‘অ্যানিমেলস’, হ্যান্ড অব গড এবং বেকহ্যাম: আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের বৈরিতাপূর্ণ বিশ্বকাপ ইতিহাসের ৬ দশক

ফুটবল বিশ্বের অন্যতম ধ্রুপদী এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এক চিরন্তন দ্বৈরথ, আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড। আগামী বুধবার আটলান্টায় বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে এই দুই পরাশক্তি। একদিকে থ্রি লায়ন্সের লক্ষ্য তাদের দীর্ঘ ৬০ বছরের শিরোপা খরা কাটানো, অন্যদিকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার লক্ষ্য শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা। এই ম্যাচের মাধ্যমে ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক ম্যাচে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন।

১৯৬২ সালে শুরু হওয়া এই ফুটবলীয় দ্বৈরথ কেবল মাঠের লড়াইয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি; ১৯৮০-এর দশকে সংগঠিত ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধ’ দুই দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনাকে চরমে নিয়ে যায়, যার প্রভাব আজো গ্যালারির ফুটবল গীতিতে শোনা যায়। মাঠের লাল কার্ড, অতিমানবীয় গোল আর মহাবিতর্কের এই ছয় দশকের ইতিহাস নিয়ে বিবিসি স্পোর্টসের বিশেষ আয়োজন:

এক নজরে দুই দলের বিশ্বকাপ মুখোমুখি লড়াই

অনেকের জন্য বিস্ময়কর হলেও সত্য, বিশ্বকাপে দুই দলের মোট ৫ বারের দেখায় জয়ের দিক থেকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে ইংল্যান্ড। তবে নকআউটের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে হারানোর স্বাদ তারা বহু বছর পায়নি।

১. ১৯৬২: ইংল্যান্ড ৩-১ আর্জেন্টিনা (গ্রুপ পর্ব, চিলি)

পরবর্তী ম্যাচগুলোর তুলনায় এটি ছিল বেশ শান্ত প্রকৃতির। রন ফ্লাওয়ার্স, ববি চার্লটন এবং জিমি গ্রিভসের গোলে ইংল্যান্ড ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনা এক গোল শোধ করলেও তা সান্ত্বনা মাত্র ছিল। গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে ইংল্যান্ড কোয়ার্টারে যায় এবং পরবর্তীতে ব্রাজিলের কাছে হেরে বিদায় নেয়।

২. ১৯৬৬: ইংল্যান্ড ১-০ আর্জেন্টিনা (কোয়ার্টার ফাইনাল, ইংল্যান্ড)

এই ম্যাচটিকেই দুই দেশের চরম ফুটবলীয় বৈরিতার জন্মসূত্র বলা যায়। আজো আর্জেন্টিনা দাবি করে যে জেফ হার্স্টের করা জয়সূচক গোলটি অফসাইড ছিল এবং তাদের অন্যায়ভাবে হারানো হয়েছে।

ম্যাচের মাত্র ৩৩ মিনিটে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনকে জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রাইটলাইন বহিষ্কার করলে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়। রাত্তিন মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে প্রায় ৮ মিনিট খেলা বন্ধ থাকে। মাঠ ছাড়ার সময় তিনি ব্রিটিশ রাণীর লাল কার্পেটে বসে পড়েন এবং কর্নার ফ্ল্যাগের ব্রিটিশ পতাকায় (ইউনিয়ন জ্যাক) হাত দেন।

ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের তৎকালীন কোচ আলফ রামসে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের ‘অ্যানিমেলস’ (পশু) বলে অভিহিত করেন এবং তাঁর খেলোয়াড়দের জার্সি বদল করতে নিষেধ করেন। এই ম্যাচের বিতর্কের সূত্র ধরেই পরবর্তীতে ১৯৭০ বিশ্বকাপে ফিফা প্রথমবারের মতো হলুদ ও লাল কার্ড প্রথা চালু করে। (উল্লেখ্য, কিংবদন্তি রাত্তিন গত শনিবার ৮৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন)।

৩. ১৯৮৬: আর্জেন্টিনা ২-১ ইংল্যান্ড (কোয়ার্টার ফাইনাল, মেক্সিকো)

