সবুজ গালিচায় যখন তিনি বল পায়ে ছোটেন, গ্যালারির হাজারো দর্শকের হৃদস্পন্দন তখন যেন এক লহমায় থমকে যায়। মরক্কোর ফুটবল ইতিহাসে কত শত রূপকথা লেখা হয়েছে, কিন্তু ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে এসে সেই রূপকথার পাতায় সম্পূর্ণ নতুন এক অধ্যায় যোগ করছেন চব্বিশ বছর বয়সী এক তরুণ ইসমাইল সাইবারি – মরক্কোর নতুন ‘হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা’। ব্যাক-টু-ব্যাক বা টানা দুই ম্যাচে গোল করে এই মুহূর্তে বিশ্বমঞ্চে মরক্কোর সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনে পরিণত হয়েছেন পিএসভি আইন্দহোভেনের এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার।
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের বয়স তখন মোটে দুই মিনিট। দর্শকরা ঠিকঠাক আসন গ্রহণ করার আগেই গগনবিদারী উল্লাসে ফেটে পড়ল মরক্কোর সমর্থক গোষ্ঠী। ব্রাহিম দিয়াজের বাড়িয়ে দেওয়া আলতো চিপ পাসটি যখন স্কটিশ রক্ষণ ভাগকে ফাঁকি দিয়ে বাতাসে ভাসছিল, সাইবারি তখন চিতার গতিতে ছুটে এলেন। এরপর বাঁ পায়ের এক বুলেটের মতো অপ্রতিরোধ্য শটে বল জড়িয়ে দিলেন জালের ঠিক ওপরের অংশে। বোস্টন স্টেডিয়ামের আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ধারাভাষ্যকার চিৎকার করে উঠলেন, “অপ্রতিরোধ্য! অবিশ্বাস্য সাইবারি!
এটি কেবল একটি গোল ছিল না, এটি ছিল বিশ্বমঞ্চে এক নতুন তারকার রাজকীয় আগমনী বার্তা। এর আগের ম্যাচেও দলের জয়ে অবদান রেখেছিলেন ঠিক একইভাবে। টানা দুই ম্যাচে গোল করে তিনি প্রমাণ করলেন, মরক্কোর কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলার সাফল্য কোনো ফ্লুক বা ভাগ্যের জোর ছিল না; বরং সাইবারিদের মতো প্রতিভারা সেই সোনালী মশালকে আরও উঁচুতে তুলে ধরার জন্য তৈরি হয়েই এসেছেন।
কঠিন পথ পেরিয়ে স্বপ্নের আঙিনায়
সাইবারির এই পথচলাটা মোটেও সহজ ছিল না। মরক্কো বংশোদ্ভূত এই তরুণের জন্ম স্পেনে, ফুটবলের হাতেখড়ি বেলজিয়ামে। কিন্তু যখনই দেশের হয়ে খেলার ডাক এসেছে, হৃদয়ের টানে বেছে নিয়েছেন পৈতৃক ভিটে মরক্কোকেই। ২০২৩ সালে মরক্কোর অনূর্ধ্ব-২৩ দলকে আফ্রিকান কাপ অব নেশনস জেতাতে রেখেছিলেন মূখ্য ভূমিকা। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আজ তিনি খেলছেন ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে।
মাঠে সাইবারির খেলা দেখা এক পরম তৃপ্তি। তিনি যখন খেলেন, মনে হয় ফুটবল পায়ে কোনো এক জাদুকর ক্যানভাসে ছবি আঁকছেন। গতি, ড্রিবলিং আর নিখুঁত ফিনিশিংয়ের এক অপূর্ব মিশ্রণ রয়েছে তাঁর মাঝে। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে তাঁর প্রতিটি টাচ, প্রতিটি পাস মরক্কোর আক্রমণভাগকে এক অন্য মাত্রা দিচ্ছিল।
সমর্থকদের নয়নমণি
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে গ্যালারির গন্ডি, সবখানেই এখন শুধু সাইবারি-বন্দনা। মরক্কোর সমর্থকরা তাকে নিয়ে স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছেন। ম্যাচ শেষে এক আবেগাপ্লুত সমর্থক বলেন, “আমাদের হাকিমি আছে, দিয়াজ আছে, কিন্তু সাইবারি আমাদের জন্য এক অদ্ভুত ভরসার নাম। যখনই দল চাপে পড়ে, এই ছেলেটি জাদুকরের মতো গোল করে আমাদের মুখে হাসি ফোটায়।
মরক্কোর ‘অ্যাটলাস লায়নস’ বা অ্যাটলাস সিংহরা কেন আজ বিশ্ব র্যাংকিংয়ের ৬ নম্বরে রয়েছে, সাইবারি মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে প্রতি মুহূর্তে তা প্রমাণ করছেন। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের টিকিট নিশ্চিত করার লড়াইয়ে সাইবারির এই ফর্ম মরক্কো দলকে দেখাচ্ছে আরও বড় কোনো স্বপ্ন দেখার সাহস।
টানা দুই ম্যাচে গোল করে সাইবারি হয়তো কেবল খবরের শিরোনাম হয়েছেন, কিন্তু তাঁর এই লড়াকু মানসিকতা এবং দেশের প্রতি ভালোবাসা কোটি ফুটবল প্রেমীর হৃদয়ে আজ পাকাপোক্ত জায়গা করে নিয়েছে। মরক্কোর ফুটবলের এই নতুন বরপুত্র কতদূর যান, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় পুরো ফুটবল বিশ্ব।
