মুখ ঢেকে কথা বললে লাল কার্ড ! মাঠে কোনো হিংস্র ট্যাকল করেননি, প্রতিপক্ষকে কনুই দিয়ে আঘাতও করেননি, এমনকি রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কোনো তর্কেও জড়াননি। তবু ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা ক্লারায় তুরস্কের বিপক্ষে ম্যাচের প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হলো প্যারাগুয়ের মিডফিল্ডার মিগুয়েল আলমিরনকে। তিনি নিজে যেমন স্তব্ধ, তেমনি গ্যালারিতে থাকা হাজারো দর্শকের চোখে মুখেও তখন অবিশ্বাস্য বিস্ময়। ফুটবলের চিরচেনা ব্যাকরণ ভেঙে কী এমন অপরাধ করলেন তিনি, যার জন্য এত বড় শাস্তি?

ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল আলমিরনের হাত দিয়ে ‘মুখ ঢেকে কথা বলা। তুরস্কের ডিফেন্ডার মের্দ মুরদুলের সঙ্গে কথা বলার সময় নিজের মুখ আড়াল করে রেখেছিলেন প্যারাগুয়ের এই তারকা। আর এই সাধারণ একটি অভ্যাসই তাঁকে ফুটবল ইতিহাসের এক অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডের পাতায় জড়িয়ে দিল। ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে কার্যকর হওয়া ফুটবলের একদম নতুন নিয়মে মুখ ঢেকে কথা বলার দায়ে লাল কার্ড দেখা ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় এখন মিগুয়েল আলমিরন।

কেন এই অদ্ভুত নিয়ম?
ফুটবল মাঠে প্রতিপক্ষ ফুটবলারের কানে কানে কথা বলা, স্লেজিং করা বা মানসিক চাপ তৈরি করা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছর গুলোতে খেলোয়াড়দের মধ্যে কথা বলার সময় হাত বা জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে রাখার প্রবণতা ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। প্রশ্ন উঠেছে, যা বলা হচ্ছে, তা কেন গোপন রাখা হচ্ছে? এই লুকোচুরির আড়ালে কি কোনো অন্ধকার লুকিয়ে আছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই বিশ্ব ফুটবলের আইনপ্রণেতা সংস্থা ‘আইএফএবি’ (IFAB) এবং ফিফা এই কঠোর নিয়মের পথে হেঁটেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকেই নিয়ম করা হয়েছে, মাঠে মুখ ঢেকে কথা বলাকে ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য করে সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হতে পারে।
বেনফিকা-রিয়াল ম্যাচ ও ভিনির ঘটনা
এই নিয়মটি হঠাৎ করে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে গত ফেব্রুয়ারিতে চ্যাম্পিয়নস লিগের একটি বিতর্কিত ঘটনা। রিয়াল মাদ্রিদের ব্রাজিলিয়ান তারকা ভিনিসিউস জুনিয়রের সঙ্গে কথা বলার সময় বেনফিকার আর্জেন্টাইন উইঙ্গার জিয়ানলুকা প্রেসতিয়ান্নি নিজের জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছিলেন। টেলিভিশন ক্যামেরায় সেই দৃশ্য ধরা পড়ার পর বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। ঠোঁট নাড়ানোর ভাষা (Lip-reading) বোঝার উপায় না থাকায় ঠিক কী বলা হয়েছিল তা শুরুতে জানা না গেলেও, পরে তদন্তে প্রমাণিত হয় প্রেসতিয়ান্নি সমকামবিদ্বেষী ও বর্ণবাদী মন্তব্য করেছিলেন। উয়েফা তাঁকে ৬ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেয়।

আধুনিক ফুটবলে প্রায় প্রতিটি মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী হলেও মুখ ঢেকে রাখলে অপরাধীকে ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। বর্ণবাদ, বৈষম্য বা ম্যাচ ফিক্সিংয়ের মতো ঘৃণ্য অপরাধের প্রমাণ লোপাট করতেই এই কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হচ্ছিল।
লুকানোর কিছু না থাকলে মুখ ঢাকারও প্রয়োজন নেই
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর মতে, এই নতুন নিয়মের মূল উদ্দেশ্য হলো অপরাধের পথ শুরুতেই বন্ধ করা। ইনফান্তিনো স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন,
কোনো খেলোয়াড় যদি এমন কিছু বলেন যা প্রকাশ্যে বললে সমস্যা হতো, তখনই কেবল তিনি মুখ ঢাকার প্রয়োজন অনুভব করেন। লুকানোর কিছু না থাকলে মুখ ঢাকারও প্রয়োজন নেই।
তবে আইএফএবি জানিয়েছে, মুখ ঢাকলেই যে ঢালাওভাবে লাল কার্ড দেওয়া হবে, বিষয়টি তেমন নয়। প্রতিটি পরিস্থিতি মাঠের রেফারি খতিয়ে দেখবেন। রেফারি যদি মনে করেন খেলোয়াড়ের এই আচরণ সন্দেহজনক, উসকানিমূলক বা ফুটবলীয় স্পিরিটের পরিপন্থী, তবেই তিনি সরাসরি লাল কার্ড (বহিষ্কার) দেখাতে পারবেন।
আর এই নিয়মের প্রথম প্রয়োগটিই আজ করে দেখালেন এল সালভাদরের রেফারি ইভান বারটন। আলমিরনের একটি অসতর্ক মুহূর্ত তাঁকে মাঠ থেকে তো বের করলই, পাশাপাশি ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের প্রথম খলনায়ক হিসেবে তাঁর নাম লিখে দিল। এই ঘটনার পর ফুটবলাররা মাঠে কথা বলার সময় হাত তুলতে অন্তত দশবার ভাববেন, তা বলাই বাহুল্য।
স্কোর কার্ড
বিশ্বকাপ ২০২৩




















