ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদার লড়াই
বিশ্বকাপ জিতেছেন লামিনে ইয়ামাল-কিন্তু গোল্ডেন বলের দৌড়ে হ্যারি কেইনকে টপকে যাওয়ার মতো কি যথেষ্ট করেছেন স্পেনের এই কিশোর সুপারস্টার? তার অর্জন কি বলে? অথবা ৩৯ বছর বয়সী মেসি কি এই দৌড়ে থাকবেন তা নিয়েই পরিসংখ্যানের আলোকে দেখবো “ব্যালন ডি’অর রেসে কে এগিয়ে” ।

১৯৫৬ সাল থেকে চলে আসা ব্যালন ডি’অর ২০২০ সালে মাত্র একবার দেয়া হয়নি তাছাড়া প্রতিবারই দেয়া হয়েছে। লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর (মেসি ৮বার রোনালদো ৫বার জয়ী) দীর্ঘদিনের আধিপত্যের যুগ যেন এখন অতীতের পাতায় চলে যাচ্ছে। ফলে গত প্রায় ২০ বছরের মধ্যে ব্যালন ডি’অরের লড়াই এবারই সবচেয়ে উন্মুক্ত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মনে হচ্ছে। এখন অসংখ্য খেলোয়াড় প্রতিটি মৌসুম শুরু করেন এই বিশ্বাস নিয়ে যে, ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কারটি জেতার সুযোগ তাদেরও রয়েছে।
চোট ও ধারাবাহিকতার অভাবে ভোগা ক্যারিয়ারের পর উসমান দেম্বেলে ২০২৫ সালে ব্যালন ডি’অরের গোল্ডেন বল জিতে আলোচনায় উঠে এসেছিলেন। ২০২৬ সালে তিনিও আছেন সম্ভাব্য বিজয়ীদের দীর্ঘ তালিকায়।
এবার ব্যালন ডি’অরের লড়াইয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের পারফরম্যান্স বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এবার যেহেতু বিশ্বকাপের বছর, তাই উত্তর আমেরিকায় গ্রীষ্মে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সও চূড়ান্ত ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এ ছাড়া আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের পারফরম্যান্সও বিবেচনায় নেওয়া হবে। ফলে এমন কিছু খেলোয়াড়ও থাকতে পারেন, যারা শুধু ক্লাবের হয়েই দুর্দান্ত পারফর্ম করেননি, বরং মৌসুম জুড়ে দুটি বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টেও নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন।
ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতির নাম ব্যালন ডি’অর, যার কারণে ব্যক্তিগত দুর্দান্ত মৌসুম কাটানো খেলোয়াড়কেই দেয়া হয় এই পুরস্কার। গত নয় মাস ধরে GOAL-এর ব্যালন ডি’অর পাওয়ার র্যাঙ্কিংয়ে ২০২৬ সালের গোল্ডেন বল জয়ের যেসব সম্ভাব্য প্রার্থীদের ওপর নজর রাখা হয়েছে। ২৬ অক্টোবর লন্ডনে অনুষ্ঠিতব্য পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে কে সবচেয়ে সম্ভাব্যভাবে মঞ্চের শীর্ষে উঠতে পারেন, সেই তালিকাই তুলে ধরা হলো।

১. হ্যারি কেইন: ইংল্যান্ড দলের নাম্বার ৯ এই খেলোয়াড় ২০২৫-২৬ মৌসুমে এখন পর্যন্ত ৭৩ গোল করেছেন এবং ৮টি অ্যাসিস্ট করেছেন। ক্লাব ফুটবলে তিনি খেলেন জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে। তিনি এই মৌসুমে জিতেছেন বুন্দেস লিগা, ডিএফবি-পোকাল ও ডিএফএল সুপার কাপ। তাছাড়া ২০২৬ বিশ্বকাপে তিনি নিজে ৬টি গোল করেছেন ও ১টি অ্যসিস্ট করে ইংল্যান্ডকে সেমিফাইনাল তুলেছেন কিছু ম্যাচে তিনি বেশ অবদান রেখেছেন এককভাবে মোট ৭৩২ মিনিট বিশ্বকাপের মাঠে খেলেছেন। যার কারণে তিনি তালিকার নাম্বার ওয়ানে রয়েছেন তার ধারাবাহিকতার জন্য।
২. লামিনে ইয়ামাল: ইয়ামাল গত ব্যালন ডি’অর জিততে জিততে হেরে যান দেম্বেলের কাছে ২য় হয়ে। তবে এবার তার নামের জোরালো দাবি আছে তিনি নিজে বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য দলের জয়ে অবদান রেখেছেন নিজে একটি গোল করে ৬৯৭ মিনিট মাঠে খেলেছেন। চলতি মৌসুমে তিনি ২৬ গোল করেছেন আর ২১টি গোলে সহায়তা করেছেন। বিশ্বকাপের পাশাপাশি জিতেছেন বার্সার হয়ে লা লিগা ও স্প্যানিশ সুপার কাপ। তার বয়স ১৯ বছর তিনি যদি এবার জিতেন তাহলে ২১ বছরের কম বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে প্রথম ব্যালন ডি’অর জেতার কৃতিত্ব পাবেন। তবে ফুটবল বিশ্লেয়কদের মতে তাকে বড় ম্যাচে আরো বেশী গভীর অবদান রাখতে হবে। অন্যদিকে ইয়ামালের চোট সমস্যাও থাকে মাঝে মধ্যে ইনজুরিতে ভোগায়। সব কিছু পেছনে ফেলে তিনি যদি জয় লাভ করেন তাহলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবেনা।
