তৃতীয় স্তরে হামজার ক্লাব
এক দশক আগে রূপকথার মতো এক গল্প লিখেছিল লেস্টার সিটি। ৫,০০০-১ অসম্ভব বাজির বিপরীতে দাঁড়িয়ে তারা জিতেছিল ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা। অথচ সেই ক্লাবই এখন এক ভয়াবহ পতনের সাক্ষী। আগামী মৌসুমে তাদের খেলতে হবে ইংল্যান্ডের তৃতীয় স্তরের লিগ, “লিগ-ওয়ানে”। আসুন জেনে নেওয়া যাক , লেস্টার সিটির অবনমন এর গল্প ।
তাদের এই অবনমন নিশ্চিত হয় মঙ্গলবার হাল সিটির বিপক্ষে ২-২ ড্রয়ের মধ্য দিয়ে। মূলত ২০২১ সালে এফএ কাপের শিরোপা জয়ের পরই ধীরে ধীরে অধঃপতনের দিকে যেতে থাকে ফক্সেসরা। সব মিলিয়ে, গত এক দশকে ক্লাবটি যেমন সাফল্যের চূড়ায় উঠেছে, তেমনি ভয়াবহ ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়েও গেছে।
২০১৮ সালে ক্লাবটির মালিক ভিচাই শ্রীবদ্ধনপ্রভা হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার ঘটনা ক্লাবটির জন্য এক বিশাল ধাক্কা ছিল। তার নেতৃত্বেই ২০১০ সালে মাত্র ৩৯ মিলিয়ন পাউন্ডে ক্লাবটি কেনা হয়, ঋণমুক্ত করা হয় এবং চার বছরের মধ্যে প্রিমিয়ার লিগে উন্নীত করা হয়। ২০১৫-১৬ মৌসুমে তাদের শিরোপা জয় ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা কাহিনি হিসেবে বিবেচিত।
পরবর্তীতে তার ছেলে আইয়াবাত শ্রীবদ্ধনপ্রভা ক্লাবের দায়িত্ব নেন। তবে সেই সময় থেকেই ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা হারাতে থাকে দলটি। কোচ ব্রেন্ডন রজার্স এর অধীনে ২০২২ সালে প্রিমিয়ার লিগে অষ্টম স্থান অর্জন এবং ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় ভালো পারফরম্যান্স সত্ত্বেও ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্ক করেছিলেন তিনি।
কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব পড়ে ক্লাব মালিকানাধীন কোম্পানি কিং পাওয়ার এর ওপর। যা আর্থিকভাবে ক্লাবকে দুর্বল করে তোলে। বিনিয়োগ কমে যায়, এবং ২০২২-২৩ মৌসুমে খারাপ শুরু হলে রজার্স ক্লাবের লক্ষ্য কমিয়ে অন্তত ৪০ পয়েন্টে পৌঁছানোর কথা বলেন। এক সময় যারা ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় নিয়মিত জায়গা পাওয়ার স্বপ্ন দেখত, তারা তখন টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমে পড়ে।

পরিকল্পনার অভাব ও দুর্বল দলে লেস্টারের পতন – শেষ পর্যন্ত বরখাস্ত রজার্স
রজার্সের সময়েই তারা চেলসিকে হারিয়ে এফএ কাপ জেতে, যেখানে প্রতিপক্ষ কোচ ছিলেন টমাস টুখেল। কিন্তু মানসম্পন্ন খেলোয়াড় না কেনা এবং পরিকল্পনার অভাবে দলটি দ্রুত পিছিয়ে পড়ে লেস্টার। ২০২৩ সালের এপ্রিলে যখন রজার্সকে বরখাস্ত করা হয়, তখন দলটি অবনমনের ঝুঁকিতে ছিল।
এরপর কোচ পরিবর্তনের এক অন্তহীন চক্র শুরু হয়। ডিন স্মিথ দলকে রেলিগেশনের হাত থেকে বাঁচাতে ব্যর্থ হন। এরপর এনজো মারেসকা ২০২৪ সালে চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা জেতালেও ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি। পরে একে একে স্টিভ কুপার, রুড ভ্যান নিস্তেলরয় এবং মার্তি সিফুয়েন্তেস এসেছেন। কিন্তু এদের কেউই দলে স্থায়ীত্ব আনতে পারেননি।
পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় যখন সিফুয়েন্তেসকে মাঝমৌসুমে বরখাস্ত করা হয়, যদিও তখন দলটি ১৪তম স্থানে ছিল। পরে গ্যারি রোয়েট দায়িত্ব নিলেও ফলাফল আরও খারাপ হয়। উপরন্তু, আর্থিক নিয়ম ভঙ্গের দায়ে ৬ পয়েন্ট কাটা পড়ায় দলটি অবনমন অঞ্চলে নেমে যায়।
আত্মতুষ্টির সংস্কৃতি ও পারফরম্যান্সে ধস – লেস্টারের অবনমনের ইঙ্গিত
দলের ভেতরে ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’ এমন এক আত্মতুষ্টির সংস্কৃতি ছিল বলে জানা গেছে, যা ২০২৩ সালের প্রিমিয়ার লিগ থেকে অবনমনের সময়ও দেখা গিয়েছিল। খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ক্লাবটি খেলোয়াড় হ্যারি উইঙ্কস এর সঙ্গে সমর্থকদের বিরোধ পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দেয়।
একসময় দলের শক্তি ছিলেন জ্যামি ভার্ডি, জেমস মেডিসন ও ইউরি টিলেমান্স এর তারকারা। কিন্তু এখন দলটি আর্থিক সংকটে জর্জরিত। ২০২৪-২৫ মৌসুমে ক্লাবটি প্রায় ৭১.১ মিলিয়ন পাউন্ড লোকসান দেখিয়েছে। এর আগে আর্থিক সীমা অতিক্রম করায় ৬ পয়েন্ট কাটা হয়।
বেতন কাঠামোও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েক মৌসুম ধরে ক্লাবটি আয়ের চেয়েও বেশি বেতন দিয়েছে। যদিও অবনমনের পর কিছু বেতন কমেছে, তবুও অনেক খেলোয়াড় এখনো উচ্চ বেতনে রয়েছেন, যা লীগ ওয়ানের জন্য অস্বাভাবিক।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া ভিত্তিক ম্যাককোয়ারি গ্রুপ থেকে নেওয়া ঋণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ভবিষ্যৎ আয়ের বিপরীতে অগ্রিম অর্থ নেওয়ার ফলে সামনে আর্থিক সংকট আরও বাড়তে পারে।
আগামী মৌসুম থেকে লীগ ওয়ানে ব্যয়ের ওপর কড়াকড়ি নিয়ম কার্যকর হবে, যেখানে ক্লাবগুলো তাদের অতিরিক্ত আয়ের মাত্র ৬০% খেলোয়াড় খাতে ব্যয় করতে পারবে। এই পরিস্থিতিতে লেস্টারের জন্য দল গঠন ও আর্থিক ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
সব মিলিয়ে, এক সময়ের স্বপ্নের দল এখন বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষায়। লেস্টার সিটির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, তারা কি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, নাকি এই পতন আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে?
স্কোর কার্ড
বিশ্বকাপ ২০২৩




















