ রান তুলে কিউইদের ফলো-অন করায় ইংল্যান্ড। কিন্তু কেন উইলিয়ামসনের সেঞ্চুরিতে ঘুরে দাঁড়ায় নিউজিল্যান্ড। জয়ের জন্য ইংল্যান্ডের লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৫৮ রান।
৮০ রানে ৫ উইকেট হারানো দলটিকে টেনে তোলেন রুট ও স্টোকস। কিন্তু তারা ফেরার পর বেন ফোকস জয়ের একদম কাছে নিয়ে গিয়ে আউট হন। শেষ উইকেটে যখন মাত্র ২ রান বাকি, নেইল ওয়াগনারের একটি শর্ট বল অ্যান্ডারসনের গ্লাভস ছুঁয়ে উইকেটকিপারের হাতে চলে যায়। মাত্র ১ রানের এই অবিশ্বাস্য হার টেস্ট ইতিহাসে এক চরম ট্র্যাজেডি হয়ে থাকবে।
৫. অ্যাশেজের বিতর্কিত ডিক্লারেশন বা ইনিংস ঘোষণা (জুন ২০২৩)

বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাবজলের প্রথম অগ্নিপরীক্ষা ছিল ২০২৩ সালের অ্যাশেজ। এজবাস্টনে ম্যাচের প্রথম বলেই প্যাট কামিন্সকে চার মেরে জাক ক্রলি ম্যাচের সুর বেঁধে দিয়েছিলেন। জো রুটের ১১8 রানের ওপর ভর করে প্রথম দিনেই ইংল্যান্ডের রান যখন ৩৯৩-৮, ঠিক তখনই সবাইকে চমকে দিয়ে ইনিংস ঘোষণা (Declare) করেন অধিনায়ক স্টোকস।
উদ্দেশ্য ছিল দিনের শেষভাগে অস্ট্রেলিয়ার উইকেট তুলে নেওয়া। কিন্তু সেই জুয়া কাজে লাগেনি। অস্ট্রেলিয়া কোনো উইকেট না হারিয়ে দিন পার করে এবং শেষ পর্যন্ত রোমাঞ্চকর ম্যাচটি ২ উইকেটে জিতে নেয়। অনেকেই মনে করেন, ওই সময়ে আরও ২০-৩০টি রান করলে ম্যাচের ফল ভিন্ন হতে পারত।
৬. শর্ট বলের ফাঁদ এবং ম্যানচেস্টারের বৃষ্টি (জুলাই ২০২৩)

লর্ডসের দ্বিতীয় টেস্টটি মনে রাখা হবে বেয়ারস্টোর বিতর্কিত স্টাম্পিং এবং লর্ডসের দর্শকদের নজিরবিহীন ক্ষোভের জন্য। তবে প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ড ১৮৮-১ রান নিয়ে দারুণ অবস্থানে থেকেও অস্ট্রেলিয়ার স্পষ্ট পাতা ‘শর্ট বল’ (Short-ball) ফাঁদে পা দিয়ে একে একে উইকেট বিলিয়ে ৩২৫ রানে অলআউট হয়। অস্ট্রেলিয়া ম্যাচটি জিতে ২-০ তে এগিয়ে যায়।
হেডিংলিতে ইংল্যান্ড ঘুরে দাঁড়ানোর পর ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে চতুর্থ টেস্টে জয়ের দ্বারপ্রান্তে ছিল তারা। কিন্তু বৃষ্টির কারণে চতুর্থ দিনে মাত্র ৩০ ওভার খেলা সম্ভব হয় এবং পঞ্চম দিন পুরোপুরি ধুয়ে যায়। ফলে নিশ্চিত জয় হাতছাড়া হয় এবং অস্ট্রেলিয়া অ্যাশেজ নিজেদের কাছে রেখে দেয়।
৭. হায়দরাবাদের রূপকথা (জানুয়ারি ২০২৪)

ম্যাককালামের আমলের সেরা অ্যাওয়ে জয় বলা যায় এটিকে। ভারতের মাটিতে প্রথম ইনিংসে ১৯০ রানে পিছিয়ে পড়ার পর ইংল্যান্ডের হার সময়ের ব্যাপার মনে হচ্ছিল। কিন্তু ওলি পোপ তাঁর জীবনের সেরা ইনিংস খেলে ১৯৬ রান করেন।
জয়ের জন্য ভারতের প্রয়োজন ছিল ২৩১ রান। কিন্তু অভিষিক্ত বাঁহাতি স্পিনার টম হার্টলির ৬২ রানে ৭ উইকেটের অবিশ্বাস্য স্পেলে ভারত মাত্র ২০২ রানে গুটিয়ে যায়। ২৮ রানের এক রূপকথার জয় পায় ইংল্যান্ড। যদিও ভারত পরে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ৪-১ ব্যবধানে সিরিজটি জিতেছিল।
৮. মুলতানে ব্রুকের ট্রিপল সেঞ্চুরি ও ৮০০ রান (অক্টোবর ২০২৪)