ফকল্যান্ড যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর অনুষ্ঠিত এই ম্যাচটি কেবল ফুটবল ছিল না, ছিল জাতীয়তাবাদী আবেগের চরম বহিঃপ্রকাশ। এই ম্যাচেই ফুটবল বিশ্ব প্রত্যক্ষ করে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ (Hand of God) গোল, যেখানে তিনি ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে ফাঁকি দিয়ে হাত দিয়ে বল জালে পাঠান।

এর ঠিক ৪ মিনিট পর ম্যারাডোনা মাঝমাঠ থেকে একক নৈপুণ্যে ইংল্যান্ডের অর্ধেক দলকে ড্রিবলিংয়ে পরাস্ত করে শতাব্দীর সেরা গোলটি করেন। গ্যারি লিনেকার শেষ মুহূর্তে ইংল্যান্ডের হয়ে একটি গোল শোধ করলেও ম্যারাডোনার জাদুতে আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে যায় এবং পরবর্তীতে বিশ্বকাপ জেতে। ২০০৫ সালের আগে ম্যারাডোনা এই হ্যান্ড অব গড গোলের জন্য ক্ষমা চাননি, যা পিটার শিলটন আজো ক্ষমার অযোগ্য বলে মনে করেন।

৪. ১৯৯৮: আর্জেন্টিনা ২-২ ইংল্যান্ড (টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে আর্জেন্টিনা জয়ী) (শেষ ১৬, ফ্রান্স)

এই ম্যাচটি ডেভিড বেকহ্যামের ক্যারিয়ারের এক কালো অধ্যায়। আর্জেন্টিনার ডিয়েগো সিমিওনেকে লাথি মারার অপরাধে বেকহ্যাম লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। এর আগে গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা ও অ্যালান শিয়ারের পেনাল্টি গোলের পর মাইকেল ওয়েন এক দুর্দান্ত একক দৌড়ে গোল করে ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে নিয়েছিলেন। বিরতির ঠিক আগে হাভিয়ের জানেত্তি আর্জেন্টিনার হয়ে সমতা ফেরান।

১০ জনের দল নিয়ে ইংল্যান্ড বীরত্বের সাথে লড়াই করে এবং সল ক্যাম্পবেলের একটি গোল ফাউলের অজুহাতে বাতিল হয়। অবশেষে টাইব্রেকারে ডেভিড ব্যাটি ও পল ইন্সের পেনাল্টি মিসের কারণে ইংল্যান্ড বিদায় নেয়। এক বছর পর সিমিওনে স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি রেফারিকে ফাঁদে ফেলতে অভিনয় করেছিলেন, যার কারণে হলুদ কার্ডটি লাল কার্ডে রূপ নেয়।

৫. ২০০২: আর্জেন্টিনা ০-১ ইংল্যান্ড (গ্রুপ পর্ব, জাপান)

এই ম্যাচটি ছিল ডেভিড বেকহ্যামের জন্য ‘প্রায়শ্চিত্ত ও প্রতিশোধের’। সাপোরো ডোম স্টেডিয়ামে মাউরিসিও পোচেত্তিনো বক্সের ভেতর মাইকেল ওয়েনকে ফাউল করলে পেনাল্টি পায় ইংল্যান্ড। ৪৪ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে বেকহ্যাম চার বছর আগের অপমানের প্রতিশোধ নেন। এই হারের ফলে আর্জেন্টিনা ১৯৬২ সালের পর প্রথমবারের মতো গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়, আর ইংল্যান্ড কোয়ার্টার ফাইনালে গিয়ে ব্রাজিলের কাছে পরাজিত হয়।

২০২৬: নতুন প্রজন্মের সামনে নতুন ইতিহাস

২০০২ সালের পর দীর্ঘ ২৪ বছর বিশ্বকাপে আর দেখা হয়নি এই দুই দলের। ফলে দুই দেশের বর্তমান তরুণ প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহাসিক বৈরিতার তীব্রতা কিছুটা অজানা। তবে চলতি বিশ্বকাপে টমাস টুখেলের ‘লড়াকু’ ইংল্যান্ড এবং লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার এই সেমিফাইনাল ম্যাচটি পুরোনো সব ইতিহাস, বিতর্ক আর আবেগকে আবারও ফুটবল মাঠের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। বুধবার আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে ফুটবল বিশ্ব আরও একটি মহাকাব্যিক লড়াইয়ের অপেক্ষায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles