বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির আরও এক রেকর্ড ! সাধারণত ফুটবল মাঠের গ্যালারির হাজারো জোড়া চোখ নিবদ্ধ থাকে সবুজ মাঠে চড়ে বেড়ানো ২২ খেলোয়াড়কে ঘিরে। তাদের মাঝেই প্রিয় খেলোয়াড়কে খুঁজে বেড়ায়। ক্যামেরার ফোকাসও খুঁজে ফেরে বলের গতিপথ। কিন্তু ফুটবল বিশ্বকাপের ‘জে’ গ্রুপের আর্জেন্টিনা বনাম জর্ডান ম্যাচে ড্যালাস স্টেডিয়াম দেখল এক পরম বিস্ময়! দেখলো মেসির রেকর্ড।
সেদিন দর্শক কিংবা ক্যামেরার লেন্স-কারও মনই মাঠে টিকছিল না। দর্শকের চোখ তো আর কোনো নিয়মের ফ্রেমে বাঁধা নয়, তাই তারা বারবার ফিরে তাকাচ্ছিলেন মাঠের বাইরে, ডাগআউটের দিকে। এমনকি পেশাদার চক্ষুলজ্জা ভুলে সম্প্রচারকারী ক্যামেরাও সম্মোহিতের মতো বারবার খুঁজে নিচ্ছিল মাঠের বাইরের এক চিলতে দৃশ্য। সেখানে আর কেউ নন, সাধারণের পোশাকে বসে ছিলেন খোদ ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি।
একাদশে ছিলেন না মেসি
আগের দুই ম্যাচ জিতে আলবিসেলেস্তেরা আগেই নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে ফেলায় কোচ লিওনেল স্ক্যালোনি তাঁর সেরা অস্ত্রকে বিশ্রামে রেখেছিলেন। কিন্তু ড্যালাসের তপ্ত গ্যালারি কি আর মেসির জাদু ছাড়া শান্ত থাকে? বাতাসে তখন একটাই গুঞ্জন- ‘মেসি কি আজ নামবেন না? অবশেষে কোটি ভক্তের সেই আকুল প্রার্থনা পৌঁছাল কোচের কানে। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে যখন মেসি গা গরম করতে লাইনের পাশে দাঁড়ালেন, ড্যালাস স্টেডিয়ামের গ্যালারি যেন এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতো গর্জে উঠল। এক অবর্ণনীয় হর্ষধ্বনিতে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তারা বরণ করে নিল ফুটবল রাজপুত্রকে।

মেসিও তাঁর চিরচেনা ভঙ্গিতে সেই ভালোবাসার জবাব দিলেন। কোনো রাজনীতিবিদের মতো কেবল হাত নেড়ে নয়, তিনি জবাব দিলেন ফুটবল পায়ে, দর্শকদের প্রত্যাশার শতভাগ রঙ তুলিতে রাঙিয়ে। জর্ডানের রক্ষণভাগের মানবদেয়ালকে ফাঁকি দিয়ে তাঁর বাঁ পায়ের এক জাদুকরি ফ্রি-কিক যখন জর্ডানের জাল ছুঁয়ে গেল, তখন ড্যালাস যেন এক মায়াবী উৎসবে রূপ নিল।
রচিত হলো এক নতুন মহাকাব্য
এই এক গোলেই ড্যালাসের মাঠে রচিত হলো এক নতুন মহাকাব্য। চলতি বিশ্বকাপে তিন ম্যাচে এটি মেসির ষষ্ঠ গোল। আর এই নান্দনিক গোলের ওপর ভর করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজের গোল সংখ্যাকে তিনি নিয়ে গেলেন এক অবিশ্বাস্য উচ্চতায়- ১৯টি গোল! আগের ম্যাচেই বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনটি নিজের করে নিয়েছিলেন, এবার সেই মুকুটে যুক্ত করলেন আরেকটি উজ্জ্বল পালক।
একই সঙ্গে ফুটবল ইতিহাসের এক অনন্য ও নিঃসঙ্গ চূড়ায় আরোহণ করলেন এই আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। কাতার ২০২২ বিশ্বকাপের শেষ চার ম্যাচের (নকআউটের প্রতিটি ম্যাচে) গোল করার পর, এই বিশ্বকাপের প্রথম তিন ম্যাচ-টানা সাতটি ম্যাচে জাল কাঁপানোর এক অভূতপূর্ব কীর্তি গড়লেন তিনি।
এর আগে টানা ছয় ম্যাচে গোল করার ঐতিহাসিক গৌরব ভাগ করে নিয়েছিলেন ১৯৫৮ সালের ফ্রান্সের জাঁ ফন্টেইন এবং ১৯৭০ সালের ব্রাজিলের জার্জিনহো। কদিন আগেই মেসি তাঁদের পাশে বসেছিলেন। কিন্তু ড্যালাসের এই মায়াবী রাতে সেই দুই কিংবদন্তিকে পেছনে ফেলে, রেকর্ডের রাজসিংহাসনে এবার একেবারেই একাকী বসে রইলেন লিওনেল মেসি। ইতিহাস তো এমনই, সে বারবার বদলায়, কিন্তু কিছু মানুষ ইতিহাসকে নিজের মতো করে নতুন করে লেখেন!
স্কোর কার্ড
বিশ্বকাপ ২০২৩




