৩. লিওনেল মেসি: মেসিই সর্বোচ্চ ৮ বার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন তার পরেই আছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। তবে এবারও মেসির নাম আলোচনায় আসবে কারণ বিশ্বকাপে তিনি আর্জেন্টিনাকে টানা ২য় বার ফাইনালে তুলেছেন, নিজে বিশ্বকাপে ৮ গোল করেছেন ৪টি গোলে সহায়তা করেছেন আবার দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এছাড়া মৌসুমে ৪৪ গোল ও ৩০টি গোলে সহায়তা করেছেন বিশ্বকাপে তিনি মোট ৮৫৩ মিনিট মাঠে ছিলেন। তাছাড়া ইন্টার মায়ামির হয়ে তিনি এমএলএস কাপ জিতেছেন। অনেকেই ভাবছিলেন মেসি অধ্যায় মনে হয় শেষ কিন্তু ৩৯ বছর বয়েসে তিনি যেভাবে বিশ্বকাপে পারফর্ম করেছেন তা সত্যিই অসাধারন। মায়ামির হয়ে ২য় বার তিনি এমএলএস ও এমভিসি পুরস্কার জেতানোর পথে। মায়ামির সর্বশেষ প্লে অফের ৬ ম্যাচে ৬ গোল ও ৭টি অ্যসিস্ট করেছেন যা তাকে অনেকটাই পুরস্কারে জন্য রেসে রেখেছে।
৪. মাইকেল ওলিসে: জার্মানির ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখের ফ্রান্সের এই তারকা চলতি মৌসুমে ২৬ গোল করেছেন ও ৪১টি গোলে সহায়তা করেছেন। ওলিসে তার ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন ক্রিস্টাল প্যালেসের হয়ে তবে মিউনিখে তার ২ বছর হয়ে গেছে। ইতি মধ্যেই তিনি বুন্দেস লিগা, ডিএফবি-পোকাল ও ডিএফএল সপার কাপ জিতেছেন ক্লাবের হয়ে। ২৪ বছর বয়সী ওলিসে গোল করা ও গোল করাতে বেশ পটু। চ্যাম্পিয়ন্স লীগের কোয়ার্টার ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে নজর কাড়া খেলা দেখিয়ে রিয়ালের রক্ষন ভাগ নাস্তানাবুদ করে ফিরতি লেগে গোল করে দলকে জিতিয়েছিলেন। সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপে তিনি ৭টি অ্যাসিস্ট করে ফ্রান্সকে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তুলতে সহায়তা করেছন। তার সৃজনশীলতা ও নিখঁত পাস তাকে এই রেসে রাখার অন্যতম কারণ।
৫. কিলিয়ান এমবাপ্পে: বাপ্পে পিএসজি থেকে রিয়াল মাদ্রিদে পাড়ি জমিয়ে চমকের পর চমক দেখিয়ে চলেছেন। ২০২২ বিশ্বকাপের মত এবারও বিশ্বকাপের গোল্ডন বুটটা নিজের করে নিয়েছেন ১০টি গোল আর ৪টি অ্যাসিস্ট করে। ফ্রান্সকে তুলেছিলেন বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। ২০২৫/২৬ মৌসুমে তিনি এখন পর্যন্ত ৫৮ গোল ও ১৪টি গোল অ্যাসিস্ট করেছেন। মোনাকোর হয়ে কিশোর বয়সে ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু করা এমবাপ্পে ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ জিতলেও হবে হবে করতে করতে এখনও ব্যালন ডি’অর টা স্পর্শ করা হয়নি। ২৭ বছর বয়সী বাপ্পে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত গতির ওয়াইল্ড ফিনিশার হিসেবে বেশ খ্যাত। বিশ্বকাপের ৭ ম্যাচে তিনি মোট ৭৬৯ মিনিট মাঠে খেলেছেন। অনেক সময় ওয়ান ম্যান আর্মি হয়ে রিয়াল মাদ্রিদকে তিনি জয়ের বন্দরে নোঙ্গর করিয়েছেন। তাই ব্যালন ডি’অরের তালিকায় তার নামটা রাখতেই হচ্ছে।
এছাড়া ব্যালন ডি’অরের লম্বা রেসে যে নামগুলো রয়েছে তার মধ্যে স্পেনের সদ্য বিশ্বকাপ জেতানো অধিনায়ক রদ্রি ও গত আসরের উসমান দেম্বেলে এবং নরওয়ের আর্লিং হালান্ডের নাম উল্লেখযোগ্য।
ব্যালন ডি’অর (Ballon d’Or) মূলত একজন ফুটবলারের এক ক্যালেন্ডার ইয়ারের সামগ্রিক ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স, দলের সাফল্যে অবদান এবং ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তিতে দেওয়া হয়। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স; গোল, অ্যাসিস্ট, ধারাবাহিকতা, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে পারফরম্যান্স ও ম্যাচে খেলার প্রভাব, দলের সাফল্য- ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে জেতা বড় শিরোপা এবং সেই সাফল্যে খেলোয়াড়ের অবদান। ফেয়ার প্লে ও খেলোয়াড়সুলভ আচরণ- মাঠে পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও স্পোর্টসম্যানশিপ সবগুলো বিবেচনা করে দেয়া হয়।
সহজভাবে বললে: একজন খেলোয়াড় অনেক গোল করলেই ব্যালন ডি’অর জিতবে-এমন নয়। তার ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স + বড় ম্যাচে প্রভাব + দলীয় ট্রফি + সামগ্রিক মৌসুম-সবকিছু বিবেচনা করা হয়।