ভারতে ভরাডুবির পর পাকিস্তানের মুলতানে আবারও স্বরুপে ফেরে ব্যাবজল। পাকিস্তান প্রথম ইনিংসে ৫৫৬ রান করলেও ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা তার জবাবে ৭ উইকেটে রেকর্ড ৮২৩ রান তোলে (১৯৩৮ সালের পর তাদের সর্বোচ্চ)।
জো রুট ও হ্যারি ব্রুকের মধ্যে ৪৫৪ রানের ঐতিহাসিক জুটি গড়ে ওঠে। রুট করেন ২৬২ রান এবং ব্রুক ৩৪ বছর পর প্রথম ইংলিশ ব্যাটার হিসেবে টেস্টে ট্রিপল সেঞ্চুরি (৩১৭ রান) করার কীর্তি গড়েন। ইংল্যান্ড ম্যাচটি ইনিংস ব্যবধানে জিতলেও, পাকিস্তান পরের দুটি টেস্টে স্পিন ট্র্যাক বানিয়ে সিরিজটি ২-১ ব্যবধানে জিতে নেয়।
৯. ওভালের ক্লাসিক ম্যাচে ভারতের জয় (আগস্ট ২০২৫)

২০২৫ সালে নিউজিল্যান্ড ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ জিতলেও ব্যাবজল নিয়ে সংশয় কাটছিল না। ভারতের বিপক্ষে ঘরের মাঠে ওভালে পঞ্চম টেস্টে জয়ের জন্য ইংল্যান্ডের লক্ষ্য ছিল ৩৭৪ রান। একপর্যায়ে রুট ও ব্রুকের দ্বিশতক ছোঁয়া জুটিতে ইংল্যান্ড ৩০১-৩ রান তুলে জয়ের সুবাস পাচ্ছিল।
কিন্তু ১১১ রান করে ব্রুক একটি আলগা শট খেলে আউট হতেই খেলার মোড় ঘুরে যায়। রুট ১০৫ রান করে ফিরলে ম্যাচ পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকে। শেষ দিনে জয়ের জন্য ৩৫ রান বাকি থাকতে দ্রুত উইকেট হারাতে থাকে ইংল্যান্ড। ক্রিস ওকস ভাঙা হাত নিয়ে স্লিং বেঁধে বীরত্বের সাথে ব্যাট করতে নামলেও মোহাম্মদ সিরাজের তোপে ভারত মাত্র ৬ রানে ম্যাচটি জিতে নেয়।
১০. অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অ্যাশেজ বিপর্যয় (ডিসেম্বর ২০২৫)

বাস্তবে না হলেও, ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে এই সিরিজটিই ‘ব্যাবজল’ যুগের শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছিল। পার্থের প্রথম টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম ইনিংসে ১২৩-৯ রানে আটকে দিয়ে এবং নিজেরা ১০০ রানের লিড নিয়েও মাত্র ২ দিনে ম্যাচটি হেরে যায় ইংল্যান্ড। তাদের দ্বিতীয় ইনিংস ৬৫-১ থেকে মাত্র ৮৮ রানে ধসে পড়ে।
ব্রিসবেনের দিবা-রাত্রির টেস্ট এবং অ্যাডিলেডেও ইংল্যান্ড খড়কুটোর মতো উড়ে যায়। প্যাট কামিন্স ও জশ হ্যাজেলউডের মতো তারকা বোলারদের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও অস্ট্রেলিয়া সহজে অ্যাশেজ পুনরুদ্ধার করে। মেলবোর্নে ১৫ বছর পর সান্ত্বনার এক জয় পেলেও তা ম্যাককালামের চাকরি বাঁচাতে যথেষ্ট ছিল না।
২০২৬ সালের শুরুতে নিউজিল্যান্ডের কাছে হোম সিরিজে ২-১ ব্যবধানে হেরে যাওয়ার পরই ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে ইসিবির। বরখাস্ত করা হয় ম্যাককালামকে। সাদা বলের দায়িত্বে তিনি থেকে গেলেও, টেস্ট ক্রিকেটে বিনোদনের সুনামি আনা ‘ব্যাবজল’ অধ্যায়ের অবসান ঘটল একরাশ হতাশা আর শূন্যতা দিয়ে।


