ফুটবল মাঠে লিওনেল মেসির পায়ের জাদু নিয়ে গল্পের শেষ নেই। অসংখ্য যাদুকরী মূহুর্ত, অসংখ্য গোল, রেকর্ড আর শিরোপায় তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন কিংবদন্তিদের কাতারে। কিন্তু মাঠের বাইরের মেসিও যেন আরেক বিস্ময়। সেখানে তিনি গোল করেন না, গোল করার সুযোগও নেই, তবে ঠিকই জয় করে নেন মানুষের হৃদয়। ট্রফি দুই হাতে উঁচু করে ধরার সুযোগ নেই, তবে আছে মানুষের হৃদয়ের সিংহাসনে আসীন হওয়ার। এখন সেই কাজটিই করে চলেছেন লিওনেল মেসি।
স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমাঞ্চল সিয়েরা ওয়েস্তে ভয়াবহ দাবানলে ক্ষতবিক্ষত। আগুনে পুড়ে গেছে বিস্তীর্ণ বনভূমি, ধ্বংস হয়েছে অসংখ্য বাড়িঘর, নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন শত শত মানুষ। এমন দুঃসময়ে আবারও মানবতার হাত বাড়িয়ে দিলেন আর্জেন্টাইন তারকা লিওনেল মেসি।
মাদ্রিদ অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট ইসাবেল দিয়াজ আয়ুসো জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পুনর্গঠনের জন্য মেসি ৮০ হাজার ইউরো অনুদান দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি লেখেন, ‘লিও মেসি সিয়েরা ওয়েস্তে পুনর্গঠনের জন্য ৮০ হাজার ইউরো দান করেছেন। আমি তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। মাদ্রিদের মানুষ আশা করছে, খুব শিগগিরই তাঁকে স্বাগত জানাতে পারবে এবং তাঁর প্রাপ্য সম্মান জানাতে পারবে।’
সংখ্যার হিসাবে ৮০ হাজার ইউরো হয়তো শুধু একটি অঙ্ক। কিন্তু যাঁরা আগুনে হারিয়েছেন নিজের ঘর, শৈশবের স্মৃতি কিংবা জীবনের সঞ্চয়, তাঁদের কাছে এটি নতুন করে বেঁচে ওঠার এক টুকরো আশা।
মেসির মানবিকতার গল্প অবশ্য আজকের নয়। ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত লিও মেসি ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অসহায় শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও খেলাধুলার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। অসংখ্য শিশুর চিকিৎসা ব্যয় বহন, হাসপাতালের উন্নয়ন, শিক্ষাবৃত্তি এবং ক্রীড়া সুবিধা তৈরিতে তাঁর ফাউন্ডেশনের অবদান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
করোনা মহামারির সময়ও মেসি নীরবে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন। আর্জেন্টিনা ও স্পেনের হাসপাতালগুলোর জন্য অর্থ সহায়তা দিয়েছেন, চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনায় সহযোগিতা করেছেন। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবেও বিশ্বের বিভিন্ন মানবিক সংকটে বারবার সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন তিনি। যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা শিশুস্বাস্থ্যের সংকট- যেখানেই মানুষের কান্না, সেখানেই কোনো না কোনোভাবে পৌঁছে গেছে তাঁর সহায়তার স্পর্শ।

মেসির এই মানবিক উদ্যোগের বিশেষত্ব হলো, তিনি প্রচারের আলোয় নয়, কাজের মধ্য দিয়েই নিজের অবস্থান জানান দেন। মাঠে গোল করার পর যেমন সতীর্থদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেন, তেমনি মাঠের বাইরেও মানুষের কষ্টকে নিজের দায়িত্বের অংশ বলে মনে করেন।
ফুটবল ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তিই জন্ম নিয়েছেন। কেউ স্মরণীয় হয়েছেন গোলের জন্য, কেউ শিরোপার জন্য। কিন্তু খুব কম মানুষই আছেন, যাঁরা একই সঙ্গে ক্রীড়াবিদ এবং মানবতার দূত হয়ে উঠতে পেরেছেন। লিওনেল মেসি সেই বিরলদের একজন।
দাবানলে পোড়া সিয়েরা ওয়েস্তে একদিন হয়তো আবার সবুজে ফিরে আসবে। নতুন ঘর উঠবে, শিশুরা আবার খেলবে খোলা মাঠে। সেই পুনর্জাগরণের গল্পে হয়তো একটি নাম নীরবে লেখা থাকবে তাদের হৃদয়ে-লিওনেল মেসি। কারণ কিছু মানুষ শুধু মাঠে জয় এনে দেন না, মানুষের ভেঙে যাওয়া মনেও জ্বালিয়ে দেন নতুন জীবনের আলো। আর সেই আলোই তাঁদের প্রকৃত মহত্ত্বের পরিচয় বহন করে।


